Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

বন ও বনায়ন: সমস্যা ও সম্ভাবনা


আগামী নিউজ | ফরিদ উদ্দিন আহমেদ প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২১, ০৯:৩৯ এএম
বন ও বনায়ন: সমস্যা ও সম্ভাবনা

ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবার (০৪ জুন) ২০২১ বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার অংজয়পাড়া গেলাম। তুলাছড়ি থেকে স্থানীয় ভাষায় ভি-৭ গাড়িতে (৩৪০০ সিসি জিপ) ছড়া, কাদা মাটির রাস্তা ও ইট বিছানো পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তা ধরে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার রাস্তা। কখনো গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে, কখনো সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে ভেঙছড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা দিলাম। তিন কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা হাঁটতে আমাদের লেগেছে প্রায় এক ঘন্টা। অংজয়পাড়া পৌঁছে পানি ও বিস্কিট খেয়ে সেখানকার বশ্বাসকারীরদের সাথে আলোচনা সভায় বসলাম। বসলাম চায়ের দোকানে। হেডম্যান এর দোকান। বেশ বড়। তরুণ থেকে বৃদ্ধ অনেকেই ছিলেন। মহিলাদের পাই নি। সবাই নাকি কাজে বেরিয়েছে।

৮৬টি মারমা পরিবার নিয়ে অংগজয় পাড়া। বড় একটি তেঁতুল গাছের চারপাশে অনেকগুলো বাড়ি। হেডম্যান পাকাবাড়ি বানাচ্ছে। পাহাড়ি কাঠের বাড়ির আদলে তার বাড়ি তৈরি হচ্ছে। আরসিসি পিলার দিয়ে মাটি থেকে তিন ফুট উঁচুতে প্রথম ফ্লোর করেছে। পাকা দালান এর দেয়াল উঠছে। হয়ত মাস খানেকের মধ্যেই বাড়ি হয়ে যাবে যদি উপরে টিন দেয়। পাকা ছাদ হলে মাস দুয়েক লাগবে। বাড়িতে জিএফএস এর পানির লাইন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এ জিএফএস তিন বছর আগে তৈরি করে দিয়েছে। সারা বছর ওরা পানি পায়। এর মানে হচ্ছে তাদের ভিসিএফ এর অবস্থা ভালো। তিন চার কিলোমিটার দূরে তাদের এই GFS এর মূল বাঁধ। এ পানি পান করে কেউ অসুস্থ হয় নি বলে তাদের দাবি। সেখানে কোন দোকানে বোতলজাত পানি দেখিনি। তবে ড্রিংকস পাওয়া যায়। ইউরো নামের একটি পানীয় আমি নিজেও পান করেছি। বোতলে ১৬ টাকা লেখা থাকলেও দাম নিয়েছে ২০ টাকা। অন্যান্য সামগ্রীর দামও কিছুটা বেশি কারণ অনেক কষ্ট করে তাদের এ মালামাল আনতে হয় রোয়াংছড়ি বা বান্দরবান থেকে। সাদা ডিম প্রতিটি ১০ টাকা, পিয়াজ ৮০/- টাকা, রসুন ১৪০/- টাকা। তবে চা ঠিকই পাঁচ টাকা। পান পাঁচ টাকা। ড্রিংকস প্যাক তিন টাকা। এনার্জি ড্রিংক বেশ চলে।

জানতে চেয়েছিলাম তাদের জীবন জীবিকা সম্পর্কে। একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। কয়েক বছর আগে নতুন বিল্ডিং করেছে। বেশ সুন্দর। দৃষ্টি নন্দন। সারা দেশে একই রকমের বিল্ডিং। মাত্র তিন জন শিক্ষক আছে। সবই পুরুষ শিক্ষক। হাই স্কুল নেই। যারা প্রাইমারি পাস করে, তাদের এই ১৩-১৪ কিলোমিটার পার হয়ে যেতে হয় হাই স্কুলে। তিনজন ঝরে পড়া ছাত্র পেয়েছিলাম। একজন ৮ম ক্লাস ও বাকি দুই জন সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। ওরা ঘুরে ফিরে বেড়ায়। কিছু করে না। ওদের বাবা জুম চাষি। এক জনের হাতে দামি ঘড়ি ও অন্য একজনের হাতে এন্ড্রয়েড মোবাইল আছে। ওখানে নেটওয়ার্ক নেই। তবে একটু দূরে পাহাড়ের উঁচুতে গেলে নাকি নেটওয়ার্ক পায়। তা দিয়ে ফেসবুক চেক করতে পারে।

বাড়িগুলো অনেকটা কাছাকাছি। বাড়ির আঙিনায় কোন শাক সবজি বা ফলের গাছ নেই। তবে দৈনিক শাক সবজি খায়। কিছু পাহাড় থেকে সংগ্রহ করে কিছু দোকান থেকে কিনে। মাছ নেই। গরু ও খাসির মাংস তাদের পছন্দ নয়। অনেকে খায় না। তবে মুরগি সবাই খায়। দেশি মুরগি। ফার্মের মুরগি নাই। খামারও নাই। কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নাই। সোলার আছে। ২০ কিলোওয়াটের সোলার এর দাম ১৫,০০০/- টাকা। এক সময়ে কিনতে হত। এখন উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন এনজিও থেকে তাদের প্রত্যেক বাড়িতে সোলার দিয়েছে। মুরগির দাম বেশি। এক কেজির একটি মুর্গির দাম ৫০০/- টাকা। মুরগি পালনেও তাদের খুব আগ্রহ নেই। কারণ শীতকালে রোগে মুরগি মারা যায়। একজন শুধু ছাগল পালন করে। উনার ২০টি ছাগল আছে। শুকুর পালন লাভজনক হলেও অজ্ঞাত রোগে শুকুরও মারা যাচ্ছে। তাই তারা শুকুর পালনেও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।

ঝরে পরা ছাত্রদের কাছে জানতে চাইলাম ওরা কি কোন কাজ শিখতে চায় কি না। তাদের গাড়ি চালানো শিখার আগ্রহ আছে। ফলের বাগান বা দেশি হাঁস মুরগি পালনেও আপত্তি নাই। কিন্তু ওদের ভয়, হাঁস মুরগির রোগ নিয়ে। বাড়ির আশেপাশে ফলের গাছ ও শাক সবজি লাগানোর প্রচুর জায়গা রয়েছে। কিন্তু তাদের  দীর্ঘদিনের প্রচলন থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। কিছু ডেমো তাদের বদলে দিতে পারে বলেই আমার ধারনা। হাঁস মুরগি, ও শুকুরের রোগ বালাই দমনের ওপর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সকাল ১০ টা থেকে বেলা ২:০০ পর্যন্ত আমরা বনে ও পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছি। রাস্তায় একটি মরা সাপ ছাড়া আর কোন বন্যপ্রাণী চোখে পড়েনি। ওদের কাছে জেনেছি, এক সময়ে অনেক শুকুর ও হরিণ ছিল। এখন কদাচিৎ দেখা যায়। তাদের দেখেও মনে হয়েছে, তাদের শরীরে পুষ্টির অভাব। বয়োজ্যেষ্ঠ এক ভদ্রলোক যিনি এক সময়ে কবিরাজ বা বৈদ্য ছিলেন, তিনি জানালেন আজকাল ঔষধি গাছ পাওয়া যায় না। উনি চোখেও ভালো ভাবে দেখেন না। চোখে ছানি পড়েছে। চিকিৎসার সামর্থ নেই।

আলোচনা শেষে আমরা ভিসিএফ দেখতে গেলাম। সত্যিই ভালো অবস্থায় আছে। তবে আশেপাশের বনে কিছুটা উন্নয়নের সুযোগ আছে। বেশ কিছু জমিতে সেগুন আছে। দেশীয় গাছ যা আছে তার চাইতে জাহান বেশি। ঝিরির পাড়ে বাঁশ লাগানোর সুযোগ আছে। কিছু শিমুল বা মন্দার গাছ লাগেনো যেতে পারে। রাস্তায় হেঁটে আসা মহিলাদের হাতে ঢেকি শাক দেখে মনে হল, বাঁশের সাথে ঢেকি শাক লাগানো যেতে পারে। সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড় কেটে ভূমিধসের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ওসব স্থানে ফুল ঝাড়ু লাগানো প্রয়োজন। উরি আম গাছে সব আম পেকে ঝরে যাচ্ছে। এসব আম কুড়িয়ে বনে লাগানো যেতে পারে। মেন্দা ও গামার খুব উপকারী ও অর্থকরী। এসব গাছ লাগিয়ে গাছের ছাল বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বসতবাড়ি ও এর আশেপাশের জমিতে আম, কাঁঠাল ও কমলা লাগানো যেতে পারে। পাহাড়ে নিচু এলাকায় এক ধরণের কচু জন্মায়। এ কচু শুকিয়ে বিক্রি করে। প্রতি কেজি শুকনা কচু ২০০/- টাকা। কচু আমরা দেখি নি। তবে, স্থানীয় যার সাথেই আলাপ করেছি, সবাই চিনে। বলল, বেশ স্বাদ। চিংড়ি বা অন্য শুঁটকি বা মাংস দিয়ে রান্না করে। মজার ব্যাপার হলো এর সংগ্রহের সময় নিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ের পর সংগ্রহ করলে গলা চুলকাবে। অর্থাৎ এলাকার প্রচলিত জ্ঞান ছাড়া সংগ্রহ করলেও বিপদ।

শেষ কথা হল সে এলাকায় বনায়নের সুযোগ সত্যিই কম। ফাঁকে ফাঁকে কিছু দেশীয় গাছ লাগানো যাবে। তবে মূল কাজ হলো বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা। ওরা জানে সেগুন মাটি নষ্ট করে। পানির প্রাপ্যতা কমিয়ে দেয়। কিন্তু তবুও এর দাম অন্য কাঠের তুলনায় বেশি। বিক্রি করা যায়। হউক সে দাম এ ধরণের কঠিন বা সড়ক বিহীন গহীনে অন্যান্য স্থানের তুলনায় কম। বাঁশ আছে প্রচুর। তাই আপাতত পানির ঘাটতি নেই। এসব বিবেচনা করেই সবার কাজ করা প্রয়োজন।