“তায়েফে মুহাম্মদ (সাঃ) কে পাথর দিয়ে আঘাত”
----- ড. নিম হাকিম
মহানবী (স:) তায়েফে কাফেরদের দ্বারা পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে আহত অবস্থায় একটি আংগুর বাগানে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন।
আবু তালিবের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.)-এর ওপর কোরাইশের অত্যাচার বৃদ্ধি পায়। ফলে তিনি মক্কার বাইরে ইসলাম ও মুসলমানের নিরাপদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মক্কা থেকে ৭৫ মাইল দূরে অবস্থিত নবুয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে তায়েফ গমন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আজাদকৃত গোলাম ও পালকপুত্র জায়িদ ইবনে হারিসা (রা.)। তায়েফে ১০ দিন তিনি গোপনে, প্রকাশ্যে, একাকী ও সামগ্রিকভাবে দাওয়াত দেন। তিনি বাজারে দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন। (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ১/৩৬২)
তায়েফ সফরের কারণ : তায়েফের অদূরে বনি সাকিফ গোত্রে মহানবী (সা.) দুধ পান করেন এবং তায়েফ সর্দারদের একজন কোরাইশ গোত্রে বিয়ে করেছিল।
দুধের আত্মীয় ও গোত্রীয় সম্পর্কের কারণে মহানবী (সা.) তাদের থেকে সদাচার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু তারা চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করেছিল।
আমর ইবনে উমায়েরের তিন ছেলে আবদে ইয়ালিল, মাসউদ ও হাবিব ছিল বনু সাকিফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। মহানবী (সা.) তাদের কাছে গেলে তাদের একজন বলে, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন, তবে তিনি কাবা ঘরের গেলাফ খুলে ফেলুন।’ আরেকজন বলল, ‘আল্লাহ কি রাসুল বানানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পেলেন না?’ অন্যজন বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে কোনো কথাই বলব না।তুমি যদি তোমার দাবি অনুসারে সত্য রাসুল হও তাহলে তোমার কথার প্রতিবাদ করা বিপজ্জনক। আর তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তাহলে তোমার সঙ্গে আমার কথা বলাই অনুচিত। তাদের কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বের হয়ে এলেন এবং তাদের অনুরোধ করলেন তারা যেন এসব কথা প্রচার না করে। কিন্তু তারা তা প্রকাশ করল এবং সাধারণ মানুষদের মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলল। (সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ১০৮)
নবীজির ওপর অত্যাচার : তারা মহানবী (সা.)-কে তায়েফ ত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং ফেরার সময় উচ্ছৃঙ্খল বালকদের লেলিয়ে দেয়। তারা নবীজি (সা.)-এর দিকে পাথর নিক্ষেপ করে এবং গালাগাল করে। শরীরের রক্তে তার জুতা ভরে যায়। এ সময় জায়িদ (রা.) অসামান্য আত্মত্যাগ স্বীকার করেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর জন্য ঢালস্বরূপ হয়ে যান। যে দিক থেকে পাথর ছোড়া হচ্ছিল তিনি সেদিক থেকে তাঁকে আগলে রাখছিলেন। ফলে তার মাথার কয়েক জায়গায় কেটে যায়। কষ্টে রাসুলুলুল্লাহ (সা.) মাটিতে বসে পড়লে হতভাগারা তাঁর হাত ধরে উঠিয়ে দিত এবং সামনে চলতে বলত। আর সামনে পা বাড়ালেই পাথর নিক্ষেপ করত। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৪৩; মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ১/৩৬২)
ফলের বাগানে আশ্রয় :
মুহাম্মাদ তারপর শহরের বাইরে একটি ফলবাগানে আশ্রয় নেন। সেখানে বাগানটির মালিকরা উপস্থিত ছিলো। তারা ছিলো মক্কার শামস গোত্রের রাবিয়াহর পুত্র শায়বা এবং উতবা। তাকে আঘাতপ্রাপ্ত দেখে তাকে তাদের বাড়িতে স্বাগতম জানায়। তারা তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাসকে যিনি একটি আঙুরের প্লেট দিয়ে পাঠায়।[৬] মুহাম্মাদ উপহার গ্রহণ করে তা খান এবং খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে) পাঠ করেন। তখন তরুণ দাসটি বলে যে, সে তার শহর ছেড়ে যাওয়ার পর এসব কথা আগে কখনো শোনেনি। মুহাম্মাদ তখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, সে কোথা থেকে এসেছে। সে উত্তর দেয় যে, সে নিনেভেহ থেকে এসেছে। মুহাম্মাদ বলেন, "ইউনুস নিনেভেহর ছিলেন।" আদ্দাস বিস্মিত হন যে, মুহাম্মাদ ﷺ ইউনুস সম্পর্কে জানেন, কারণ খুব কম আরবই তার নাম ও কাহিনী জানতেন। নবী মুহাম্মাদ ﷺ তখন বলেন, “তিনি আমার ভাই; তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন এবং আমিও আল্লাহর নবী।” এরপর আদ্দাস তার মাথা, হাত ও পা চুম্বন করেন। ফিরে যাওয়ার পর আদ্দাস তার দুই মালিকের কাছে শাস্তি পান যারা এই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলো। যার জবাবে আদ্দাস বলেন, "এই মাটিতে তার চেয়ে ভালো মানুষ আর নেই; তিনি আমাকে এমন কথা বলেছেন যা শুধুমাত্র একজন নবী জানেন।”[৭]