Agaminews
Dr. Neem Hakim

ঈদ সামনে রেখে ভেজাল খাদ্যে বাজার সয়লাব!


আগামী নিউজ | আরিফুর রহমান প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২০, ০৮:৪০ এএম
ঈদ সামনে রেখে ভেজাল খাদ্যে বাজার সয়লাব!

ঢাকা: প্রতিবছরই রমযান ও ঈদ আসলেই বাজারে বাড়তে থাকে ভেজাল খাদ্যের পরিমাণ। অতি মুনাফার লোভে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তৎপর থাকে ভেজাল খাদ্য তৈরি ও বিক্রিতে। আর এসব খাবার খেয়ে চরম স্বাস্থ্যহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। দেখা দেয় নানা ধরনের রোগ ব্যাধি। 

ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরই রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ঘড়ে তোলা হয় অস্থায়ী কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হয় ভেজাল সেমাই, ঘি, নুডুলসসহ উৎসবের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী। নোংরার মধ্যে শ্রমিকরা পা দিয়ে ময়দা মাখিয়ে ‘মণ্ড’ তৈরি করছেন। আর এরপর পোড়া পামওয়েল তেল ও ডালডা মিশিয়ে সেমাই ভেজে প্যাকেট লাগানো হচ্ছে ঘি দিয়ে ভাজা সেমাই হিসেবে। প্রতিনিয়ত এ ধরনের ভেজাল খাবার খেয়ে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধছে মানুষের শরীরে। আর এসব অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাবার চলে যায় রাজধানীর বিভিন্ন দোকানপাটে। এমনকি নামি-দামী সুপারশপগুলোতেও বিক্রি করা হয় এসব খাবার।

প্রতিদিনই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে সারাদেশে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (১১ মে) সারাদেশে ৯৫ টি বাজারে (পাইকারি ও খুচরা) তদারকিমূলক অভিযান পরিচালনা ক‌রে মোট ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা জ‌রিমানা করা হয়।

এরমধ্যে ঢাকা মহানগরী ও ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার, প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোঃ মাসুম আরেফিন, বিকাশ চন্দ্র দাস ও সহকারী পরিচালক শাহনাজ সুলতানা, আব্দুল জব্বার মন্ডল, মাগফুর রহমান, ইন্দ্রানী রায় ও মাহমুদা আক্তার। ঢাকা মহানগরী ও ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় অধিদপ্তরের ৮ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ২২টি বাজারে (পাইকারি ও খুচরা) এ অভিযান পরিচালিত হয়।

এছাড়া ঢাকার বাইরে ৬১ জন কর্মকর্তা বিভাগে উপ-পরিচালক ও জেলায় সহকারী পরিচালকদের নেতৃত্বে ৭৩ টি বাজারে অভিযান পরিচালিত হয়।

এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল আগামীনিউজকে বলেন, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাজার করা, দ্রব্য মূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল খাদ্যরোধে সপ্তাহের অন্যান্য দিনের মতো ছুটির দিনেও আমরা বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছি।

ঈদ উপলক্ষে প্রতিবছরই বাজারে বিভিন্ন ভেজাল খাদ্য বিক্রি করা হয়। তা প্রতিরোধে চলতি বছর আপনাদের পদক্ষেপ কী? আগামীনিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, ঈদ বা রমযান বলে কথা নয়, আমরা সবসময়ই চাই ক্রেতারা প্রতিটা মানুষ যেন নির্ভেজাল খাবার খেতে পারে। তবে এটাও ঠিক এই সময়গুলোতে অসাধু ব্যবসায়ীরা তৎপর থাকে। আমরা তাদেরকে কোন প্রকার ছাড় দিতে রাজি নই। আমরা প্রথমে জরিমানা আরোপ করে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করছি। এরপরও যদি কেউ একই অপরাধ দ্বিতীয় বার করে তখন আমরা কঠিন ব্যবস্থা নিচ্ছি।

তিনি বলেন, আপনারা খেয়াল করে দেখবেন প্রায় প্রতিদিনই ভেজাল ও দ্রব্যমূল্য বেশি রাখার কারণে সারাদেশেই ভোক্তা অধিকার জরিমানা করে থাকে। আজকে ফেনীতে অপরিষ্কার পরিবেশে সেমাই তৈরির জন্য বাবুল সেমাই নামক এক কারখানাকে সাত হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মালির অংক বাজারে অভিযান চালিয়ে পণ্যের মূল্য তালিকা না থাকা, পণ্যের মূল্য লেখা না থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস বিক্রি, ধার্যকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে পন্য বিক্রির অপরাধে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে, নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর ও পিচল ডাঙ্গা এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই ও মুড়ি উৎপাদনের কারণে বিসমিল্লাহ ফুডস লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে পাঁচ হাজার টাকা ও একতা মুড়ি মিলকেও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এছাড়া, গত ৯ মে রাজধানীর মৌলভীবাজারের মসলার পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার, প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আফরোজা রহমান এবং বিকাশ চন্দ্র দাস। অভিযান প্রসঙ্গে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, রমজান ও আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে মসলাসহ আনুষঙ্গিক পণ্যের দাম বেড়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এসেছে। বিষয়টি তদারকি করতে আজকে মৌলভীবাজারে অভিযানে যাই। এ সময় আমরা দেখছি, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন করছেন না। তারা অনৈতিকভাবে পণ্যের অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, অন্যতম মসলা জিরা সর্বোচ্চ ২৭৮ টাকা বিক্রি করার কথা। কিন্তু পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা। লবঙ্গের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ৫৩১ টাকা পাইকারি বাজারে বিক্রি করার কথা থাকলেও বিক্রি করা হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। অন্যান্য মসলার দামও কারণ ছাড়াই বাড়িয়েছে। পাইকাররা কোনো ক্রয় রশিদ বা দামের প্রমাণপত্র দেখাতে পারছেন না। অভিযানে অতিরিক্ত মূল্য রাখা, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা এবং ক্রয় ভাউচার সংরক্ষণ না করার অপরাধে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ৪১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তাদের অধিকার আদায়ে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, রোববার (১০ মে) রাজধানীর বাদামতলীর ফলের আড়তে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময়  অপরিপক্ক আম রাসায়নিক কেমিকেল দিয়ে পাকানোর অভিযোগে ৪১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড এবং ৪ আড়ত সিলগালা করে দেয়া হয়।

র‌্যাব-১০ এর সহযোগীতায় অভিযান পরিচালনা করেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।

সারওয়ার আলম আগামীনিউজকে বলেন, বাজারে এখনও পরিপক্ক আম আসতে ১০ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় অপরিপক্ক আম কেমিকেল দিয়ে পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করছিল। বাইরে থেকে আমগুলো হলুদ টসটসে দেখা গেলেও ভিতরে একদম অপরিপক্ক। এগুলো সব রাসায়নিকে পাকানো। যা খেলে মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করবে। আমরা যেসব আম জব্দ করেছি সেগুলো দেড় সপ্তাহ পর বাজারে আসলে পরিপক্ক হতো।

প্রতিবছরই ঈদকে সামনে রেখে এই সময়ে দেশের বিভিন্নস্থানে নকল ও ভেজাল সেমাইয়ের কারখানা গড়ে উঠে। চলতি বছর এই ধরনের অভিযান কম মনে হচ্ছে? এর কারণ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আগামীনিউজকে বলেন, নকল ও ভেজাল খাবারের কারখানা যে একদম নেই সেটা বলা যাবে না। তবে করোনার কারণে তা অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। তারপরেও ব্যাপারটি আমার মাথায় আছে। আমরা সুযোগ বুঝেই অভিযান চালাবো।

র‌্যাবের আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু আগামীনিউজকে বলেন, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো ভেজাল খাবারও আমরা সহ্য করবো না। যারাই এমন অপরাধমূলক কাজ করবে তাদেরকেই আইনের আওতায় আসতে হবে। আমরা অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আইনের আওতায় আনবো।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো: আব্দুল কাইউম সরকার আগামীনিউজকে বলেন, বাজারে যাতে কোন প্রকারের ভেজাল খাদ্য বিক্রি না হয় সে জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমরা ভেজাল খাদ্যরোধে মোবাইল টিম পরিচালনা করছি। এছাড়াও আমাদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেয়া আছে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।

আগামীনিউজ/আরিফ/মিজান

Dr. Neem

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের আরো খবর