Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

অস্তিত্বের লড়াইয়ে কিন্ডারগার্টেন


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২১, ১০:০৯ এএম
অস্তিত্বের লড়াইয়ে কিন্ডারগার্টেন

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাঃ ঢাকার বাসাবো বালুর মাঠের পাশেই রাজধানী পাইলট কিন্ডারগার্টেন এন্ড হাই স্কুল। ২০১৬ সালে এই কিন্ডারগার্টেনের দ্বিতীয় শাখার কার্যক্রম বাসাবোতে শুরু হয়। অপর শাখা রাজধানীর ভাটারায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২০ সালে ২৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলো, তবে করোনার কারণে ক্লাশ-পরীক্ষা না হওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সেই সব শিক্ষার্থীর আর খোঁজ নেই। এ বছর মাত্র ৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এদের নিয়েই চলছে কিন্ডারগার্টেনটির কার্যক্রম। তবে অনলাইন ক্লাশ কার্যক্রমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনিহা থাকায় এসব শিক্ষার্থীর থেকে বেতন আদায়ও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শ্রম দেয়ার পরও শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। শুধু বাসাবোর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের ৪৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো এভাবেই অস্তিত্বের লড়াই করছে।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর একাধিক সংগঠনের কথা বলে জানা যায়, করোনার আগে দেশে কিন্ডারগার্টেন ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিলো ৬০ হাজার।শিক্ষক-কর্মচারী ছিলেন প্রায় ১২ লাখ। মহামারি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এরই মধ্যে দেশের প্রায় ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের কারণে একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর আত্মহননের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পেশাবদল করেছেন হাজারো শিক্ষক। অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করছেন।

বিনা বেতনে কাজ করছেন শিক্ষকরা: দেশে কিন্ডারগার্টেনগুলোর ৬০-৭০ ভাগই নারী শিক্ষক। সরেজমিন একটি কিন্ডারগার্টেনে দেখা যায়, সেখানে ৭ জন শিক্ষিকা কর্মরত আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ক্লাশ বন্ধ থাকলেও আমরা প্রতিদিন বিদ্যালয় খুলে বসে আছি। তবে দীর্ঘ ১৪ মাসেও কোনো বেতন পাননি তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বেতন যে একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না তা কিন্তু নয়। ৩০ ভাগ শিক্ষার্থীর থেকে বেতন পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা দিয়েই বিদ্যালয় ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

অনলাইন ক্লাশে নেই শিক্ষার্থী উপস্থিতি: করোনাকালীন সময় বেশ কিছু স্কুল অনলাইনে পাঠ কার্যক্রম শুরু করলেও তা বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে শিক্ষকরা বলছেন, অনলাইনে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগী নয়। অনেক অভিভাবক বাচ্চাদের হাতে মোবাইল দিতে চান না। এছাড়াও আরো একটি সমস্যা আছে সেটি হলো শিক্ষকের সম্মানী। শিক্ষক একটি ক্লাশ করালেই তাকে সম্মানী দিতে হয়। এই অবস্থায় সেটি সম্ভব না হওয়ায় অনলাইন পাঠ কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে।

কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. আহসান সিদ্দিকী বলেন, ‘এমন অবস্থা চলতে থাকলে ৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। পরিচালকরা পথে বসবে। কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী বেকার হয়ে যাবে’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলো। এর জন্য তারা দায়ি করছেন, সরকারের সহযোগিতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্যকে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে প্যারালালভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তুলছি আমরা। অথচ সরকার আমাদের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ করছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বছরের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ থেকে ঘোষণা এলো- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানরা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়তে পারবে না! এটাতো শিক্ষানীতির পরিপন্থী।’

প্রতিষ্ঠান না খুললে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব: কিন্ডারগার্টেন স্কুল যারা পরিচালনা করেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানান, স্কুলগুলো যেভাবে সংকটে রয়েছে তাতে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই আপাতভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবে যদি সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়, তবেই বিদ্যালয়গুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আবারো আগের মতো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভূমিকা পালন করতে পারবে।

এ বিষয়ে কিন্ডারগার্টেন ও সমমান স্কুল রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আবদুল অদুদ বলেন, ‘সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে নিরক্ষরমুক্ত দেশ ও সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। এ কারণে আমরা কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোর দৈন্যতা নিরসনে সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। এটা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।’ ‘এ সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে আমাদের প্রস্তাব তোলা হয়েছে ও বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে আমারা এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি আশ্বাস পাইনি।

দেশে করোনা শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। ভাইরাসের বিস্তার রোধে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। টানা প্রায় এক বছর তিন মাস বন্ধ থাকার পর পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ১৩ জুন থেকেই স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওইদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।