Dr. Neem on Daraz
Victory Day
নজর নেই বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকারের

পর্যটন নগরীগুলোতে ভেজাল ও নকল পণ্যে সয়লাব


আগামী নিউজ | মিথুন মুৎসুদ্দি প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২০, ০৪:৫৪ পিএম
পর্যটন নগরীগুলোতে ভেজাল ও নকল পণ্যে সয়লাব

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাঃ স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরও আমাদের পর্যটন শিল্প বিশ্বমানের হয়ে উঠেনি। ফলে আমরা এই শিল্পের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারছি না। বিশ্বের প্রায় সব দেশে পর্যটন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ মিলিয়ন, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৩৫ মিলিয়নে। চলতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পর্যটক সারা পৃথিবী ভ্রমণ করার কথা। কিন্তু করোনা সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

মূলত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রায় পর্যটকশূন্য আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো। বিশ্বব্যাপী লকডাউনের সাথে সাথে পর্যটকের সংখ্যাও দ্রুত হ্রাস পেতে পেতে এখন তা প্রান্তিক মাত্রায় নেমে এসেছে। জুনের শুরু থেকে কিছু দেশ লকডাউন শিথিল করলেও এখন পর্যন্ত এই শিল্প ছন্দে ফিরতে পারেনি।

পর্যটন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের পছন্দের বেড়ানোর তালিকায় এক নম্বরে আছে কক্সবাজার। পরের অবস্থানে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। পছন্দের তালিকার তৃতীয় অবস্থানে আছে সিলেট, তারপর সুন্দরবন। সমুদ্র ও পাহাড় একসঙ্গে দেখার সুযোগ থাকায় কক্সবাজার দেশীয় পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। আগে শীতের মৌসুমে বেশি ভিড় থাকলেও এখন প্রায় সারা বছরই কক্সবাজারে পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর থাকে। পর্যটকদের আবাসন সুবিধার জন্য কক্সবাজারজুড়ে এখন ৪৫০ হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।

খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের অনেক পর্যটনকেন্দ্রেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা নেই। আবার যেখানে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে কাজ হচ্ছে না। অপরিকল্পিত অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ কক্সবাজার। সেইসাথে আছে যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট।

কিন্তু, সব সংকট ছাপিয়ে গেছে পর্যটন নগরীগুলোতে গড়ে উঠা বাজারে ভেজাল ও নকল পণ্যে। যা দিন দিন হয়ে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিত আর সেই সাথে স্বাস্থ্যঝুকিতে পড়ছে পর্যটকেরা। সব পণ্যে বিএসটিআই এর লগো লাগানো। একজন পর্যটকের পক্ষে আসল-নকল বাছাই করে পণ্য ক্রয় করা কঠিন। বাজারে মানসম্মত খাদ্য-পণ্য বাজারজাতকরণে নিয়োজিত সরকারি মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসটিআই এর এক শ্রেণীর কর্মকর্তাদের দায়িত্বপালনে উদাসীনতার কারনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পুরো দেশকে ভেজালের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। শুধুমাত্র খাদ্য-পণ্য ছাড়াও পর্যটকেরা ওজন ও পরিমাপে কারচুপির শিকার। খাদ্য-পণ্য ছাড়াও পর্যটকেরা ওজন ও পরিমাপে কারচুপির শিকার হলেও প্রতিকার পাওয়া দুস্কর। ডিজিটাল পরিমাপক যন্ত্রগুলিতে ডিজিটাল উপায়ে কারচুপি করা হচ্ছে। আর ওজন যন্ত্রটি বিএসটিআই থেকে ক্যালিব্রেশন করার পর স্টিকারটি যথাযথভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। ফলে পর্যটকেরা বৈধ ক্যালিব্রেশন যন্ত্র দিয়ে পণ্য ক্রয় করার বিষয়ে জানতে পারছে না। এছাড়াও  অনেকগুলি খাদ্য-পন্য ব্যবসায়ীরা একটি পণ্যের লাইসেন্স নিয়ে ৮/১০ পন্য বাজারজাত করছে। আবার ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থান থেকে আউট র্সোসিং করে খাদ্য-পণ্য বাজারজাত করছেন। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলি যে উৎস থেকে খাদ্য-পণ্য সংগ্রহ করছেন তার মান বিএসটিআই কর্তৃক সনদ প্রাপ্ত নয়।

উখিয়া-টেকনাফের অস্থায়ী শিবিরে আশ্রিত, মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মাঝে বিতরণ করা ত্রাণ -সামগ্রী খোলাবাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে হরদম। আর তাদের কাছ থেকে সংগ্রহীত পণ্য সামগ্রী গুলো ঘিরে চলছে অধিকাংশ ভেজাল ও মেয়াদউত্তীর্ন পন্যের রমরমা বানিজ্য। রোহিঙ্গা পণ্যের বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠা একটি সিন্ডিকেট উখিয়া ও তার পার্শবর্তী উপজেলা- সদর কক্সবাজার থেকে ভেজাল ও মেয়াদউত্তীর্ন নানান ধরণের পণ্য সংগ্রহ করে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে উখিয়ার প্রত্যন্তঞ্চলে গড়ে উঠা ত্রাণ বাজারে। সরেজমিনে দেখা যায়, উখিয়া সদর ষ্টেশন, কোটবাজার, মরিচ্যা বাজার,সোনারপাড়া,থাইংখালী,পালংখালী ও কুতুপালং বাজার সহ বিভিন্ন জায়গায় ও স্থান সমুহে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত গভীর পর্যন্ত বসে জমজমাট এ ত্রাণের বাজার। পর্যটকদের অনেকের বিশ্বাস, সরকার বা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা কর্তৃক রোহিঙ্গাদের মাঝে যে সব ত্রাণ বিতরণ করা হয় তা খুবই উন্নতমানের এবং ভেজালহীন। যার কারণে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন দেশীয় পর্যটক শখ করে হলেএ কিছু না কিছু ক্রয় করতে ছুটে যাচ্ছেন ত্রাণ বাজারে। কারণ স্বাভাবিক বাজারের চেয়ে রোহিঙ্গাদের নিকট থেকে সংগৃহিত পণ্য সুমহের দাম অনেকটা কম হওয়াতে ক্রেতাদেরও তা ক্রয়ের আগ্রহ একটু বেশী। ক্রেতাদের সেই আগ্রহকে পুঁজি করে এক শ্রেনীর প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছে ভেজাল ও মেয়াদউত্তীর্ন পণ্যের রমরমা ব্যবসা। যার ফলে সস্তায় ত্রাণের মাল কিনতে এসে চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছে তারা। বলতে গেলে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা ভেজাল ও মেয়াদউত্তীর্ণ তেল, ডাল, লোশন, দুধ, সেন্ট, কাপড় কাচার পাউডার, শ্যাম্পু, চা পাতা সহ নানান ধরণের নকল প্রসাধনী সামগ্রী বিদেশী এনজিও কর্তৃক দেয়া রোহিঙ্গা পণ্য বলে নির্বিঘ্নে বিক্রি করে রাতারতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিনত হচ্ছে প্রতারক চক্র। এছাড়াও গামছা, কম্বল, শাড়ি, লুঙ্গী, চাদর, পুরাতন কাপড়ের বাজার হতে সংগৃহিত নানান ডিজাইনের কাপড় রোহিঙ্গা পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে দেদারছে। রোহিঙ্গা বাজার থেকে পণ্য ক্রয় করতে আসা এক পর্যটক  বলেন, "ভাই লোক মুখে শুনেছি বাজারে রোহিঙ্গাদের দেয়া বিভিন্ন পণ্য দামে সস্তায়, মানও ভালো পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম সব তুঘলকিকান্ড, যেসব মালামাল বিদেশীদের প্রদত্ত রোহিঙ্গা পণ্য নাম দিয়ে বিক্রি করছে তা এ দেশেরেই তৈরী বিভিন্ন ভুঁয়া কোম্পানীর নিম্ন মানের পণ্য মনে হয়।যা দেশের সব মেয়াদহীন ও ভেজাল মালামালের অঘোষিত বাজার, এক কথায় উখিয়া ত্রানের বাজার গুলোতে চলছে ভেজালের সমাহার।" লেবেলহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্য বিক্রি করা দন্ডণীয় অপরাধ। বিষয়টি জেনেও দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার জেলা শহরেও চলছে এই কারবার। কক্সবাজার শহরে ভ্রমণে আসা দেশ-বিদেশের পর্যটক এর শিকার। কক্সবাজার শহরের ভেজাল পণ্য বিক্রির মার্কেট হিসেবে পরিচিত বাজারঘাটাস্থ জমজম মার্কেটে দীর্ঘদিন ধরে নেই কোন ভেজালবিরোধি অভিযান। এ বিষয়ে নজর নেই বিএস টি আই ও ভোক্তা অধিকারেরও।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি সমন্বিত টিম ভেজাল ও নকল পণ্যবিরোধি অভিযান পরিচালনা করে। এ টিমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকেন। এ ছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তিন থেকে চারটি টিম প্রতিদিন বাজার অভিযান পরিচালনা করছে।

কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সূত্র জানায় তাঁর উলটো চিত্রের কথা। সূত্র জানায়- লোকবল সংকটের কারণে অধিদপ্তরের কাজগুলো থমকে আছে। মাত্র একজন সহকারী পরিচালক ও একজন কম্পিউটার অপারেটর-কাম-অফিস সহকারী দায়িত্ব পালন করেন অধিদফতরের কাজে। অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এজন্য নতুন ২ হাজার ৩০০ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হয়ে বিষয়টি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (উপসচিব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘ভোক্তার অধিকার অক্ষুন্ন রাখতে আমাদের কর্মকর্তারা অনেক তৎপর। লোকবল সংকট থাকলেও বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির আওতায় আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। এ বছর সারাদেশে ১০ হাজার অভিযান পরিচালনার একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি জমা হওয়া হাজার হাজার অভিযোগ নিষ্পত্তির পরও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।’ একই ব্যাপারে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘মানুষের ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম ঠিক রাখা সরকারের দায়িত্ব। অনেক সময় দেখা যায়, মজুদদারি, সরবরাহ ব্যাহত করা, চাঁদাবাজি এমন নানা অপকর্মের কারণে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং দুষ্কৃতকারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। এজন্য মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার কিন্তু সবসময়ই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, নিরাপদ খাদ্য আইন, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনসহ অনেক আইন করেছে বাজার ঠিক রাখতে। এ আইনগুলো বাস্তবায়নে আরও তদারকি প্রয়োজন।’ ভোক্তা অধিকারের মাত্র একজন কর্মকর্তা দিয়ে জেলা চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকবল সংকট রয়েছে, তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআইসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি।’

অভিযোগ বাড়ছে

২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন পাস হয় আর ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল আইনটির বাস্তবায়ন শুরু করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫২ হাজার ১০৮টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা ঠকানোয় জরিমানা করা হয়েছে।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১০ থেকে গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতারিত ভোক্তার ২১ হাজার ১৮৯টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮ হাজার ৮০৯টি। তদন্ত চলছে বাকি দুই হাজার ৩৮০টি।

আইন অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে জরিমানা হয় তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী পেয়ে থাকেন। যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, তাতে জরিমানা হয়েছে ৪১ কোটি ১৫ লাখ এক হাজার টাকা। এর মধ্যে ভোক্তার অভিযোগে জরিমানা হয়েছে ৩০ কোটির মতো। আর অভিযোগকারীরা পেয়েছেন ৭৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৭ টাকা।

অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম তিন বছরে খুব বেশি অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে যে কটি জমা পড়েছে, নিষ্পত্তি হয়েছে তার সব কটি।

২০১০ থেকে ২০১৩ অর্থবছরে অভিযোগ জমা পড়ে ১৭৯টি। ১৭ জন অভিযোগকারী পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫০০ টাকা।

এর পরের প্রতি বছরই বাড়ছে অভিযোগ আর অভিযোগকারীর সংখ্যা। ২০১৪-১৫ সালে অভিযোগ জমা পড়ে ২৬৪টি। নিষ্পত্তি হয় সব কটি। এদের মধ্যে ১০৭ জন অভিযোগকারী ২৫ শতাংশ হিসেবে পেয়েছেন এক লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে অভিযোগ জমা পড়ে ৬৬২টি। অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৯২ জন জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে পেয়েছেন দুই লাখ ৯৩ হাজার ৮৭৫ টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় দশ গুণ। সে সময় ছয় হাজার ১৪০টি অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় সব কটি। আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক হাজার ৪১৬ জন ভোক্তা জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে পেয়েছেন ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৬৭৭ টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভিযোগের সংখ্যা আরও প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ে। ওই বছর জমা পড়ে নয় হাজার ১৯টি অভিযোগ। নিষ্পত্তি হয় সব কটি। আর প্রমাণিত হওয়ার পর এক হাজার ৯৩৪ জন অভিযোগকারী জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে পেয়েছেন ৩৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযোগ জমা পড়েছে চার হাজার ৯২৫টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে দুই হাজার ৫৪৫টি। তদন্ত চলছে দুই হাজার ৩৮০টির। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ৮৩১ জন অভিযোগকারী জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে পেয়েছেন ১৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৫ টাকা।

তাদের মতে, এখন পর্যন্ত অভিযোগ যা জমা পড়েছে তার সিংহভাগই ঢাকায়। মূল পর্যটন নগরীগুলোতে এখনো অভিযোগ দেওয়ার হার কম। আর সেখানে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টাও চলছে।

নেই যথাযথ আইনের প্রয়োগ

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রচলিত আইনের শক্ত প্রয়োগ না থাকায় নকল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারীদের ঠেকানো যাচ্ছে না। যদিও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশে আইনের অভাব নেই। তবে বড় বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, ভোক্তার নিজের সচেতনতার অভাব ও দুর্নীতির একটি দুষ্টচক্রের কারণে গুরুতর অপরাধ করেও নকল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, গত বছর নকল ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলাও করেননি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এই আইনের ২৫ এর (গ) ধারায় মামলা করলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ছোটখাটো সাজা ও জরিমানা হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এরাই আবার অপরাধে জড়ায়। তবে গত ১২ মাসে নকল ও ভেজাল পণ্যের কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১৯টি মামলা করেছে র‌্যাব। সংস্থাটির দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হলেও চূড়ান্তভাবে এসব মামলার ফল ভালো পাওয়া যায় না। অনেকেই সাক্ষ্য দিতে হাজির হয় না। তাই আসামিরা পার পেয়ে যায়। নকল ও ভেজাল পণ্যের কারণে দায়ের করা মামলায় দেশের কারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তা একদিকে দেশের অর্থনীতিকে যেমন আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। তাই নকল পণ্য উৎপাদন ঠেকানোয় সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি করা না গেলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন। সরকারের রাজস্ব আহরণে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নকল ও ভেজাল পণ্য কিনে প্রতারিত হলে তার প্রতিকারের জন্য ভোক্তা নিজেই আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন। বিশ্বের অনেক দেশেই নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তার ব্যক্তিগত সচেতনতা অনেকদূর এগিয়েছে। নানা কারণেই ভোক্তা আইন প্রয়োগে দেশে ভোক্তার সচেতনতা সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। ১৯৯৪ সালে ইসা লিসবেক নামের এক মার্কিন নারীর শরীরে ম্যাকডোনাল্ডসের ৫০ সেন্টের কফি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে দিতে হয়েছে ছয় লাখ ডলার। অভিযোগ ছিল- স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফি সরবরাহ করা হয়েছিল।

সংশ্নিষ্টরা আরো জানান, নকল ও ভেজাল রোধ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে বাংলাদেশে আইন রয়েছে অনেক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনগুলোর অধীনে কিছু জরিমানা ও সর্বোচ্চ দুই বছরের শাস্তি দেওয়া হয়। কেউ কেউ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। অনেকে আবার জামিনে বেরিয়ে একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছেন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (গ) এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল মেশালে বা ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করার অপরাধ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদে র বিধান আছে। তবে এই আইনে মামলা হয় খুবই কম। আবার মামলা হলেও কারও শাস্তির নজির নেই।

বর্তমানে দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নকল ও ভেজাল রোধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। বিএসটিআই আইন-১৯৮৫ সংশোধন করে ২০১৮ সালে নতুন আইন করা হয়। আগের আইনে জরিমানা ছিল সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। নতুন আইনেও জরিমানার অঙ্ক এক লাখ টাকা। আর সাজার মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর।

র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম এ বিষয়ে বলেন, জামিনে বেরিয়ে বারবার একইভাবে নকল পণ্য তৈরি করছে একই চক্র। এ কারণে তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। দেশে আইন অনেক থাকলেও বড় নকল পণ্যের সঙ্গে জড়িতদের বড় কোনো শাস্তি হয়নি। নকল পণ্য উৎপাদনকারী ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে  সাধারণত চারটি আইন প্রয়োগ করা হয়। তা হলো- নিরাপদ খাদ্য আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, বিএসটিআই আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইন। এই আইনের অধীনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিধান রয়েছে। তবে মোবাইল কোর্ট কাউকে দুই বছরের বেশি সাজা দিতে পারেন না।

নকল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে জড়িত এক কর্মকর্তা জানান, নকল ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়েও তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় বিভিন্ন সময় সমস্যায় পড়েন তারা। অনেক খাবারের সঙ্গে 'রঙ' মেশানো হয়। তবে কী ধরনের রঙ কতটুকু মেশালে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর তা যথাযথভাবে পরীক্ষার জন্য মেশিনপত্র দেশে নেই বললেই চলব।

মূলত ভেজালবিরোধি অভিযানগুলো নিয়মিত সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত না হওয়া, যথাযথ আইন ও আইনের প্রয়োগ না থাকা। এসব নানবিধ সংকটে পর্যটক হারাচ্ছে পর্যটন নগরীগুলো আর সেই সাথে সরকার হারাচ্ছেন রাজস্ব।

আগামীনিউজ/মিথুন 

আগামী নিউজ এর সংবাদ সবার আগে পেতে Follow Or Like করুন আগামী নিউজ এর ফেইসবুক পেজ এ , আগামী নিউজ এর টুইটার এবং সাবস্ক্রাইব করুন আগামী নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে