Agaminews
August
উৎপাদনে ২৬%, আমদানীতে ৫%

বিটুমিনের কর কাঠামোতে এক দেশে দুই নিয়ম


আগামী নিউজ | ‍নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২১, ০৯:৪৯ এএম
বিটুমিনের কর কাঠামোতে এক দেশে দুই নিয়ম

ঢাকাঃ সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের অন্যতম উপকরণ দেশি বিটুমিন উৎপাদনে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত করহার নির্ধারণকে অন্যায়, অযৌক্তিক ও অন্যায্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও কর-বিশ্লেষকরা। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী শিল্প সুরক্ষা চাইলেও কিছু সরকারি কর্মকর্তা সঠিকভাবে কাজ করেন না।

সরকারের ভিতর একটি গোষ্ঠী দেশি শিল্পের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। শিল্পমালিকরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেন। বিটুমিনে কর কমাতে হবে। বিটুমিন নিয়ে এক দেশে দুই নিয়ম হতে পারে না। আমদানিতে বিশাল ছাড় দিয়ে নজিরবিহীন কর-বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের রাজস্বনীতি দেশীয় শিল্পের স্বার্থবিরোধী, সরকারের শিল্প সুরক্ষা নীতির পরিপন্থী। এতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মনীতি ভঙ্গ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রীতিনীতিবিরুদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, বিটুমিনসহ সব দেশীয় শিল্প খাতকে সুরক্ষা দেওয়া উচিত। কর আরোপের ক্ষেত্রে সরকারের শিল্প উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নিতে হবে।

তবে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সহ-সভাপতি এম এ মোমেন বলেন, স্থানীয়ভাবে বিটুমিন উৎপাদনে প্রায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ দেশীয় শিল্প খাতের প্রতি চরম অন্যায়, অন্যায্য ও অযৌক্তিক। যে কোনো স্থানীয় শিল্পের মূলধনী কাঁচামাল আমদানিতে কর ৫ শতাংশের বেশি হতে পারে না। দেশীয় শিল্পমালিকরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেন। সংকট উত্তরণে বিটুমিন উৎপাদন পর্যায়ে কর কমাতে হবে। এর সঙ্গে আমদানিকারকদের কারসাজি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এ নিয়ে সংসদেও কথা উঠেছে।

জানা গেছে, বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশীয় বিটুমিন শিল্পে উৎপাদন পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কর বিদ্যমান থাকলেও আমদানিতে অনেক কম। বিটুমিন উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে অন্যায্যভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বিদ্যমান। অথচ পরিশোধিত বিটুমিন আমদানিতে ভ্যাট নেই। আমদানির বিটুমিন সরবরাহ পর্যায়ে যেখানে ভ্যাট মাত্র ৫ শতাংশ, সেখানে দেশীয় উৎপাদকের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাটের খড়গ রয়েছে। বিটুমিন উৎপাদনে প্রতি টনের কাঁচামাল আমদানিতে খরচ ৫৭০ ডলার হলেও আমদানিতে তা ২৬০ ডলার। এই বৈষম্যমূলক করকাঠামো বাতিল করে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন বাণিজ্য বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য ও রাজস্বনীতি বিশ্লেষক মনজুর আহমেদ বলেন, দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর কমাতে হবে। বিটুমিন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল পেট্রোলিয়াম অয়েলস অ্যান্ড অয়েলস অবটেইন্ড মিনারেলস, ক্রুুড আমদানিতে শুল্ককর বা সিডি ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা উচিত। আর ১৫ শতাংশ ভ্যাট যেহেতু আমদানিতে নেই, তাই উৎপাদনেও রাখা যাবে না। এর সঙ্গে আগাম কর বা এটি ৩ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর বা এআইটি ২ শতাংশ বাতিল করতে হবে। কারণ এ ধরনের করকাঠামোর মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মনীতি ভঙ্গ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রীতিনীতিবিরুদ্ধ পদক্ষেপ।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অগ্রিম আয়কর বা এআইটি দিয়ে ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট বা এটিভি আগে ছিল বাণিজ্যিক আমদানিতে। এখন কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর বা এটি আরোপ করা হয়েছে, যা প্রত্যাহার করা উচিত। তার মতে, যেখানে তৈরি পণ্য আমদানিতে ভ্যাট নেই, সেখানে উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অযৌক্তিক ও অন্যায়। দেশীয় বিটুমিন সরবরাহ পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাটও অপ্রত্যাশিত।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় গুরুত্ব দিলেও কিছু সরকারি কর্মকর্তা সঠিকভাবে কাজ করেন না। শুধু বিটুমিন নয়, ২৬ শতাংশ কর দিয়ে কোনো দেশীয় শিল্প চলবে না। বিশ্বের কোনো দেশ নিজের দেশের শিল্প সুরক্ষা না দিয়ে এগোতে পারেনি। আমাদেরও বুঝতে হবে, শিল্প ছাড়া দেশের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হবে না। দেশীয় শিল্প উৎসাহিত না হলে দেশ এগোবে না।’

জানা গেছে, বিটুমিন উৎপাদনে প্রধান কাঁচামাল পেট্রোলিয়াম অয়েলস অ্যান্ড অয়েলস অবটেইন্ড মিনারেলস, ক্রুড, যার এইচএস কোড ২৭০৯.০০.০০। এই কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর বা সিডি ৫ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, আগাম কর বা এটি ৩ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর বা এআইটি ২ শতাংশ। এই করকাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ শতাংশ সিডিসহ  মোট আমদানি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া প্রতি ব্যারেলের ট্যারিফ মূল্য ৪০ ডলার নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে দেশে এইচএস কোড ২৭১৩.২০.১০ এবং ২৭১৩.২০.৯০ এর মাধ্যমে ফিনিশড বা তৈরি বিটুমিন আমদানি হয়ে থাকে।

ড্রামে বিটুমিন আমদানিতে প্রতি টনের শুল্ককর নির্ধারিত আছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর বা এআইটি ২ শতাংশ এবং আগাম কর বা এটি ৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিটুমিন নামে যদি কেউ বাল্ক আকারে আমদানি করে, সে ক্ষেত্রে প্রতি টনে ৩ হাজার ৫০০ টাকা আমদানি শুল্ক নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে এআইটি ২ শতাংশ এবং এটি ৩ শতাংশ প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, বিটুমিন আমদানির চেয়ে উৎপাদনে বাড়তি কর আরোপ দেশীয় শিল্পের স্বার্থবিরোধী। সরকারের শিল্প সুরক্ষা নীতিরও পরিপন্থী। দেশীয় শিল্পের সঙ্গে এই বৈষম্যমূলক করকাঠামো যথাযথ কর্তৃপক্ষের সংশোধন করা উচিত। কারণ শিল্পের সংরক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারের।

এদিকে সারা দেশের ফিনিশড বা তৈরি বিটুমিন আমদানিতে মূল্য ঘোষণায় কারসাজির তথ্য পাওয়া গেছে। কাস্টমস সূত্র বলছে, অসাধু আমদানিকারকরা আন্ডার ইনভয়েসিং বা দাম কম দেখিয়ে প্রতিদিন বিটুমিনভর্তি হাজার হাজার ড্রাম খালাস করেন। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে শুল্ক ফাঁকি। বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। রাস্তা নির্মাণে ব্যবহৃত বিটুমিন আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা থামছে না। ভেজাল বিটুমিন আসছেই।

আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধে কাস্টমসের নজরদারি রাখতে হবে। দেশে যেহেতু উন্নত মানের বিটুমিন উৎপাদন হচ্ছে, তাই আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে। জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে বিটুমিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় বিটুমিনাস ক্রুডের চেয়ে পরিশোধিত বিটুমিনের আমদানি শুল্ক কম রাখা হয় কেবল স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু বর্তমানে গুণগত মানসম্পন্ন বিটুমিন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা বিবেচনায় আমদানি শুল্ক কাঠামো স্থানীয় শিল্পবান্ধব করে পুনরায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে দেশীয় শিল্প রক্ষায় এ ধরনের নীতি সবারই অনুসরণ করা উচিত। এদিকে আমদানি হওয়া ফিনিশড বিটুমিন এবং দেশীয় উৎপাদিত বিটুমিনের স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ের বৈষম্যমূলক চিত্রের দেখা মিলেছে।

জানা গেছে, ড্রাম ও অন্যান্য বিটুমিন আমদানিতে কোনো অগ্রিম ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পরিশোধ করতে হয় না। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট পণ্যসমূহ ‘মূল্য সংযোজন কর’ অব্যাহতিপ্রাপ্ত। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর তৃতীয় তফসিল টেবিল-১ অনুযায়ী, বাল্ক বিটুমিন আমদানিতে স্থানীয়ভাবে সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার স্থায়িত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে প্রথম বিটুমিন অ্যাসফল্ট প্লান্ট স্থাপন হয়েছে, যা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিতেও সক্ষম। ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী দেশীয় সিমেন্টশিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাল্ক সিমেন্ট আমদানির ওপর ৩০০ শতাংশ ডিউটি আরোপ করে সিমেন্টশিল্পকে রক্ষা করেছেন।