Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

শিশু কন্যাকে কোলে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন মা


আগামী নিউজ | গাজীপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২১, ১০:২৩ পিএম
শিশু কন্যাকে কোলে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন মা

ছবি: আগামী নিউজ

গাজীপুর: রেলপথের দুুটি লাইনের মাঝ থেকে মাথা তোলে মা মা ডেকে দাঁড়ানোর সময় হাত ও মাথার ক্ষতস্থানে কাপড় পেঁচিয়ে কোলে তুলে নেন এক গৃহবধূ হাজেরা খাতুন। আনুমাণিক দেড় বছর বয়সী শিশুটির বাম হাতের মাংস থেতলে গেছে। মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এতোকিছুর পরও শিশুটি খুব বেশি কান্নাকাটি করেনি। তবে বার বার সে পানি খাচ্ছিল।

শিশুটিকে কোলে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারের ঘটনা এমনভাবেই ব্যাখ্যা দেন গৃহবধূ হাজেরা খাতুন। বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল সড়কের গাজীপুরের শ্রীপুর রেলস্টেশনের উত্তরপাশে (কাঁটাপুল সংলগ্ন) এলাকায় ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুর মা নিহত হন। 

নিহত নাদিরা আক্তার নেত্রকোনা সদর উপজেলার বরুনা গ্রামের চানতু মিয়ার মেয়ে। তার স্বামী জুয়েল রানা একই উপজেলার বারহাট্টা গ্রামের বাসিন্দা। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া শিমু মেয়ে তানহা। এ দম্পতি শ্রপিুর পৌরসভার আনসার রোড এলাকায় বসবাস করতো।

গৃহবধূ হাজেরা খাতুন ও প্রত্যক্ষদর্শী নাছিমা খাতুন জানায়, ময়মনসিংহগামী বলাকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি শ্রীপুর স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছিল। ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়ার সময় চলন্ত ট্রেনটি বিরতিহীনভাবে হর্ণ দিচ্ছিল। এসময়ে এলাকার বিভিন্ন ঘরের ছেলে-মেয়েরা মক্তবে (সকালে মাদ্রাসায়) যাওয়ার জন্য বের হয়েছে। কারও সন্তান রেলের ওপর চলে গেল  কিনা তা দেখার জন্য রেলপথের আশপাশের বাড়ির নারীরা ঘর থেকে বের হয়ে উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিল। ততক্ষণে ট্রেনটি ঘটনাস্থল অতিক্রম করে ফেলেছে। পরক্ষণেই দেখা যায় রেলপথের ঠিক মাঝ থেকে রক্তাক্ত এক শিশু মাথা তুলে মা মা বলে ডাকছে। সে উঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারছিল না। শিশুটির মায়ের বিচ্ছিন্ন মরদেহ শিশুর খুব কাছেই পড়েছিল।

হাজেরা খাতুন বলেন, চলন্ত ট্রেনের নিচে বেঁচে থাকাটা তার কাছে বিষ্ময়ের। দৌড়ে কাছে গিয়ে দেখতে পান শিশুটির বাম হাতের বাহু থেকে কুনুই পর্যন্ত কিছু মাংস থেতলে পড়ে গেছে। মাথায় রক্তাক্ত জখম হয়েছে। শিশুর মায়ের ওড়না টেনে ক্ষতস্থানসমূহ পেঁচিয়ে ধরে কোলে তোলে নেন। বাসা থেকে এক ফিডার ভর্তি দুধ নিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে সোজা চলে যান শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যান ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

গৃহবধূ হাজেরা খাতুনের স্বামী এবং উদ্ধারকাজে যুক্ত থাকা আবু হানিফা শ্রীপুর খাদ্য গুদামের শ্রমিক। তিনি বলেন, শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার ভাইয়ের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার চেয়ে বউকে দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে পাঠান। এসময় শ্রীপুর বাজারের সহৃদয়বান অনেকেই চিকিৎসার জন্য কিছু কিছু আর্থিক সহায়তা দেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকগণ কিছুটা চিকিৎসা দিয়ে শিশুটির ক্ষতস্থানে মাংস লাগানোর পরামর্শ দিয়ে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে তারা গাজীপুর অতিক্রম করেন।

আবু হানিফা জানান, তার একটিমাত্র ছেলে কামরুল হাসান (৭) রয়েছে। এ শিশুটিকেও তার স্ত্রী ও তিনি সন্তান স্নেহে লালন পালন করতে চান। যদি বৈধ অভিভাবক এসে নিয়ে যেতে চান সে ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। তবে সৃষ্টির সেবা করতে একজন শিশুমানবের পাশে মানুষ হিসেবে দাঁড়ানোর কর্তব্যটুকু করতে পারার সন্তুষ্টি থাকবে আমৃত্যু।

শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার হারুনুর রশিদ জানান, সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বলাকা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে আনুমাণিক দেড় বছর বয়সী শিশু কন্যাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয় এক নারী। এতে ঘটনাস্থলেই নারীর শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যায়। স্থানীয়রা শিশু কন্যাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। হতাহত মা-শিশুর পরিচয় পাওয়া যায়নি।

আগামীনিউজ/ হাসান