Agaminews
 অমর একুশে
Dr. Neem Hakim

ভাষা সংগ্রামীদেরকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হোক


আগামী নিউজ | মোখলেছুর রহমান, মাগুরা জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১, ০৮:২৪ পিএম
ভাষা সংগ্রামীদেরকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হোক

আগামী নিউজ

মাগুরাঃ প্রতি বছর ভাষা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হলেও মফস্বলের ভাষা সংগ্রামীরা সে আনুষ্ঠানিকতার আড়ালেই থেকে যায়। স্থানীয় প্রশাসন একুশে ফেব্রুয়ারির দিনেও খোঁজ নেয় না এ সব ভাষা সংগ্রামীদের। ভাষা সংগ্রামীরা তাঁদের প্রাপ্ত যথাযথ সম্মান না পাওয়ায় চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন মাগুরার প্রবীণ ভাষা সংগ্রামী খান জিয়াউল হক।

ভাষা সংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ খান জিয়াউল হক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, জীবন সায়াহ্নে এসেও তিনি নানা ধরনের সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত। যদিও ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা যুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল, তথাপী ভাষা সংগ্রামীদেরকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। ৫২’ ফেব্রুয়ারি মাসের উত্তাল দিনগুলোতে ভাষা সংগ্রামীদের বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে, তবুও ভাষা সংগ্রামীরা আজও চরম ভাবে অবহেলিত।

কথা প্রসঙ্গে ৯৪ বছর বয়সী ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক বলেন, তাঁর কাছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট। মাগুরার ভাষা সংগ্রামীরাও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ৫২’ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। তাঁর দেয়া তথ্য মতে, মাগুরার বেশ কয়েকজন ভাষা সৈনিক ওই সময় পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। কিন্তু এসব ভাষা সংগ্রামীদের অধিকাংশই এখনো অজ্ঞাত অখ্যাত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

তিনি জানান, ১৯৪৮ সালে ঊর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা এলে তখন তিনি যশোর এমএম কলেজে ছাত্র। এসময় এমএম কলেজর সাধার ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল করে। সে সময় খুব বেশি আন্দোলন দানা না বাঁধলেও ৫২ সালে সারাদেশে যখন ভাষা আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে তখন তিনি বিএ পরিক্ষার্থী। যশোর শহরে তখন প্রতিদিন মিছিল মিটিংএ খান জিয়াউল হক অগ্রভাগে থাকেন।

যেহেতু তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন তাই তাকে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ সরাসরি জানিয়ে দিল ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাদের আপত্তির কথা। খান জিয়াউল হক কলেজে তার অনুসারিদের নিয়ে বৈঠক করে মুসলিম ছাত্রলীগ ত্যাগ করেন। মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দ প্রবল চাপ প্রয়োগের সাথে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। ১৫ ফেব্রুয়ারির দিকে তিনি বন্ধুদের পরামর্শে নিজ বাড়ি মাগুরায় চলে আসতে বাধ্য হন। মাগুরায় ফিরে আসার পর যুক্ত হন মাগুরার আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে।

যদিও প্রাথমিক ভাবে তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাতে ভাষা আন্দোলনের সুচনা হয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ সারা দেশের মতো মাগুরাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। স্থানীয় ছাত্রনেতারা ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই তৎকালীন ইসলামিক কলেজ যা বর্তমানে মাগুরা সরকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ হিসেবে পরিচিত সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে নিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্টিত করার আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনে অংশ নিয়ে তৎকালীন সময়ে স্কুল বয়সেই অনেকে জেল-জুলুম, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।

এরপর তারা মাগুরার মহকুমার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়। ছাত্রনেতা নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়া, খান জিয়াউল হক, আমিনুল ইসলাম চান্দু মিয়া, জলিল খান এবং আজিম দেওয়ান প্রধানতঃ মহকুমা সদরে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বলে তিনি জানান। তবে খান জিয়াউল হক এখনো ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বেঁচে থাকলেও অপর চারজন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।

আন্দোলনের চরম মুহুর্ত সম্পার্ক তিনি বলেন,‘২১ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনা জানতে পেরে আমরা পরদিনই মাগুরার সংগঠক নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়ার সাথে দেখা করি। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি মিছিল ও সমাবেশ করা হবে। ২৩ ফেব্রƒয়ারি সকালেই সবাই শহরের সেগুনবাগিচায় একত্রিত হই। সেখানে আবু মিয়ার সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে আমরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে আসতেই পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও আমি, জলিল খান এবং চান্দু মিয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। আমাদেরকে পার্শ্ববর্তী জিআরও অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। পরে ছাত্রদের বিক্ষোভের চাপে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।’

এছাড়াও সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের ছাত্রনেতা মীর্জা শওকত মাগুরায় এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভা সমাবেশ করতে থাকেন। এছাড়াও ৫৪’ সালে মাগুরার শ্রীপুর থানার রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র একে হামিদুজ্জামান এহিয়া শ্রীপুর থানার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ভাষা আন্দেলনের পক্ষে সংঘটিত করতে থাকেন। ওই সময় হামিদুজ্জামান এহিয়াকে বেলুচ আর্মড ফোর্স গ্রেফতার করে। তার উপর অমানুসিক পুলিশি নির্যাতন চালানো হয় বলে ভাষা সৈনিক খান জিয়াউল হক জানান।

এ প্রতিনিধির কাছে আলাপকালে খান সৈনিক জিয়াউল হক নিজ মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, জীবনে যা পেয়েছি তা অনেক। তবে একটাই আক্ষেপ, আজও পর্যন্ত ভাষা সংগ্রামীদেরকে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলোনা। মুক্তিযোদ্ধাদের মত কেন ভাষাসংগ্রামীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় না। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মকে ভাষা সৈনিকদের অবদান সম্পর্কে জ্ঞাত করা অত্যন্ত জরুরী ছিল। কারণ এতে করে জাতীয় যে কোনো সংকটে নতুন প্রজন্মও যে কোন ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হতো।   

আগামীনিউজ/এএস