Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

কন্যা সন্তান হওয়ায় জঙ্গলে ফেলে দিলেন মা


আগামী নিউজ | রফিকুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২০, ০৫:৩৯ পিএম
কন্যা সন্তান হওয়ায় জঙ্গলে ফেলে দিলেন মা

ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জঃ একজন সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হল মায়ের কোল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।  শুধুমাত্র কন্যা সন্তান হওয়ায় জন্মের কয়েক মিনিট পরই মা হাতে করেই জঙ্গলে আশ্রয় হয় নবজাতকটির।
 
এমনই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ফরাজীকান্দা বড় মসজিদ সংলগ্ন খালপাড় এলাকায়। শুক্রবার (২০ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় জন্ম হয় তাঁর।  ফেলে দেয়ার দুই ঘণ্টা পর ভাগ্যক্রমে নবজাতকটিকে উদ্ধার করা  গেলেও  শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায় নি নবজাতকটিকে ।
 
এদিকে স্ত্রীর এমন কান্ডে হতভম্ব  লাল মিয়া নিজেও। শুক্রবার রাতেই নিহত নবজাতকটির বাবা লাল মিয়া বাদি হয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে বন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এদিকে রাতেই নবজাতকের মা রিক্তা বেগম (৩০) কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বন্দর থানার এসআই মো. জিয়াউর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
 
লাল মিয়ার দাবি আর্থিকভাবে তিনি দূর্বল হলেও নিজের সন্তানকে লালন পালনের জন্য আরো কষ্ট করতেও রাজি ছিলেন তিনি।  গ্রেপ্তার রিক্তা বেগম জামালপুর পূর্বকান্দি এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের মেয়ে ও একই এলাকার লাল মিয়ার স্ত্রী। সে বন্দরে একটি গার্মেন্টে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। তাদের রিয়াদ নামে ৭ বছরের  ছেলে সন্তানও আছে।
 
পুলিশ ও মামলা  সূত্রে জানা যায়, পেশায় শ্রমিক লাল মিয়া নারায়ণগঞ্জে একটি আটার মিলে স্বল্প বেতনে কাজ করেন। সে জামালপুর পূর্বকান্দি এলাকার আবু বক্করের ছেলে। প্রায় ১০-১২ বছর আগে একই এলাকার রফিকুল ইসলামের মেয়ে রিক্তা বেগমের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের ৪ মাস পরই তারা আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য নারায়ণগঞ্জের বন্দরে আসেন।  এরই মধ্যে তাদের রিয়াদ নামে এক সন্তানের জন্ম হয়।
 
এদিকে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য স্বামীর পাশাপাশি রিক্তা বেগমও স্থানীয় একটি গার্মেন্টে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। এরই মধ্যে কোলজুড়ে আসে তাদের দ্বিতীয় সন্তান। শুক্রবার (২০ নভেম্বর) সাড়ে ১০ টায় জন্ম  নেয়  লাল মিয়া দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। কিন্তু কন্যা সন্তান হওয়ায় জন্মের কিছুক্ষণ পরই সবার অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুরের জঙ্গলে ফেলে দেয় নবজাতকের মা রিক্তা বেগম।
 
পরে বেলা ১২টার দিকে  পুকুরপাড়ে জঙ্গলে কান্নাশব্দ শুনে সজিব নামে এক স্থানীয় যুবক মূমুর্ষ অবস্থায় নবজাতকটিকে উদ্ধার করে বন্দর থানায় হস্তান্তর করে। অসুস্থ অবস্থঅয় প্রথমে একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয় পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এরই মধ্যে ফরাজীকান্দায় অভিযান চালিয়ে তার বাবা মাকে খুঁজে বের করে পুলিশ। এরপর নবজাতককে বাবা মার কাছে দেওয়া হয়। কিন্তুচিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে শিশুটির মৃত্যু হয়।  পরে এ ঘটনায় নিহত নবজাতকের বাবা স্ত্রী বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন।
 
নবজাতক উদ্ধারকারী বন্দরের ফরাজীকান্দা এলাকার যুবক সজিব জানান, শুক্রবার দুপুরে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এ সময় ফরাজীকান্দা খালের পাড় এলাকায় পৌঁছালে  পুকুরের পাশে একটি জঙ্গল থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। সামনে গিয়ে কাপড় মোড়ানো অবস্থায় একটি নবজাতক দেখতে পান। পরে নবজাতকটিকে বন্দর থানায় হস্তান্তর করেন।  
 
বন্দর থানার এসআই মো. জিয়াউর রহমান জানান, ঘটনার পর পরই নবজাতকের বাবা-মাকে খুঁজে বের করে থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে নবজাতকের মা রিক্তা বেগম বিষয়টি স্বীকার করেন যে  কন্যা শিশু জন্ম নেয়ায় কাউকে কিছু না বলে সে পুকুরের পাশে জঙ্গলে ফেলে দেয়। পরে এক যুবক নবজাতকটিকে উদ্ধারের থানায় হস্তান্তর করলে শিশুটি অসুস্থ হওয়ায় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে পুলিশ ফরাজীকান্দায় অভিযান চালিয়ে তার বাবা মাকে খুঁজে বের করে এরপর নবজাতককে বাবা মার কাছে দিয়ে দেয়। কিন্তু শেষ  পর্যন্ত নবজাতকটিকে বাঁচানো যায় নি। 
 
আমরা নবজাতকের মা-বাবাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে নবজাতকের মায়ের কথাবার্তায় সন্দেহজনক মনে  হলে তাকে আটক করা হয়। ইতিমধ্যেই সে নিজের সন্তানকে ফেলে দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
 
মামলা বাদি নিহত নবজাতকের বাবা  লাল মিয়া মুঠোফোনে বলেন, আমি জানি না আমার স্ত্রী এ কান্ড কেন ঘটিয়েছে। আমি তখন কাজে। আমার বাড়িওয়ালা আমারে ফোন দিয়ে বলল তোমার বাচ্চারে মাইরা ফেলছে। আমি মিল থেকে ছুটি নিয়া বাড়িতে এসে শুনি এ খবর। ওর তো মানসিক কোনো সমস্যা ছিলো না। অর্থ সংকট থাকলেও আমি আমার স্ত্রীকে বলে ছিলাম যে আল্লাহ যা দেয় তাই চলবো। তাছাড়া এমনও না যে আমাদের মধ্যে সম্পর্কও খারাপ ছিলো। আমাদের একটা ছেলেও আছে। ও গ্রামে আমার মায়ের কাছে থাকে। আমি একটা মিলে কাজ করি  এবং আমার স্ত্রীও গার্মেন্টে কাজ করে। ভালোই চলতাছিলো সবকিছু।  কিন্তু এ কান্ড কেন ঘটাইলো জিজ্ঞাস করলেই খালি বলে তুমি যাও গা, বাইরে যাও গা। আর কিছুই বলে না।
 
তিনি আরো জানান, আমি সপ্তাহে একদিন  বাড়িত যাই। ও বাসায় ওর ভাই,খালাদের সাথে থাকে। এখন এর ভেতরে কি হইছে আমি জানি না। আমি এখনও হাসপাতালে।  লাশ নেয়ার প্রক্রিয়া চলতাছে।
 
এদিকে নিহত নবজাতকের মা গ্রেপ্তার রিক্তা বেগম জানান, বাচ্চাটা প্রসবের পর দেখি মাইয়া। পরে আমি এটারে পরিস্কার কইরা বাড়ির পাশেই জঙ্গলে ফেলে দিয়া আসি।
 
ফেলে দেয়ার কারণ জানতে চাইলে রিক্ত বেগম কান্না জর্জরিত কণ্ঠে জানান, আমি ভয় পাইয়া গেছিলাম। তাই ফালায় দিছিলাম। আমারে কেউ কিছু কয় নাই । আমার স্বামীও কয় নাই এ কাজ করতে। আমারে মাফ কইরা দেন, আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। আমি আর এমন করমু না। আমার বাবা-মা কেউ নাই। আমি অসহায় ।
 
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফখরুদ্দীন ভূঁইয়া জানান, কেন কি কারণে ওই নারী এ কাজা করেছে তা এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। আসামীকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
 
আগামীনিউজ/এএস