নারী আসলে রাণীও


আগামী নিউজ | মহিউদ্দিন মখদুমী প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২২, ০৮:৪০ পিএম
নারী আসলে রাণীও

একজন নারীকে দেখে তার কাছ থেকে আমার সরতে ইচ্ছে করছে না। খুব সিগেরেট খেতে ইচ্ছে করছে, যাচ্ছি না। কোন ফোন রিভিস করতে ইচ্ছে করছে না। আমি ওই নারীর আশে পাশে ঘুরঘুর করছি। সামনে যাচ্ছি , আবার পিছনে আসছি। অনুমানে বয়স পরিমাপ করছি। সে যাদের সাথে কথা বলছে তাদের চেনার চেষ্টা করছি। ওই নারীর সঙ্গে তার মা এসেছে। দেখে মনে হলো মধ্যবিত্ত পরিবারের। ওই নারী পোষাকের সাথে চেহারার দারুন ম্যাচিং করেছে। গ্রামীন চেক সেলোয়ার কামিজ। মাটিয়া কালার। লাল ওড়না পড়েছে। মুখে কোন প্রসাধনী দেয়নি। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্মা হবে। সুঠাম দেহ। সুন্দর বলে যা বুঝি ঠিক তাই। ক্যাম্পাস ছাড়ার বহুদিন দিন পড়ে বুকে ঝাঁকুনি অনুভব করছি। অস্থিরতা অনুভব করছি। ঘামছি। টিস্যু দিয়ে ঘাম মুছে ফেলছি। হঠাৎ তারা নারী শিশু আদালতের দিকে যাওয়া শুরু করলো। পিছনে পিছনে গেলাম। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ওর এক বেঞ্চ পিছনে বসলাম।  দিনের কার্যদিবসে আদালতের প্রথম মামলা এটি। আইনজীবি সাহেব ওর মাকে এজলাসের কাছে ডাকলেন। দেন মোহরের মামলা।  তিনি মামলার বাদি। ওই নারীর স্বামী আসামী আদালতে হাজির আছেন। বাদি পক্ষের আইনজীবি কথা বলছেন। বিচারক আসামীকে প্রশ্ন করছেন। আসামী বলছেন, আমার দাম্পত্য জীবন ছিল সাত মাসের। তালাক কেন দিলেন? আসামী পুরুষটি বলছে, নারী আমার চোখে রাণী। আমার স্ত্রী রাণীত্ব ধরে রাখতে পারেনি। বিচারক তাকে ছোট ছোট প্রশ্ন করছে। আসামী পুরুষটি জবাব দিচ্ছে। আসামী পুরুষটি বলছে, আমি তাকে দেন মোহরের টাকা দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। আইনজীবির মাধ্যমে দিতে চেয়েছিলাম। গ্রহণ করেনি। আজ টাকা নিয়ে এসেছি। আপনার উপস্থিতিতে দিতে চাই। প্রত্যেক নারী তার স্বামীর কাছে রাণীর মতো। রাণীর যেমন জৌলুস থাকে, অহংকার অভিজাত্য থাকে তেমনি নারীরও থাকার কথা। আমি রাঙামাটিতে চাকুরী করি। পিতার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছি। বিয়ের সময় ২লাখ টাকা দেন মোহর পরিশোধ করেছি। বাকী ১০ লাখ টাকা দেয়ার জন্য জমা রেখেছিলাম। আমাদের কোন অভাব নেই। বিয়ের এক মাসের মাথায় আমার স্ত্রীর অনৈতিক কর্ম দেখে ফেলেছিলাম। সংখ্যায় তা ধীরে ধীরে বাড়ছিল। সে সুন্দরী বলে যার কাছে ইচ্ছে উপভোগ নিতো। ধর্মীয় নীতি নিয়মের কোন বাঁধা তাকে আঁটকাতে পারেনি। জনাব, চরিত্রহীন স্ত্রী খুবই ভয়ংকর। সে আমাকে এক সময় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে। তার অবাধ্য হলে তার পরকীয়া প্রেমিক দিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলতে পারে। আমি তার কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করিনি। প্রতিটি সময়ে মনে হতো সে আমার জন্য নিরাপদ নয়। পরকীয়ার কারণে সংসার গুলো ভাঙছে। আপনার আদালতে মামলা আসছে। আপনি তো সবই জানেন। আমি নির্ভরশীল একজন নারী চেয়েছিলাম। যে আমার জীবনে রাণীর মতো থাকবে। যার কাছে আমি আত্নসমর্পণ করব। আরো এমন কিছু কথা আছে যা বলা যায় না। দেন মোহরের টাকা আমি পাঠিয়েছিলাম। গ্রহণ করেনি। আজ আমি নিজে এসেছি। এটি হয়রানি ছাড়া কিছু নয়। বিচারক দেন মোহরের টাকা আইনজীবিকে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়ে মামলাটি সমাপ্ত ঘোষণা করলেন। বাদি ও আইনজীবি চুপচাপ। ওই নারী উঠে দাঁড়িয়ে বলছে, আমি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে নিয়ে যাও। পুরুষটি বলছে, সে সময় শেষ হয়ে গেছে। ওই নারী বলছে, তুমি সংশয়বাদি পুরুষ ইত্যাদি ইত্যাদি। আদালতে উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়া চাউয়ি করছিল। 

বিচারক অন্য মামলার জন্য বাদি বিবাদিকে ডাকার নির্দেশ দিলেন। বেরিয়ে বারান্দায় এলাম। ওই নারীর প্রতি আমার মোহ কেন যেন কাজ করছে না। কিছুক্ষণ আগের অনুভব উদাউ। ওই নারীর হাতে একটি ভিজিং কার্ড ধরে দিয়ে বললাম, আমি সাংবাদিকতা করি প্রয়োজনে বলবেন। আপনার ফোন নম্বর আইনজীবির কাছ থেকে নিয়ে নেব। ওই নারীর স্বামী পুরুষটি লম্বা গতিতে হাঁটছে। আমার কৌতুহল তাকে নিয়ে। তার কথা শুনতে হবে। পিছনে পিছনে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচয় হলাম। হাঁটছি আর কথা বলছি। খুব ব্যস্ত তিনি। একটু কথা বলার সময় হবে?  কি কথা? চা খেতে খেতে বলা যেত, না। না, সময় নেই। রংপুরে এসেছেন চলেন আমি আপনাকে চা খাওয়াব। আমি কেন আপনার চা খাব? তাহলে আপনি নাহয় খাওয়ালেন। আমি কেন খাওয়াব? সিগারেট খাবেন? এখন না। চলেন একটু ছায়ায় দাঁড়াই। সময় নেই ভাই। এরপর হঠাৎ একটি রিকসায় উঠে বসে আমাকে বললেন, উঠে আসেন। ভালো একটি রেষ্টুরেন্টে চলেন? তিনি রিকসায় যেতে যেতে বলছিল, রংপুর তো সুন্দর সাজানো গোছানো হয়েছে। এই রংপুর সাজিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মডেল মসজিদ, ডিসি অফিস, পুলিশ লাইন্স, পুলিশ সুপার অফিসসহ অনেক কিছু তিনি রংপুরে দিয়েছেন। আপনি আওয়ামীলীগ করেন নাকি? না। আমি রংপুর উন্নয়ন দল করি। যারা রংপুরের উন্নয়ন করবে আমি দ্বার্থহীন ভাবে তাদের সমর্থক। টুকটাক কথা বলতে বলতে একটি অভিজাত রেষ্টুরেন্টে তাকে নিয়ে পৌছি। রেষ্টুরেন্ট দেখে তিনি বিস্মিত। রংপুর তো আগের রংপুর নাই। এতো সুন্দর রেষ্টুরেন্ট। 

দুপুর প্রায় ১টা। খাবার অর্ডার দিয়ে ম্যানেজারকে অনুরোধ করে সিগারেট খাওয়ার অনুমতি নিলাম। সিগারেট ছাড়া কথা বেরুবে না। সালাহউদ্দিন এবং আমি দু‘জনে সিগারেট ধরালাম। প্রশ্ন করলাম কোথায় পড়াশোনা করেছেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবে বেরিয়েছেন? ২০১০ সালে। আমার চেয়ে আপনি চার বছরের জুনিয়র। আপনি কোথায় পড়াশোনা করেছেন? বললাম রাজশাহী ও ঢাকা দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে । ২০০৬ সালে শেষ করেছি। সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে থাকতাম। সেখানে সেও ছিল। পরিচয় পেয়ে সে কদমবুচি করার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আমি থামিয়ে দিলাম। প্রশ্ন করলাম সুন্দরী স্ত্রীকে তালাক দিলে কেন সালাউদ্দিন? সত্যিই কী সে ওরকম ছিল, যা আদালতে বলেছ। তিনটি সিগারেট শেষ করে সালাউদ্দিন। মাহী ভাই, আমি আসলে বিশ্বাস করিনি। মাত্র সাত মাস তার সাথে আমার সংসার ছিল । বাসার চাকমা গার্ড না বললে আমি জানতামই না। কথা বলার সময় তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল। সে বলছিল, আমি অফিসে যেতাম। আমার স্ত্রী পার্লারে, প্রসাধনী দোকানে বিভিন্ন জায়গায় যেত। পার্লারের একটি চক্র তাকে লোভে ফেলে। ফ্লাট ফাঁকা থাকত। ফোনে যোগাযোগ করে ফø্যাটে চলত ওর অনৈতিক কাজ। গার্ডের অভিযোগ, অতিরিক্ত ফোন আসা ইত্যাদি বিষয় ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি গোপন ক্যামেরা কিনে বাসায় সেট করেছিলাম। তিনদিন অফিস ছুটি নিয়ে একটি আবাসিক হোটেলে সারাদিন বসে দেখতাম আমার ফ্লাটের ভিতরের খবর। সব সত্য ছিল। চতুর্থদিনের মাথায় ওকে বাড়ীকে পাঠিয়ে দেই। ঠান্ডা মাথায় থাকার চেষ্টা করি। ওকে বলেছিলাম, বিএ এবং এমএ পরীক্ষা শেষ কর তারপর দেখা হবে। খরচ দিতাম নিয়মিত। আমি ফ্লাট ছেড়ে দিয়ে মেসে উঠি। বদলি নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। এরই মধ্যে দুই বছর পর হয়ে যায়। 

আমি গভীর ভাবে ভেবেছিলাম, যে একবার অবৈধ ভাবে শরীরের সুখ নিয়েছে। সে এটা পুরো জীবনে ছাড়তে পারবে না। এটি একটি অদম্য নেশা মাহী ভাই। আমি ঘটনাটি মাকে বলেছিলাম। মা বিশ্বাস করতে চায় না। যে কোন ভাবেই হোক মা-বাবা সবার চেষ্টা ছিল সাংসারটি টিকুক। আমি ওকে গ্রহণ করি। কিন্তু আমি যা দেখেছি তার দহন আমাকে এখনো জ্বালায়। মন বলছিল, নিশ্চয়ই বিয়ের আগে ওর ওরকম অভ্যাস ছিল। অনৈতিকতার কাজে পূর্ব অভ্যাস ছাড়া আসা অসম্ভব। তাই তিন মাস আগে তালাক নোটিশ দিয়েছি। আজ শেষ করলাম। মাহী ভাই, প্রায় ৭৫ হাজার টাকা বেতন পাই। কোন অভাব নেই। আমি চেয়েছিলাম, যে নারীকে বিয়ে করব সে হবে রাণীর মতো। নারী তো রাণীই তাই না মাহী ভাই। রাণীকে শ্রদ্ধা করতে হয়, ভালো বাসতে হয়, সেবা করতে হয় এবং নতজানু হতে হয় রাণীর কাছে। পুরুষ তো নারীকে কেন্দ্র করেই সংসার সাজায়। প্রত্যেকটি পুরুষ তার দাম্পত্য জীবনে আসা নারীকে রাণীর আসনে বসিয়ে তাকে কেন্দ্র করে সুখ সৃষ্টি করে, প্রজন্ম সৃষ্টি হয়। সেই নারী বহুগামী হলে কি ভাবে মেনে নেয়া যায় বলুন। সালাউদ্দিনের কথা শুনতে শুনতে আমার হাতের তালু, কপাল, মাথা ঘেমে গিয়েছিল। বলেছিলাম, সালাউদ্দিন তুমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলে। অনেক পড়াশোনা করেছ। তোমার কথায় সাহিত্যের সাথে নৈতিকতার মিশ্রন পেলাম। সুন্দর। এখন আর বিয়ে করবে না? করব মাহী ভাই। দেখাশোনা চলছে। নতুন যে আসবে সে যদি আগেরটার মতো হয়। হবে না মাহী ভাই। আমি তাকে নারী থেকে রাণী করার পরিকল্পনা জানিয়ে রাখব। দোয়া করি ভাই। ভালো থেকো।

(সালাউদ্দিনের বাড়ী রংপুরের একটি উপজেলায়। ঢাকায় বড় হয়েছে। বিয়ে করেছিল রংপুরেরই একটি উপজেলার একটি এলাকায়। কোর্টে গেলে তথ্য দারুন সব নতুন পুরনো তথ্য পাওয়া যায়। যার রেশ রয়ে যায় )


আত্ন-কথন-৩৯
সাংবাদিক ও লেখক
১৬-৯-২২