মাঝে মাঝে বিবেকের কাছে বসে পড়ি


আগামী নিউজ | মহিউদ্দিন মখদুমী প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২২, ১০:৪৭ পিএম
মাঝে মাঝে বিবেকের কাছে বসে পড়ি

রংপুরঃ তসলিমা নাসরিন শুক্রবার একটি কলামে লিখেছে ‘ শুধু জন্মের সময় শরীরে ছোট একটা পুরুষাঙ্গ ছিল না বলে কত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি?’ লেখার মাঝামাঝি শব্দকটি লিখে শুরু এবং শেষে নানা নিজস্ব ক্ষেদ ঝেড়েছেন তিনি। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সচিব বদিউর রহমান স্যার ‘যেতে হবে-যানা পারেগা’ শিরোনামের একটি কলামে জীবনের শুরু অর্জন এবং শেষ নিয়ে বিশদ একটি লেখা লিখেছেন। দুটি লেখা পাঠ করে চুপচাপ ছিলাম অনেক্ষণ। মনে হয়েছিল সত্যিই মানুষ একটি জঠিল প্রাণি। কার ভিতরে কি আছে বলা কঠিন। কারো চিন্তার সাথে অন্য কারো চিন্তার সমন্বয় নেই। জুমআর নামাজ শেষে আমাদের সাংবাদিক নওশের আলম সুমনের মায়ের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হলো। সুমনের মা কয়েকদিন আগে মৃত্যু বরণ করেছেন। বদিউর রহমান স্যার লিখেছেন, যেতে হবে-যানা পারেগা তবু পদ চাই, পদোন্নতি চাই; ক্ষমতা চাই, চেয়ার চাই সচিব হব, নেতা হব, এমপি হব, মন্ত্রী হব, প্রধানমন্ত্রী হব, রাষ্ট্রপতি হব, বিশ্বনেতা হব, বিরাট সাংবাদিক হব, সম্পাদক হব, পত্রিকা-টেলিভিশনের মালিক হব; দোকানদার হব, ব্যবসায়ী হব, শিল্পপতি হব; শিক্ষক হব, প্রধান শিক্ষক হব, অধ্যক্ষ হব, ভাইস-চ্যান্সেলর; শিক্ষক নেতা হব, নীল দল হব, সাদা দল হব; গায়ক-গায়িকা হব, নায়ক-নায়িকা হব, সুরকার হব, সঙ্গীতজ্ঞ হব; প্রকৃতির নিয়মে বাবা হব, মা হব, দাদা হব, দাদি হব-প্রজন্মের পর প্রজন্মে কেবল হতেই থাকব। হতেই থাকব...। কিন্তু বড় আফসোস, যেতে হবে যে! না গিয়ে যে উপায় নেই।

তিনি লেখাটিতে একটি স্থান ছেড়ে গেছেন বলে মনে হল। যাবার পরে কিংবা মৃত্যু হওয়ার পরে কী হবে? তা তিনি বলেননি। মাঝে মাঝে বিবেকের কাছে বসে পড়ি। বিবেককে নানা প্রশ্ন করি। গত বৃহস্পতিবার দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় গিয়েছিলাম। বাসে যেতে যেতে যত মসজিদ চোখে পড়েছে সবই উন্নত এবং নান্দনিক ভাবে তৈরী। এই আওয়ামীলীগ সরকারের ১৩ বছর দেশ শাসনে গ্রামে গঞ্জে আর যাই হোক , যে কোন ভাবেই হোক না কেন মসজিদ গুলো নান্দনিক ভাবে তৈরী হয়েছে। উপজেলা পরিষদের মসজিদে জোহরের নামাজ পড়লাম। ছাদপিটা, টাইলস দেয়া, এসি লাগানো, গ্লাসের জানালা দরজা দেয়া মসজিদটি। নামাজ শেষে একজন মুসল্লীর সাথে কথা বললাম। তিনি বলেছেন, জুমআর নামাদের দিন মসজিদ ভর্তি হয়। অন্য নামাজ গুলোতে এক কাতার দুই কাতার নামাজি হয়। তবে কি শুক্রবারের দিন জুমআর নামাজ ফরজ ? ফজর জোহর আছর মাগরিব এশা এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ নয়? যদি হয় তবে এড়িয়ে যাই কেন? আল্লাহই তো বলেছেন ‘ ধ্বংস সেই সব নামাজিদের জন্য যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে গাফেল।”

ফেরার পথে ভাবছিলাম, আসলে আমাদের ছোট জীবনব্যাপী পরকালের জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার গোপন ম্যাসেজ দিয়েই আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন। মাতৃগর্ভে অবস্থান ও ভূমিষ্ঠ হয়ে দুনিয়াতে আগমন এবং তারপর মৃত্যুবরণ। এই সময়টুকু দুনিয়ার জীবন। দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি হলো মৃত্যু। মৃত ব্যক্তির দেহ দাফন কবরস্থ করা হয়। এর মাধ্যমে আমরা দুনিয়ার জীবনের নির্ধারিত আয়ু শেষ করে বারজাখ জীবনে প্রবেশ করি, যা সবার জন্যই অবধারিত। কিয়ামত তথা হাশর নশর ও বিচার ফয়সালার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে বারজাখ বা অন্তবর্তী সময় বলা হয়। কবরে প্রত্যেক মুসলমানকে ‘মুনকার-নাকির’ তিনটি প্রশ্ন করবেন। আরবিতে প্রশ্ন তিনটি করা হবে এভাবে, ‘মান রাব্বুকা ? ওয়া মান দ্বীনুকা ? ওয়া মান নাবিয়্যুকা ?’ অর্থাৎ তোমার রব কে? তোমার দ্বীন-ধর্ম কী ? তোমার নবী কে ? একজন নামাজী মুসলমানের পক্ষে এই তিনটি প্রশ্নে উত্তর দেয়া সহজ হবে। তিনি প্রশ্ন তিনটির উত্তরে বলবেন, ‘আমার রব আল্লাহ, আমার ধর্ম ইসলাম, আমার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। যারা গুনাহগার এবং অবিশ্বাসী তারা বলবে, লা দ্বিরী, লা দ্বিরী। ‘হায়! আমি কিছুই জানি না।’ নেককার তথা পুণ্যবান মুমিনদের সঠিক উত্তর শোনার পর বলা হবে, ‘তাকে জান্নাতি পোশাক পরিয়ে জান্নাতি বিছানা সাজিয়ে দাও এবং জান্নাতের সাথে সংযোগ দিয়ে দাও।’ তাদের উদ্দেশে আরও বলা হবে, ‘নবদম্পতির মতো সুখে শান্তিতে আরামে ঘুমাও।’ কেয়ামত পর্যন্ত এভাবেই কেঁটে যাবে তার কবর জীবন। যারা গুনাহগার এবং অবিশ্বাসী, যারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হবে, তাদের জাহান্নামের শাস্তি বা আজাব শুরু হয়ে যাবে। আমার চিন্তা বিবেকের কাছে বসে পড়ে। এরপর আঙুল ইশারা করে বলে, সকল কাজে কর্মে কবর জীবনকে স্মরণ করে চললেই তো অন্যায় অপরাধ ও পাপ থেকে বেঁচে থাকা যায়। এজন্য প্রয়োজন একটু সচেতনতা, একটু সর্তকতা এবং একটু খেয়ালী হয়ে উঠা। আমার বিবেক বলে মখদুমী, তোমার জন্য কষ্টকর দুনিয়ার এই ছোট জীবনের চেয়ে কবরের দীর্ঘ জীবনটাকে সুন্দর করার জন্য খুব সচেতন ও একটু সর্তক হয়ে উঠো। আমি বিবেকের কাছে নতজানু হয়ে বসে পড়ি। দীর্ঘ সেজদায় লুটিয়ে পড়ি।

আত্ন-কথন-৩৮

সাংবাদিক ও লেখক

১০-০৯-২০২২