Dr. Neem on Daraz
Victory Day

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী: আমাদের শিক্ষার অবস্থা ও করণীয়


আগামী নিউজ | আকমল হোসেন প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১, ০১:৪৪ পিএম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী: আমাদের শিক্ষার অবস্থা ও করণীয়

ছবি: সংগ্রহীত

ঢাকাঃ এ বছরটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ বছর উদযাপন হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাষ্টীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কারণে জাতির জনকের সঠিক মূল্যায়ণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসেব-নিকেশটা করা যেমন প্রাসঙ্গিক তেমনই হিসেবটা করাও অনেকটা সহজ হবে, কোনো ধরনের বিচ্যুতি থাকলে তা পূরণ করারও সুযোগ হবে। উল্লিখিত কর্মসূচি পালনে দলটির পৃথক অবস্থান থাকলেও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলকে সম্পৃক্ত করতে পারলে বিষয়টির সর্বজনীনতা পেতো, যেমনটি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকগুলি রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কর্মকাণ্ড তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একই স্রোতধারায় সম্পৃক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন পেতে সহজ হয়েছিলো এবং দ্রুত বিজয় অর্জনও সম্ভব হয়েছিলো। 

যুদ্ধের পরে দেশ গঠনে জাতীয় সরকারের দাবি উঠেছিলো, তবে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের সংকটের সময় বাহির থেকে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন দেয়, সর্বশেষ বাকশাল গঠন করা হয়। বাকশালের কার্যক্রম শুরু হতে না হতেই ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর একটা অংশ এবং তার দলের মধ্যকার কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যার শিকার হলে ঐ দাবির প্রাসঙ্গিকতা সামনে এসেছিলো। দলের মধ্যকার সমস্যা মুক্তিযুদ্ধের শক্তির মধ্যে সৃষ্ট বিভক্তি শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিবেশই তৈরি করেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য যে দিক নির্দেশনা, ১৯৭২ সালের সংবিধান সেটাকেও ধ্বংস করে পাকিস্তানী ফরমে দেশকে নিয়ে গিয়েছিলো। স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা এবং তাদের গাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের পতাকা উড়েছে, রাজাকাররা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতিও হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছিলো। 

সংবিধানের ১৫ ধারায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’, ১৭ ধারায় ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানের কমিটমেন্ট করেছিলো রাষ্ট্র। সংবিধানের ঐ নির্দেশনার আলোকে বঙ্গবন্ধু, ডক্টর কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন ১৯৭৪ সালে তাদের প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। সেখানে শিক্ষার দর্শন, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়ন সম্পর্কে একটি দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। পাকিস্তানের আমলা যারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের আমলা হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন তাদের অসহযোগিতা এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যার কারণে সেটা আলোর মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধু একবারে ৩০ হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলকে সরকারিকরণ করেছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ হাজার বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলকে সরকারিকরণ করেছেন। এখন প্রয়োজন এ সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন। বঙ্গবন্ধুর আমলের শিক্ষা খাতে ইউনেস্কো ঘোষিত জিডিপির ৭% এমনকি খুদা কমিশনের সুপারিশ জিডিপির ৫% এবং (জাতীয় বাজেটের ২০%) পর্যায়ক্রমে সেটা ৭% উন্নীত করার সুপারিশ, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সেটা আলোর মুখ দেখেনি। টাকার অংকটা ২% এর মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। একই ধারার শিক্ষার পরিবর্তে তিন ধারার শিক্ষা অব্যাহত রয়েছে। ইংরেজি, সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা স্বয়ং রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষায় এসেছে বেসরকারিকরণ, যার টাকা আছে সেই শিক্ষা কিনতে পারে। অন্যদিকে সরকারি নজরদারির বাইরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা চলছে। সেখানে জাতীয় পতাকা উড়ে না, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না, বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির পিতা বলা প্রসঙ্গে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আঃ) এর প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে সাম্প্রদায়িক শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে দেশে। ইংরেজি মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের চেয়ে ইংরেজদের ইতিহাসকে মুখ্য হিসেবে পড়ানো হয়, ফলে দর্শনগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে না। তরুণদের বিরাট একটা অংশ এ কারণেই জঙ্গিবাদ মৌলবাদের প্রতি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার বরেণ্য ব্যক্তিদের বিরদ্ধে শুধু কুৎসাই ছড়াচ্ছে না, তাদের ওপর হামলা ও হত্যা করা হচ্ছে। শিক্ষার সংখ্যাগত মান বাড়লেও গুণগত মানে অনেক পিছিয়ে দেশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক রেটিংয়েও পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষা প্রশাসনের নিজস্ব স্বকীয়তার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য গুরুত্ব পাচ্ছে, তাইতো শিক্ষকরা পড়াশোনা আর গবেষণা ফেলে শিক্ষা প্রশাসনে যেতে ‘দলকানা বা দলদাসে’ পরিণত হচ্ছে। দলকানা এই সকল প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ এবং উপাচার্যরা শিক্ষার মানের চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিয়োগ বাণিজ্যে বেশি তৎপর থাকে। এদের অন্যায় এবং অনিয়ম শাসকের নিকট ধরা পড়ে না। রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে এজেন্ডা এবং কর্মসূচির মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও নাগরিকের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যমত না থাকা খুবই দুঃখজনক। দেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধির জন্য সর্বজনীন এবং গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি জেনেও সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই শিক্ষানীতির পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে কুদরত-ই-খুদা (১৯৭২), অধ্যাপক শামসুল হক (১৯৯৭) এবং অধ্যাপক কবীর চৌধুরী (২০১০), জাতীয় পার্টির আমলে মজিদ খান (১৯৮২), ডক্টর মফিজ উদ্দিন (১৯৮৭) এবং বিএনপির আমলে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিলো। 

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সংবিধানের অলোকে একই ধারার সর্বজনীন, অবৈতনিক শিক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি বরং শিক্ষার বেসরকারিকরণ এবং বিভিন্ন ধারার শিক্ষার মাধ্যমে মানসিক দূরত্ব এবং বঞ্চনার জায়গাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যাপক সংখ্যক যুবকদের কর্মসংস্থান সম্ভব না হলে তাদেরকে দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং কর্মমুখী শিক্ষার জন্য কারিকুলামের বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ সেইসাথে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আনা জরুরি। শিক্ষায় অর্থায়নের বিষয়টির সাথে শিক্ষকদের একাডেমিক ফ্রিডম নিশ্চিত করা জরুরি এবং শিক্ষা প্রশাসনে স্বজনপ্রীতি এবং দলবাজি পরিহার প্রয়োজন। এযাবৎ যা হয়নি ভবিষ্যতেও তা হবে না, এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী আর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন বর্তমান অবস্থায় যদি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বঞ্চনামুক্ত এবং শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়া অসম্ভব নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এটাই হোক সবার প্রত্যাশা। 

লেখক : অধ্যক্ষ ও সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস

আগামীনিউজ/প্রভাত

আগামী নিউজ এর সংবাদ সবার আগে পেতে Follow Or Like করুন আগামী নিউজ এর ফেইসবুক পেজ এ , আগামী নিউজ এর টুইটার এবং সাবস্ক্রাইব করুন আগামী নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে