Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

মুসলমানদের ভারত আগমন: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব


আগামী নিউজ | মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার প্রকাশিত: নভেম্বর ১৪, ২০২০, ০৩:২৩ পিএম
মুসলমানদের ভারত আগমন: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

আগামী নিউজ

উমাইয়া খলীফা বিন আবদুল মালিকের রাজত্বকালে মুহাম্মদ বিন কাসিম কতৃক সিন্ধু বিজয় ইসলামের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ফলাফল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সুদুরপ্রসারী। তিন বছরের মধ্যে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু ও মুলতানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাসে এক নব অধ্যায়ের সূচনা করেন। 

ভারতীয় জনগণের অনৈক্য, রাজা দাহিরের স্বৈরশাসন, নৌশক্তির অভাব এবং আরবদের প্রতি রাজাদের স্বৈরতন্ত্রে বিক্ষুদ্ধ জাঠ, মেড, বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা আরবদের সফলতার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ইসলাম প্রচার, জিহাদের প্রবল আকাঙ্ক্ষা, দুঃসাহসিক চেতনাবোধ মুসলমানদেরকে সিন্ধু বিজয়ের যথেষ্ট সাহস যোগায়। আরব যুদ্ধ - কৌশলের শ্রেষ্ঠত্ব, আরব অশ্ব বাহিনীর যুদ্ধ - নিপুণতা এবং ভারতবাসীদের তুলনায় তাঁদের নতুন পদ্ধতিতে যুদ্ধরীতি স্বাভাবিকভাবেই আরব অভিযানকারীদেরকে দাহিরের সেনাবাহিনী অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শিতা প্রদান করে।

মুহাম্মদ বিন কাসিম যে সমস্ত এলাকায় জয় করেন - সর্বত্র বিজিত লোকদের প্রতি ন্যায় ও সহনশীলতার পরিচয় দেন। স্থানীয় অধিবাসীগণ মুসলমানদের শাসনব্যবস্থা ও বিজিত লোকদের প্রতি তাঁদের নীতির প্রশংসা না করে পারেনি। মুহাম্মদ বিন কাসিম দেবল নগরে প্রবেশের পর তিনি শুধু অযথা রক্তপাতেই বাধা প্রদান করেননি। বরং, অধিবাসীদের প্রতি তিনি সৌজন্য ও উদারতামুলক আচরণ করেন। হিন্দুগণ তাদের পূর্ববর্তী পদে বহাল থাকে, শুধু শাসনব্যবস্থাটুকু হিন্দুদের হাত হতে মুসলমানদের হাতে স্থানান্তরিত হয়।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের আদেশ অনুযায়ী মুহাম্মদ বিন কাসিম সমস্ত অমুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন। সিন্ধুবাসীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্দির মেরামতের অনুমতি প্রদান করা হয়, এবং যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদ, অরোর, রাওয়ার, মুলতান, এবং অন্যান্য স্থানেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অমুসলিমদের উপর জিরিয়া ছাড়া অন্য কোনো নতুন কর ধার্য করা হয়নি। যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাদেরকে জিজিয়া কর হতে অব্যহতি দেয়া হয়। হিন্দুদেরকে বিভিন্ন উচ্চপদে বহাল করা হয়।  তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে আদেশ দেওয়া হয়। ফলে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের মৃত্যুর পর সিন্ধুবাসীরা তাঁর জন্য অশ্রু বিসর্জন দেয়। বিজয়ী সেনাপতির জন্য এর চাইতে বড় কৃতিত্ব আর কী হতে পারে। 

ফলাফল মূল্যায়নঃ মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় রাজনৈতিক ফলাফল বিবেচনায় ইতিহাসবিদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও আর্থ- সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ও ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। ইতিহাসবিদ ড. ঈশ্বরী প্রসাদের মতে আরবদের সিন্ধু বিজয় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে ইসলামের ইতিহাসে একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনা (Insignificant event), স্ট্যানলী লেনপুলের মতে একটি উপাখ্যান বিশেষ, একটি নিষ্ফল বিজয় (An episode, a tiumph without result) ড. এবিএম হাবিবুল্লাহর মতে রাজনৈতিকভাবে সিন্ধুর ঘটনা করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত করে (Sindhu affairs Ied to a dead end) একই ভাবধারায় ঐতিহাসিক এস আর শর্মা বলেন- রাজকীয় আকাশের চক্রবালে অর্ধচন্দ্রটি সর্বোচ্চ স্থানে উদিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করে, কিন্তু ইহা শুধু অর্ধচন্দ্র থাকিবার জন্যেই পূর্ণচন্দ্র নহে। তাঁদের মতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আধিপত্য কেবলমাত্র সিন্ধু ও মুলতানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের অঞ্চলের উপর তিনি কোনো প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হননি। 

মুহাম্মদ বিন কাসিমের আকস্মিক মৃত্যু খলীফা সুলায়মানের ক্ষমতায় আরোহন দামিশৃকের বিদেশনীতির পরিবর্তন, ভারতীয় রাজা, হিন্দু পুরোহিতবর্গ ও সামন্ত বিশেষতঃ রাজপুত্রদের প্রবল বিরোধিতার ফলে মুসলিম বিজয়ে আর কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এ ছাড়া আরবগণ সিন্ধুদেশে যে সকল রাস্তা - ঘাট ও প্রাসাদ নির্মাণ করেন সেগুলোও স্বল্পকালের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। খুব সম্ভবতঃ এসব কারণে ইতিহাস গবেষকগণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে আরবদের সিন্ধু বিজয়কে নিষ্ফল বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী খলিফা ওয়ালিদের আমলে মুহাম্মদ বিন কাসিম কতৃক সিন্ধু বিজয় পরবর্তীকালে ভারতে মুসলিম শাসনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। এটা ছিল মূলতঃ অগ্রবর্তী অভিযান।

স্বল্পতম সময়ে গোটা ভারত জয় করা অসম্ভব ব্যাপার। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রক্রিয়া। মুহাম্মদ বিন কাসিমের পথ ধরে সুলতান মাহমুদ গজনভী, মুহাম্মদ ঘুরী, ও জহীরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবর অভিযান পরিচালনা করে ভারতের বুকে মুসলিম রাজত্বের ভিত্তি স্থাপনে সমর্থ হন। সুতরাং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনা, বা একটি উপাখ্যান বিশেষ, একটি নিষ্ফল বিজয়, বা করুণ পরিণতি ' বলে উড়িয়ে দেয়া সমীচীন নয়। 

ভারতীয় ইতিহাস গবেষক ড. কিরণচন্দ্র চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, কিন্তু সামান্য অনুধাবন করিলে আমাদের বুঝিতে বিলম্ব হইবেনা যে, আরবদের সিন্ধু অধিকারের সময় হইতে শুরু করিয়া আধুনিক যুগের পূর্ববিধি সিন্ধুর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, তথা সামাজিক জীবন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আরবদের শাসন স্থাপনের ফলে বহু সংখ্যক আরব বণিক পর্যটক, সন্ত, মনীষী সিন্ধুতে আসিয়াছেন এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিভ্রমণ করিয়া যেই সকল বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন, সেইগুলি পরবর্তীকালে তুর্কীদিগকে ভারতবর্ষ অভিযানে উৎসাহিত করিয়াছে।

 

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পর হতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেবল, সোমনাথ, কাথিওয়ান, কন্কন, ব্রোচ, ক্যাথে, সিন্দন, ঢেউল, গুজরাট, প্রভৃতি স্থানে ক্ষুদ্র মুসলিম বসতি গড়ে উঠে এবং প্রায় প্রতিস্থানেই মসজিদ নির্মিত শুরু হয়। অধিকাংশ হিন্দু শাসক তাদের রাজ্যে মুসলমানদের স্বাগত জানান। বসতি স্থাপনের পরপরই মুসলমানগণ ধর্মপ্রচারে ব্রতী হন। কেননা ইসলাম অপরিহার্যভাবে একটি প্রচারধর্মী ধর্ম এবং প্রতিটি মুসলমানই আপন ধর্মের প্রচারক স্বরূপ। নব প্রতিষ্ঠিত ধর্মের উদ্দীপনা এবং বিজয়ের মর্যাদাও গৌরব বহন করে এসব মুসলিমগণ ভারতে আসেন। নবম শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই তাঁরা ভারতের সমগ্র পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন এবং ধর্মাচরণের বৈশিষ্ট্য ও ধর্মপ্রচার এবং তা পালনের উৎসাহ দ্বারা হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। 

দশম শতাব্দীতে পর্যটক বিন হাইকেল সিন্ধুদেশ ভ্রমণ করতে এসে জনগণকে আরবি ও সিন্ধী এই দুই ভাষাতেই কথা,বলতে শোনেন এবং মুসলিম ও হিন্দু জনতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব লক্ষ্য করেন। এখনও সিন্ধী ভাষায় আরবি হরফ ব্যবহৃত হয় এবং এ ভাষায় আরবি ভাষার প্রভাব অত্যন্ত বেশি। সিন্ধুর সমাজ ব্যবস্থাও অনেকটা আরব দেশের অনুকরণে ট্রাইব্যাল সিস্টেমের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবংআরবদের মত সিন্ধীরাও অতিথিবৎসল। সিন্ধুতে মুসলিম শাসনামলের অনেক কীর্তি আজও বিদ্যমান রয়েছে। কাজেই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে বিচার করলে সিন্ধু বিজয়ের গুরুত্ব একেবারেই খাটো করা যায়না। আরবদের সিন্ধু বিজয় শুধু কাহিনী স্বরূপ নয়, এর স্থায়ী ফলও প্রভাব সূপ্রতিষ্ঠিত।

  • লেখক : নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক আপন আলো;
  • বিশেষ প্রতিবেদক, শ্যামল বাংলা টিভি;
  • সাবেক কাউন্সিলর, বিএফইউজে
  • -বাংলাদেশ ও সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে