Agaminews
Dr. Neem Hakim

প্রস্তাবিত ৩ বছরের ‘ট্যুর অব ডিউটি’তে ভারতের সেনাবাহিনী ছাড়া বাকি সবার লাভ


আগামী নিউজ | লে. জেনারেল রাজ কাদিয়ান (অব.) প্রকাশিত: মে ২০, ২০২০, ০২:১১ পিএম
প্রস্তাবিত ৩ বছরের ‘ট্যুর অব ডিউটি’তে ভারতের সেনাবাহিনী ছাড়া বাকি সবার লাভ

ছবি: সাউথ এশিয়ান মনিটর

প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের ১৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তের কিছু কিছু অংশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম ভূখণ্ড অতিক্রম করেছে। ছয় প্রতিবেশীর মধ্যে দুটির সাথে - চীন ও পাকিস্তান - দীর্ঘ দিন ধরে টানাপোড়ন চলছে। এসব দেশের সাথে ভারতের সীমান্ত বিরোধপূর্ণ ও অচিহ্নিত। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১২ লাখের বেশি সদস্য সারা বছর দুই ফ্রন্ট পাহারা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকা ছাড়া আর কিছু করার ফুরসত পায় না। সূত্র: দি ওয়্যার।

তাদের দুর্দশা আরো বাড়িয়ে দেয় অফিসার র‌্যাংকের বিপুল ঘাটতি। এখন পর্যন্ত বাহিনীতে অফিসার সংখ্যা প্রায় ২৪ ভাগ। এই ঘাটতি পূরণের জন্য শর্ট সার্ভিস (এসএস) কমিশন স্কিম প্রবর্তন করা হয়েছে। এসএস অফিসাদের মেয়াদ ১০ বছর, তা বাড়িয়ে ১৪ পর্যন্ত করা হয়। তারপর তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়। অবশ্য এই স্কিম তাৎপর্যপূর্ণভাবে অফিসার ঘাটতির সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

সরকারের কাছে এখন নতুন একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এটি হলো ‘টুর অব ডিউটি’ (টিওডি) নামে তিন বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা। পরিকল্পনার আওতায় ১০০ অফিসার ও অন্যান্য র‌্যাংকে এক হাজার লোক তিন বছরের জন্য নিয়োগ করা হবে। এত স্বল্প সংখ্যায় বিপুল ঘাটতিজনিত সমস্যার সমাধান হবে না। 

এই পরিকল্পনার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি?

মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য হলো, বর্তমান সময়ের তরুণদেরকে স্বল্প মেয়াদে সামরিক পোশাক পরার অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা। তাদের সিভিতে থাকা ফটো কেবল তাদের আকাঙ্ক্ষাই পূরণ করবে না, সেইসাথে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। এটি সরকারকে কল্যাণমুখী ও দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী পরিচিতি মজবুতকারী হিসেবে ফুটিয়ে তুলবে। সামরিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রিত কাজ করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত তরুণদের চাকরির সম্ভাবনা বাড়াবে এবং বেসরকারি খাতে নিয়োগ লাভের সময় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। অর্থাৎ অনেক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই স্কিম তৈরি করা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবটির খারাপ দিক তথা সেনাবাহিনীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি সম্ভবত পরিকল্পনাবিদদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বা তারা এটি আড়াল করে রেখেছেন। অফিসারদের প্রাক-কমিশন প্রশিক্ষণ দীর্ঘ ও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের পড়াশোনা করতে হয়। টিওডিদের ইউনিফর্ম পরার মেয়াদ সংক্ষিপ্ত থাকায় তাদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ব্যয়সাশ্রয়ী হবে না।

ফলে তাদের প্রশিক্ষণ সম্ভবত ছয় মাসের মতো হবে। এছাড়া কমিশন-পরবর্তী গ্রাউন্ডিং (এ সময় কয়েক মাসের ইয়ং অফিসার্স কোর্সসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ হয়)-এর মেয়াদ বিভিন্ন অস্ত্র ও সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে। অবশ্য প্রশিক্ষণ কেমন হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

অর্থাৎ টিওডির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বড়জোড় আধা-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেতা তৈরি হবে। সেনাবাহিনীর এসিড টেস্ট হয় যুদ্ধে। সৈন্যরা অন্ধভাবে তার অফিসারের নির্দেশ পালন করে। তিনি তার ঊর্ধ্বতনের নির্দেশে জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু চাকরির দক্ষতায় অভাব থাকলে তাদের মধ্যে ওই আত্মবিশ্বাস নাও থাকতে পারে।

অন্যদিকে বেশিরভাগ ডিওটিই সম্ভবত তাদের সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে সাময়িক বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ের চাকরির সম্ভাবনার দিকেই বেশি নজর দিতে পারে। তাহলে সেনাবাহিনী পরিশেষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে এবং তার পেশাগত সক্ষমতা হ্রাস পাবে। মিডিয়ায় প্রকাশিত টিওডি স্কিম গ্রহণ করা হলে তা সেনাবাহিনীর জন্য বড় ধরনের বাধা বিবেচিত হবে। সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম শেষ পর্যন্ত স্রেফ দেশপ্রেমের উদ্দীপনা প্রদর্শনের বিলবোর্ড এবং ব্যক্তিবিশেষের সিভি আরো উজ্জ্বল করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। সেনাবাহিনীও কোনোরকমে বেসরকারি খাতের জন্য কর্মী সরবরাহকারীতে পরিণত হবে।

যথাযথ বিবেচনায় বাস্তবায়ন করা না হলে অনেক সময় সেরা পরিকল্পনাও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারে না। নতুন স্কিম সেনাবাহিনীতে চালু করা সবচেয়ে সহজ। তারা ভেতরে ভেতরে আপত্তি জানালেও তাদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ পাবে না। জনসাধারণ মনে করবে, তাদের আগ্রহেই এসব হচ্ছে।

টিওডির গঠনের নতুন স্কিম চালু করার বিষয়টি এড়ানো সম্ভব। এর বদলে বর্তমান এসএস স্কিমটি পর্যালোচনা ও সংশোধন করা যায়। বর্তমান ১০-১৪ বছর মেয়াদি অফিসাররা তাদের বয়স যখন ত্রিশের কোঠায়, তখনই সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। ওই বয়সে বেসরকারি খাতে চাকরি পাওয়া কঠিন। এই মেয়াদটি ৫ বছর নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে করে যেসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কথা আগে বলা হয়েছে, তা অর্জন করা যাবে। ৫ বছরের কম হলে ব্যক্তিবিশেষের যতো কল্যাণই হোক না কেন, সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কল্যাণ হবে না।

চূড়ান্ত সবুজ সঙ্কেত দেয়ার আগে প্রস্তাবটি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। যে লাভ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে তা প্রশ্নবোধক না হলেও বিতর্কযোগ্য। এ কারণে সেনাবাহিনীর অপরেশনগত দক্ষতাকে চাপে ফেলা উচিত হবে না।

পরিচিতি: (সাবেক ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ, ভারত) 

আগামীনিউজ/বিজয়
 

Dr. Neem