Agaminews
Dr. Neem Hakim

বঙ্গবন্ধু ও নজরুল একই সূত্রে গাঁথা


আগামী নিউজ | ড. শেখ মহঃ রেজাউল ইসলাম প্রকাশিত: মে ৪, ২০২০, ১১:৩৩ পিএম
বঙ্গবন্ধু ও নজরুল একই সূত্রে গাঁথা

ভোর হলো দোর খোল খুকুমণি ওঠোরে,চল চল চল উধ' গগণে বাজে মাদল,কাঠ বিড়ালি কাঠবিড়ালি এই রুপ অসংখ্য কবিতা এবং কারার ঐ লৌহ কপাট ভেংগে ফেল কররে লোপাটসহ অসংখ্য উদ্দীপনা মূলক গান ছোট বেলা থেকেই খুব আমাকে উদ্দীপ্ত করত।এ গুলো লিখেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কে এই মানুষটি?তাঁকে এক নজর দেখার আকুলতা আমাকে সব সময়ই তাড়িত করতো। আর একজন মানুষ আমাদের জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ আমি পাইনি।

আমার নানাবাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মেগচামী গ্রামে ছিলাম আমি তখন।একবার বড় ধরনের একটা ঝড় হয়েছিল,জামালপুরের পাশে লক্ষনদিয়া গ্রামে।বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টারে চড়ে লক্ষন দিয়া গ্রামে এসেছিলেন।,ছোট মানুষ! 

সবার সাথে নানা বাড়ী থেকে দৌঁড়ায়েছিলাম, এক নজর দেখার জন্য কিন্তু লক্ষনদিয়া গ্রামে যাবার আগেই বঙ্গবন্ধু হেলিকাপ্টারে উড়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি একজন বঙ্গবন্ধু ভক্ত মানুষ, আমি জোর গলায় বলতে পারি।এতে কেউ যদি আমার ফাঁসিও দেয় আমি তাতেও রাজী আছি।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সম্পদ,বাঙ্গালী জাতীর সম্পদ ।উনি সবার নেতা। বঙ্গবন্ধু এদেশের স্বাধীনতাএনেছেন,আমরা ভোগ করছি।এই মানুষটির ৭ মাচ' এর অলিখিত ভাষন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাহস যুগিয়েছে, সবাইকে উদ্দীপ্ত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই ভাষনটি।বিশ্বের দরবারে আবারও আমাদেরকে বীরের জাতি হিসেবে পরিচিত করেছে। বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখি নাই।২০১২ সাল,আমি তখন খাদ্য ও ত্রান মন্ত্রনালয়ের উপসচিব। লক্ষন দিয়া গ্রামে ত্রানের কাজ দেখতে গিয়েছিলাম।বঙ্গবন্ধুর হেলিকপ্টারটা যেখানে নেমেছিল ঠিক সেই জায়গাটা দেখে এসেছিলাম।বঙ্গবন্ধুর কথাটা এতসময় বললাম এইজন্য যে বঙ্গবন্ধু এবং কাজী নজরুল ইসলাম কে নিয়ে চিন্তা করলে আমি কি যেন একটা message পাই। এই দুটি মানুষই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।এত অল্প কথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।দুজনেই জেল খেটেছেন,অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন,অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন,সারাজীবন কষ্ট করেছেন সাধারণ মানুষের সুখের জন্য।সবার মুক্তির জন্য।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে নিয়ে কিছু কথা বলব। একটা মানুষ আর্থিক অনটনের ভিতর থেকেও অল্প সময়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যকে কতটা সমৃদ্ধ করেছেন, কি সৃস্টি করে গেছেন! আমি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোট করে দেখছি না।তার অবদান অপরিসীম।

এই মহান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধু ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রাম থেকে ঢাকা নিয়ে আসেন এবং ধানমন্ডিতে কবির নামে একটা বাড়ী বরাদ্দ দেন।এটা বঙ্গবন্ধুর গুনীদের কদর করার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯৭৩ সালে আমি প্রথম ঢাকা আসি আমার বড় মামার সাথে। তখন ক্লাস সেভেন এ পড়তাম সম্ভবত।মামাকে বললাম,আমি কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে দেখব।মামা রাজী হলেন।থাকতাম ২১ নং দক্ষিন বাসাবো রাজ্জাক মামার বাসায়। সারারাত অজানা এক আনন্দে কাটালাম,কারন আগামীকাল কবিকে দেখতে পাব,আমার প্রানের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।পরেরদিন চলে আসলাম,ধানমন্ডির কবি ভবনে।কিন্তু, গেটের সামনে আসতেই একটা ছোট্ট মেয়ে(সম্ভবত কবি নাত্নি খিলখিল কাজী) বলল, কবিকে দেখা যাবে না।মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।শেষমেস মামার অনুরোধে ভিতরে যেতে পারলাম।শিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছি, বুকের ভিতর ধড়পড় করছে,কারন একটু পরেই সেই কাংখিত মানুষটাকে দেখতে পাব।হা,পেয়ে গেলাম কবিকে।একটা খাটে শুয়ে ছিলেন,লম্বা মানুষটি।আমাদের দেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ছিলেন কবি।কথা বলতে পারতেন না। কে যেন একজন(মনে নাই) মহিলা খাবার নিয়ে আসলেন,তখন কবি খাবার দেখে উঠে বসলেন।আমি শুধু তাকিয়ে থাকলাম কবির দিকে।আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যিনি "বিদ্রোহী" কবিতা লিখে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন জানান দিয়েছেন শোষক গোষ্ঠিকে আমাদের অধিকারের কথা,হুঁসিয়ার করেছেন তাদেরকে।এসব স্মৃতি রোমন্থন করে ফিরে আসলাম সেদিন কবি ভবন থেকে।

বছর কয়েক আগে গিয়েছিলাম ভারত সফরে সরকারি কাজে।অবশ্য এরপর আরও কয়েকবার সরকারি কাজে ভারত যাওয়া হয়েছে।পৃথিবীর বহু দেশে গিয়েছি আমেরিকাসহ,কিন্তু পাশের দেশ ভারতে যাওয়া হয় নাই এর আগে।ভারতে গিয়ে আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ী চুরুলিয়া যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না।যে কথা সেই কাজ।কলকাতা শহরে আমার একজন প্রিয় মানুষ আছেন।বিশিষ্ট কবি,লেখক,নাট্যকার,অভিনেতা সাদা মনের মানুষ অজয় দেবনাথ দা।বউদিও অনেক গুনী একজন মানুষ। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে একজন।

অমায়িক ব্যবহার,উচ্চ শিক্ষিতা, সাদাসিধে একজন ভদ্র বাঙ্গালী মহিলা বলতে যা বুঝায়। আর ও আছেন সিরাজ ভাই।অত্যন্ত ভাল মানুষ সিরাজ ভাই,মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চ শিক্ষিত ভদ্র মানুষ। হাওরা ব্রিজের আশেপাশে বারানগর এলাকায় বসবাস তাদের। অজয় দার বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হল। আমার সন্মানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক,বউদির হাতের আপ্যায়ন। বহু শিল্পী, কবি ও ছেলেমেয়েদের সমাহার। অনেক রাত ভরে গান বাজনা,খাওয়া দাওয়া হল।আমি দারুনভাবে উপভোগ করেছিলাম সেই অনুষ্ঠানটি।

পরের দিন যাব বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কবির বাড়ীতে।অজয় দা,বউদি কে আমন্ত্রণ জানালাম আমার সাথে চুরুলিয়া যাওয়ার জন্য।তাঁরা রাজী হলেন। সাথে সিরাজ ভাইও আছেন।রওনা হলাম চুরুলিয়ার দিকে, কি যে অনুভুতি!!! কলকাতা শহর থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিম এ বর্ধমান জেলা। হাওড়া ব্রিজ এর পাশ দিয়ে মাইক্রোতে সকালে রওনা হলাম,সুন্দর ভাবে উপভোগ করছি কলকাতা শহরের আশেপাশের এলাকা। সারাপথ অজয় দার বিভিন্ন ধরনের হাসির গল্প ছিল বাড়তি পাওনা।পথে গাড়ী থামিয়ে বারবার চা নাস্তা খাওয়াতো আছেই। চলে আসলাম সেই কাংখিত চুরুলিয়া গ্রামে।প্রধান সড়ক থেকে বাইপাস একটি সড়কে আমরা ঢুকেই দেখতে পেলাম কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ। মনের ভিতর যে কি একটা অনুভুতি! আর মাত্র কয়েক কিলো মিটার,গিয়েই দেখতে পাব আমার প্রিয় কবির গ্রাম,চুরুলিয়া গ্রাম,ছোট বেলায় বইতে পড়েছিলাম।

রাস্তার পাশের প্রতিটি মাটি কনা, গাছপালা দেখছিলাম।এখানেই কবি চলতেন ফিরতেন।চারপাশে ফাঁকা মাঠ। এ সব এলাকায় কোন ফসল দেখলাম না। ইচ্ছা করলে ফল চাষ হতে পারে এখানে তাতে লাভবান হতে পারবে সন্দেহ নাই।দূরে পাহাড় দাঁড়িয়ে।যেমনটি দেখা যায় আমাদের সিলেট শহর পার হয়ে জাফলং এর পাহাড়। এগুলো দেখতে দেখতেই অবশেষ চলে আসলাম কবির বাড়ীতে।আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন কবি নজরুল ইসলামের এঁর আপন ভাতিজা রেজাউল ভাই আর মোজাহার ভাই।উনাদের সাথে আমার অনেকটা পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গেছে।কিছুদিন আগে রেজাউল ভাই আমার ঢাকার বাসায় এসেছিলেন। একটা গানের অনুষ্ঠানও করেছিলাম রেজাউল ভাইয়ের সন্মানে। আগে থেকেই রেজাউল ভাই, মোজাহার ভাই,আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।আমাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন রেজাউল ভাই।

দেখলাম কবির বাড়ী।ঘুরে ঘুরে দেখালেন রেজাউল ভাই কবির ব্যবহার করা আসবাবপত্র, কলের গান, কবির হাতের লেখা,বিভিন্ন পদক,কবির সেই মাদ্রাসা,মসজিদ, প্রমিলা মঞ্চ,প্রমিলা দেবী,কাজী সব্যসাচীর সমাধি ইত্যাদি।ছবিতে আমার ডানপাশে রেজাউল ভাই আর বাম পাশে মোজাহার ভাই সাদা পাঞ্জাবি পরা।আমাদের আপ্যায়ন করলেন তাঁরা।মোজাহার ভাইয়ের শরীরটা সেদিন খারাপ ছিল কিছুটা। অনেক কষ্টের সাথে জানাচ্ছি আমরা চুরুলিয়া থেকে আসার৩/৪দিন পর মোজাহার ভাই দুনিয়া ছেড়ে পরপারে চলে যান(ইন্না লিল্লাহে.........রাজেউন)।ঢাকা এবং কলকাতার টিভি চ্যানেলে খবরটা পেয়েছি।কলকাতা থেকে অজয় দা,রেজাউল ভাই আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন।প্রতি বছর এখানে অনুষ্ঠান হয় কবি নজরুল ইসলামের জন্ম দিনে।প্রমিলা মঞ্চের সামনের মাঠটি অনেকটা অরক্ষিত মনে হলো আমার কাছে।ভাংগাচোরা দেয়াল।ওটা সংস্কার করা দরকার কথায় কথায় জানালেন রেজাউল ভাই আর অজয় দা।আমিও তাই মনে করি।

ছবিতে কবির বাড়ী ভ্রমনের প্রায় সবকিছু দেখানোর চেষ্টা করা হল। কবি অসুস্থ অবস্থায় যে খাটে থাকতেন,যে কলের গানে গান শুনতেন, ঢাকা থেকে কবির সমাধির মাটি নিয়ে প্রতিকী সমাধি যা প্রমিলা দেবীর সমাধির পাশে আছে,চুরুলিয়া নজরুল বিদ্যাপিঠ,মসজিদ ইত্যাদি।

আগামী নিউজ/নাঈম

Dr. Neem