Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

করোনায় নতুন অভিজ্ঞতা রায়েরবাজার গোরখোদকদের


আগামী নিউজ প্রকাশিত: মে ১, ২০২১, ০৯:১৫ পিএম
করোনায় নতুন অভিজ্ঞতা রায়েরবাজার গোরখোদকদের

ছবিঃ সংগ্রহীত

ঢাকাঃ করোনা আক্রান্ত রোগী নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন কয়েকজন স্বজন। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর রোগীর মৃত্যু হয়। সে পর্যন্ত চিকিৎসা চালাতে আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে ওই পরিবারটির। রোগীর মৃত্যুর পর তাকে দাফন করতে নেওয়া হয় রাজধানীর রায়েরবাজার গোরস্থানে।

হাসপাতালের বিল ও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া শেষে তখন স্বজনদের কাছে মাত্র ৫০০ টাকা। এই টাকা গোরখোদকদের হাতে তুলে দেয় পরিবারটি। এরপর তাদের কাছে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো টাকা নেই।

ঘটনাক্রমে গোরখোদকরা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে কয়েকজন মিলে ওই পরিবারের গ্রামে যাওয়ার জন্য তাদের দেওয়া ৫০০ টাকাসহ এক হাজার টাকা তুলে দেন স্বজনদের হাতে। আশ্বস্ত করেন মৃত ব্যক্তির করবটি দেখে রাখবেন তারা।

রাজধানীর রায়েরবাজার গোরস্থানে করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের করব দেয়ার জায়গাটি ঘুরে দেখার সময় এই প্রতিবেদককে ঘটনাটি বর্ণনা করেন গোরস্থানটির গোরখোদকরা।

গোরখোদকরা জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা গ্রাম থেকে রোগী নিয়ে ঢাকায় আসছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেক অসহায় পরিবার তাদের স্বজনদের বাঁচাতে সহায়-সম্বল বিলিয়ে দিচ্ছেন হাসপাতালে। এমনকি হাসপাতাল থেকে দুই কিলোমিটার দূরে লাশ বয়ে আনতে অ্যাম্বুলেন্সকে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়ার কথাও জেনেছেন তারা।

একজন গোরখোদক বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন মৃত ব্যক্তিদের কবর দেই। কত মানুষের স্বজনহারানোর হাহাকার শুনি। কবর দিয়ে স্বজনদের ছলছল চোখে বসে থাকতে দেখি। আজ আমি অন্যের জন্য কবর খুঁড়ি, মাটি দেই, কবরের দেখাশোনা করি। একদিন আমাকেও এইভাবে কবর দেবে। কেউ কবরে কিছু নিয়া যাইতে পারে না। মানুষ তাইলে এত টাকা-সম্পদ করে কী করব!’’

তার কথা শেষ না হতেই অপর একজন বলে ওঠেন, ‘মানুষকে কবর দিতে গিয়া কতকিছু দেখি রে ভাই! হাসপাতালগুলা রোগী বাঁচানোর নামে পুরো পরিবারটারে মাইরা ফালাইতাছে। লাখ লাখ টাকা নিয়া নিতাছে। অ্যাম্বুলেন্সগুলাও ডাকাতি করতাছে। আপনারা সাংবাদিকরা একটু হাসপাতালগুলার দিকেও দেখেন।’

গোরস্থানে লাশ দাফনের সরকারি ফি ৫০০ টাকা। এ ছাড়া বাঁশ-চাটাইসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য হাজার দুই টাকার মতো খরচ হয়। আর কবর খোঁড়া থেকে শুরু করে দাফনের কাজটি সম্পন্ন করা এবং পরে কবরটির পরিচর্যা করার দায়িত্বে থাকেন গোরখোদকরা। লাশ দাফনের পর মৃত ব্যক্তির স্বজনরা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে যান তাদের।

করোনায় মৃতদের লাশ দাফনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি মওকুফ করেছে সরকার। তবে বাকি খরচটা দিতে হয় মৃত ব্যক্তির স্বজনদের। কিন্তু করোনায় মারা গেছেন এমন অনেক মৃত ব্যক্তির স্বজনরা গোরখোদকদের কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, বিশেষ করে হাসপাতাল থেকে সরাসরি আসা লাশের নিম্নবিত্ত স্বজনরা। তারা বকশিস তো দূরের কথা খরচের টাকা দিতেও কষ্ট হয় তাদের।

করোনা মহামারিতে দেশে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। তাদের দাফন করতে প্রস্তুত গোরস্থানগুলো। স্বাভাবিকের চেয়ে এই বেশি মৃত্যুর চাপ সামলাতে আগাম কবর খুঁড়ে রাখা হচ্ছে গোরস্থানে। প্রতিদিনই রাজধানীর গোরস্থানে আসছে করোনায় মারা যাওয়া মরদেহ। তাদের দাফন করতে যেন বিলম্ব না হয়, তাই আগাম ৩০-৪০টির মতো করব খুঁড়ে রাখছে গোরখোদকরা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার গোরস্থান ঘুরে দেখা যায়, করবস্থানটিতে কোভিডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কবর দেয়া হচ্ছে আলাদা স্থানে। প্রতিদিনই সেখানে হচ্ছে নতুন কবর।

রায়েরবাজার গোরস্থানটি দেশের সবচেয়ে বড়, প্রায় ৮১.৩০৩০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। ১৬টি ব্লকে বিভক্ত গোরস্থানটিতে কবর দেয়া যাবে প্রায় ৯০ হাজার ৫৩৯টি। ১৬টি ব্লকের মধ্যে ৮ নম্বর ব্লকটি নির্ধারণ করা হয়েছে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন করার জন্য।

৮ নম্বর ব্লকটি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে এখন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।

গোরস্থানটির দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ জানান, প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে চারজন করোনায় মৃত ব্যক্তিতে দাফন করা হচ্ছে এই গোরস্থানে। একদিন সর্বোচ্চ ১৪ জনকে দাফন করা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এই গোরস্থানটিতে। অন্যান্য গোরস্থানেও করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের দাফন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আগামীনিউজ/প্রভাত