Agaminews
Dr. Neem Hakim

সরকারি খাতে বেতন বাড়িয়েও কমেনি দুর্নীতি


আগামী নিউজ | ডেস্ক রিপোর্ট প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২১, ০১:০০ পিএম
সরকারি খাতে বেতন বাড়িয়েও কমেনি দুর্নীতি

ফাইল ছবি

ঢাকাঃ প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরেও দুর্নীতি দমনে সফলতা পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারি খাতে বেতন বেড়েছে, কিন্তু কমেনি দুর্নীতি। স্বাস্থ্য, রাজউক, ভূমি, বিদ্যুৎ ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের সেবাখাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে ব্যাপক দুর্নীতি।

এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের উল্লেখযোগ্য নজিরও নেই। এমনকী সংস্থার কিছু কর্মকর্তা ঘুষ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে কমিশন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির যে ব্যাপকতা, সে তুলনায় দুদকের মামলার সংখ্যা সমুদ্রের কয়েক ফোঁটা পানির মতো। 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিদের মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুদক কখনোই বিতর্ক মুক্ত হতে পারেনি। সংস্থাটির নাম এবং আইন পরিবর্তন মাধ্যমে কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হলেও পূর্বের (ব্যুরো) ছায়া এখনো রয়ে গেছে। প্রভাবশালীদের প্রতি বা ক্ষমতাবানদের অনুগ্রহভাজনদের প্রতি দুদক আইনের আপনগতির চর্চা খুব কমই। অপরদিকে দুদক কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নজরদারিতে নেই পৃথক কোনো টিম। এ অবস্থায় নখদন্তহীন বাঘই রয়ে গেছে দুদক। ২০০৪ সালে একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যাত্রা শুরু হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুসারে এ কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টির দায়িত্ব এ আইনের মাধ্যমে দুদকের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। কমিশন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক কার্যক্রম চালাচ্ছে।

দুদক আইনানুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের ছয়টি অনুবিভাগের মধ্যে অন্যতম বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগ। এ অনুবিভাগের অধীনে বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১, বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ ও বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-৩ নামে তিনটি শাখা রয়েছে।

এ শাখাগুলো যেসব বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে তা হলো-গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ, এ বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত উইং-এর অধীন ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান টিম রয়েছে। এ টিমগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহে দুর্নীতি উদ্ঘাটন, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করে।  ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান টিম যেসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করে সেগুলো-ঢাকা সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (কাস্টমস্ উইং) এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ, পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও আবাসন অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এবং বিদ্যুৎ ও পানি সম্পদ (পিডিবি, পাউবো, ডেসকো, ডিপিডিসি, ওয়াসা)।

এছাড়া সরকারি চুক্তি-ক্রয়-পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প সংক্রান্ত দুর্নীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অন্যান্য অর্থ সংক্রান্ত অপরাধ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত অপরাধ, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব (ভিআইপি) ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধের দুর্নীতি, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন, এনজিও-দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিসহ বিবিধ বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করে দুদক। 

দুদকের আওতায় যেসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার রয়েছে, সে তুলনায় মামলা দায়েরের পরিমাণ খুবই কম। দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন উৎস থেকে ২০১৮ সালে দুদকে জমা হওয়া অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৬০৬টি। এর মধ্যে থেকে যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধান করা হয় ১ হাজার ২৬৫টি অভিযোগ। আবার এই অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের পর কমিশন মামলা দায়ের করেছে ২১৬টি। এছাড়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয় ১ হাজার ৪০৪টি অভিযোগ। ২০১৯ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে অভিযোগ এসেছে মোট ২১ হাজার ৩৭১টি। এগুলো যাচাই -বাছাই শেষে অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয় ১ হাজার ৭১০টি অভিযোগ এবং অনুসন্ধান শেষে মামলা হয়েছে ৩৬৫টি। এছাড়া, ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো অভিযোগের সংখ্যা ৩ হাজার ৬২৭টি।

এর আগে ২০১৪ সালে দুদকে অভিযোগের সংখ্যা ছিল সাড়ে ১২ হাজার। এরমধ্যে দুদক অনুসন্ধান করেছে ১ হাজার ৬৮৯টি। ২০১৫ সালে অভিযোগ ১০ হাজার ৪১৫টি। তা থেকে অনুসন্ধান করা হয় ১ হাজার ২৪০টি। ২০১৬ সালে মোট অভিযোগ ছিল ১২ হাজার ৯৯০টি, তা থেকে অনুসন্ধান করা হয়েছে ১ হাজার ৭টি। ২০১৭ সালে অভিযোগ ছিল ১৭ হাজার ৯৫৩টি। অনুসন্ধান করা হয় ৯৩৭টি অভিযোগ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এমন প্রশ্নের জবাবে দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে দুদক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তাতে সফল হয়নি সংস্থাটি। নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরেও সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের দুর্নীতি দমনে দুদকের প্রভাব নেই। রাজউক, ভূমিসহ সব সেবাখাতেই চলছে অবাধে ঘুষ বাণিজ্য। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার আগে যখন দুর্নীতি দমন ব্যুরো ছিল তখন থেকেই সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, এখনো আছে। তাছাড়া দুর্নীতির দায়ে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের অনেকেই নিম্নপদস্থ কর্মচারী। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, দুর্নীতির শাস্তি হিসেবে হয়তো সাময়িক বরখাস্ত নতুবা বদলি করা হয়। একেবারে চরম পরিস্থিতিতে চাকুরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপ কখনোই দুর্নীতির জন্য যথাযথ শাস্তি হতে পারে না। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার জন্যই সার্বিক ভাবে দুর্নীতি দমনে তেমন কোনো সফলতা নেই দুদকের। 

দুর্নীতি করে অনেকে প্রভাবশালী পার পেয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, মানুষ ক্রমশই দুর্নীতির ঘটনা মেনে নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করছে না। যা ঘটছে, তার সবই স্বাভাবিক মনে করছে। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি কমছে না।

তিনি বলেন, বছর তিনেক আগে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে শতকরা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল নজীরবিহীন ঘটনা। কিন্তু বেতন বৃদ্ধি এখাতে কোনো সুফল দেয়নি। যদিও সরকারের তরফ থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, বেতনভাতা বৃদ্ধি করলে সরকারি অফিসে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেটির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাই কমিশনের যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে-তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ দুদকের কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে হবে। চলমান গতি দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।  

দুর্নীতির মহাপ্লাবন চলছে মন্তব্য করে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, এ দুর্নীতি প্রতিরোধ এই দুদকের পক্ষে সম্ভব নয়। এ দুর্নীতি রুখতে সবার আগে সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। আমি আগেও দুদকের সভায় বলেছি, স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদককে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করতে। সমাজে নৈতিকতা ফিরে না আসলে আইন দিয়ে, খাঁচা দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। মৃত্যুদণ্ড দিয়েও বন্ধ করা যাবে না। 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে দুদক পুরোপুরি সফল না হলেও ব্যর্থ হয়নি। সংসদে দুদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয়। কিন্তু সংসদ সদস্যরা কখনোই দুর্নীতি বিস্তার ও প্রতিরোধ নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করেন না। উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকার কারণে তারা দুর্নীতি প্রতিরোধে সফল হয়েছে। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে  যেসব সমস্যা রায়েছে তা চিহ্নিত করা দরকার। প্রকৃত রোগ চিহ্নিত করতে পারলে তার উপশম করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধে সফল হওয়া সম্ভব নয়।

দুুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে দুদক নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সফলতা যেমন আছে, তেমনি ব্যর্থতাও আছে। সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফলতা আসেনি। এরপরও প্রাপ্তি একেবারে কম নয়। তিনি বলেন, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনুসন্ধান হয়। প্রমাণ পাওয়া না পাওয়া গেলে সেই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয় বা পরিসমাপ্তি হয়। কিন্তু নথিভুক্ত করার মানে দায়মুক্তি হতে পারে না।

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক তার নিজস্ব পন্থাতেই কাজ করছে উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আগের চেয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা বেড়েছে। আমাদের কর্মকর্তাদের দক্ষতাও বেড়েছে। এখন আমরা যেসব অভিযোগ নিচ্ছি, সেগুলো অনেক বেশি সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট। তাছাড়া দুদককে আন্তর্জাতিক সংস্থার আদলে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুদকের গোয়েন্দা বিভাগের কার্যক্রম কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের গতিবিধি অনুসরণে তথ্যপ্রযুক্তি ও কল রেকর্ডের জন্য নিজস্ব সার্ভার স্থাপন করেছে দুদক। মানুষের কাছ থেকে দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ হটলাইন চালু করা হয়েছে।

আগামীনিউজ/এএইচ