Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

ভূ-রাজনীতির ফাঁদে আটকে আছে রোহিঙ্গা সংকট


আগামী নিউজ | আল আমীন হোসেন মৃধা প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০, ১২:৫৫ এএম
ভূ-রাজনীতির ফাঁদে আটকে আছে রোহিঙ্গা সংকট

ছবি; সংগৃহীত

ঢাকাঃ বর্তমান বাংলাদেশের যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে, সেটা হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। এ প্রক্রিয়া এখন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ১৯৭০ সাল থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন। তখন থেকেই শরণার্থীর নাম দিয়ে এ দেশে রোহিঙ্গারা বসবাস করে আসছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি সূত্রে জানা গেছে। সেই ৫ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে বর্তমানে আরও ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা যোগ হয়েছে বাংলাদেশে। তারা কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে। এখনও তাদের আসা থেমে নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর ও মিয়ানমার সরকার বৈঠকের পর বৈঠক করছে। 

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পর সমস্যাটি যে এতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা অনেকের ভাবনায়ও ছিল না। উপরন্তু এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়, যার ফলে মনে হয়েছিল দুই দেশের সমঝোতার মাধ্যমে কোনো ধরনের সংকট ছাড়াই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে এবং সমস্যাটি দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এই সমঝোতার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ দেখতে পাইনি।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি বাংলাদেশ দেখিয়েছে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ নিশ্চিত করেছে তাদের সুরক্ষা, ব্যবস্থা করেছে জীবন রক্ষাকারী মানবিক সাহায্যের। আজ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিবন্ধিত প্রতি দশ জন রোহিঙ্গার মধ্যে নয় জন বাস করে বাংলাদেশে। 

এই বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা করতে মানবিক কারণে মমতাময়ী মায়ের ভূমিকায় আবতীর্ণ হয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব দরবারে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন এই মমতাময়ী নেত্রী। যেহেতু এ দেশের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেহেতু এই রোহিঙ্গাদের অধিক সময় এখানে আশ্রয় দেয়া সম্ভবপর হবে বলে আমার মনে হয় না।

বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান আর শিক্ষার সুযোগ দিতে বাংলাদেশ সরকার যেখানে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে ভিনদেশি নাগরিকের ভরণপোষণ এ দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। ফলে তাদের সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে চীন এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অতীব জরুরি। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে।

পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের পক্ষে এতগুলো মানুষকে বছরের পর বছর আশ্রয় দেওয়া খুবই কঠিন। এরই মধ্যে উখিয়া-টেকনাফের ৬ হাজার একর বনভূমি ও পাহাড়ি এলাকা উজাড় হয়ে গেছে আশ্রয় শিবির নির্মাণ করতে গিয়ে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন অভিযানের মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক দিক থেকে আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। নজিরবিরল এ উদ্যোগ সারাবিশ্বে একবাক্যে প্রশংসিত হয়। জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বহুপক্ষীয় ফোরাম ও বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা-সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সবাই বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকরভাবে কেউই বাংলাদেশের পাশে জোরালোভাবে এসে দাঁড়ায়নি। বরং, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য বড় রাষ্ট্রগুলো প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা স্বার্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। এসব টানাপড়েনে যত দিন গড়াচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট ততই অমীমাংসিত পথে হাঁটছে। যদিও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী। তবে নতুন পরিস্থিতিতে কঠোরতার দিকে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে সংকটের বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। শুরু থেকেই এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে টানাপড়েন তৈরি হয় চীন ও রাশিয়ার। জাপান ও ভারত এ ইস্যুতে চুপ থেকে মূলত চীন ও রাশিয়ার অবস্থানকে সমর্থন করে। পশ্চিমারা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিসি) মতো বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে এ রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করতে, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের জেনারেলদের ও সেনাবাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি করে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশটির ওপর বাণিজ্যিক ও অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপ করতে। যাতে করে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে দেওয়া যায় দেশটিকে। মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার দিকে তাদের যতটা ঝোঁক দেখা গেছে সে তুলনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখা গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডল থেকে সরিয়ে নিজেদের স্বার্থে একেবারে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে চীন। রাশিয়া চীনের এ অবস্থানকে জোরালোভাবে সমর্থন দিয়েছে। চীনের মধ্যস্থতাতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তড়িঘড়ি করে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টা এখন অনেকটাই চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। চীন যদি মিয়ানমারের উপর জোরালোভাবে চাপ দেয় তাহলেই এটা সম্ভব। কিন্তু এর থেকেও বড় বিষয় হচ্ছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। রোহিঙ্গাদের তারা প্রকৃতপক্ষে ফিরিয়ে নিতে চায় কিনা সে প্রশ্নই এখন বড় করে দেখা দিয়েছে। জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, ভূমি আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না মেলা পর্যন্ত ফিরতে চায় না। অন্যদিকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের দেশটির নাগরিক বলে স্বীকৃতি দেয় না। সেনা নিয়ন্ত্রিত দেশটির শাসকরা সহসাই রোহিঙ্গাদের দাবি মেনে নেবে এমন কোনো লক্ষণই নেই। চীন রোহিঙ্গাদের ফেরানোর উদ্যোগ নিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে বললেও তাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে কোনো কথা যে বলবে না সেটাই স্বাভাবিক। যাই ঘটুক চীন নিজেদের পকেটরাষ্ট্র মিয়ানমারের স্বার্থের দিকেই থাকবে সর্বাগ্রে। এর প্রমাণও মিলেছে সম্প্রতি। বাংলাদেশের পাশে থেকে যখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে চীন ঠিক সেসময়ই মিয়ানমারে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত চেন হাই বলেছেন, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপ সহ্য করবে না বেইজিং।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার দাবির সমর্থনে কিছু বলতে যাওয়া মানে কূটনৈতিক বেড়াজালে আটকে যাওয়া। তাতে মিয়ানমার উল্টো সুযোগ পেয়ে যাবে। এ সংকট সমাধানে বিষয়টিকে অবশ্যই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন তারা। এদিকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক বিবৃতিতে এ পরিস্থিতির সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাখাইন সংকটে মানবিক সহায়তায় শীর্ষস্থানীয় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ সালের আগস্টে সহিংসতা শুরুর পর থেকে এ খাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার দিয়েছে। মানবিক সহায়তায় অন্যদের যুক্ত হতে আহ্বান জানাই আমরা। নির্যাতনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং নির্যাতনের ফলে কমপক্ষে ১০ লাখ শরণার্থী, যারা বাংলাদেশে আশ্রয় পেয়েছেন- তাদের সবার প্রতি আমাদের সহানুভূতি। মিয়ানমার চেষ্টা করছে শক্তিশালী, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ একটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। একই সঙ্গে মিয়ানমারে ন্যায়বিচার ও স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে অন্যদের প্রতি আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে বাংলাদেশ বরাবরের মতই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে চেষ্টা করছে। বল প্রয়োগ কিংবা সরাসরি মিয়ানমারের প্রতি চাপ প্রয়োগে শুরু থেকেই বাংলাদেশ  এড়িয়ে চলেছে এবং চলছে। প্রধানমন্ত্রী কূটনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কে রোহিঙ্গা সমাধানে আহ্বান জানিয়েছেন।  বৈশ্বিক রাজনৈতিক জাঁতাকলে পৃষ্ঠ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি যেন নতজানু।

 সব দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার পাশে থাকার বিকল্প নেই বিশ্বনেতাদের। ‘বাংলাদেশের পক্ষে থাকা’র অর্থ হলো, মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। শুধু আশ্বাসই যথেষ্ট নয়, ফলপ্রসূ কিছু করে দেখাতে হবে। এ সমস্যার টেকসই সমাধান বের করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নেপিডোর গণহত্যার সাথে যারা জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর পদক্ষেপ নেয়াও অতীব জরুরি। এটি এ জন্য প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো দেশ সংখ্যালঘুদের ওপর হীনস্বার্থে নির্যাতন চালাতে সাহস না করে।

আগামীনিউজ/এএইচ