Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

করোনায় ধনিকশ্রেণী আতঙ্কিত, পাত্তাই দিচ্ছে না দরিদ্ররা


আগামী নিউজ | মিথুন মুৎসুদ্দী প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০, ০৫:৩৪ পিএম
করোনায় ধনিকশ্রেণী আতঙ্কিত, পাত্তাই দিচ্ছে না দরিদ্ররা

ফাইল ছবি

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আতঙ্কের নাম কোভিড১৯ বা করোনা ভাইরাস। করোনার ভাইরাসের পার্দুভাবে ঘুরে গেছে অর্থনৈতিক দাড়িপাল্লার হিসেব। করোনা ভাইরাসের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে পুঁজিবাদী বিশ্ব। শ্রেণী সংকটের সাথে বাড়ছে শ্রেণী বৈষম্যও।গত কয়েকবছর আগেও যেখানে তর তর করে বাড়ছিলো কোম্পানিগুলোর শেয়ার। সেখানে করোনার ছোবলে দেখা যায় ব্যাপক অসামাঞ্জস্য পতন। কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। ছাঁটাই করে অসংখ্য কর্মী। এই বিপুল  বেকারত্বের সাথে বেড়েছে হতাশা। পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিকা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হতাশাজনক মানসিক ভারসম্যহীনতা ২০১৯ এর জানুয়ারী থেকে জুন মাসেও ১১.০% ছিল, তা  ২০২০ এর মে এর ১৪-১৯ তারিখে পৌঁছায় ৩৩.০৯% এ। এইভাবে বিবিসি জানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ থেকে ২০২০ এর মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ২০১৮ তেও যেখানে ৪% ছিল, সেটি ২০২০ এ গিয়ে দাঁড়ায় ১৪.৭% এ।পরিবর্তন হয় সরকারী সিদ্ধান্তও। আন্তজার্তিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ জানায়  বিশ্বঅর্থনীতি সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে। ঊনিশশো তিরিশের পর করোনার মহামারীই সবচেশে বড় মহামন্দা ( গ্রেট ডিপ্রেশন )  তৈরি করেছে।

এই যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তাতে  ধনী - দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্যে কেমন তফাৎ তৈরি করেছে- তা স্বাভাবিকভাবেই অনুসন্ধিত মন জানতে চায়। ফোর্বস ম্যাগাজিন বলছে এই করোনার মহামারীতেও ধনীদের সম্পত্তি অর্জন ও তার পরিমাণে খুব একটা হেরফের হয় নি। সেরা দশ ধনীর মধ্যে ছয়জনেরই সম্পত্তি বেড়েছে। অপরদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বেড়েছে আশাতীতভাবে। বেড়েছে জেফ বেজ, এলিস ওয়াল্টন, মুকেশ আম্বানীর আয়। খুব একটা ছন্দপতন হয় নি তাদের। ২০১৯ এ যেখানে বিল গেটসের আয় ছিল ৯৬.৫ বিলিয়ন তা এই মহামারীতেও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ বিলিয়নে। তথ্য প্রযুক্তি নির্্ভর প্রতিষ্ঠানের মালিকদের আয় বেড়েছে দ্বিগুণ ভাবে। দেশসমূহের ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানো ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরণের সুবিধা দানের ফলে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা করোনার ছোবল থেকে রক্ষা পেলেও রক্ষা পায় নি মধ্যবিত্ত শ্রেণী। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যে কাল হয়ে দাড়িয়েছে করোনার ভয়াবহতা। ফলত, ধনিক শ্রেনীদের জন্যে করোনা আতঙ্কের নাম না হয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্যে। তারা অধিকাংশই বেছে নিছে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা। মূল সংকটে পড়েছে দরিদ্র শ্রেণী। যারা মূলত শারীরিক পরিশ্রমে উপার্জন করে থাকে। করোনায় শারীরিক দূরত্ব রাখার নীতি তাদের আয় - উপার্জনে বড় অন্ত:রায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, বেকারত্ব জনিত আত্মহত্যার সংখ্যাও বেড়েছে। বাজার অর্থনীতির উপরিভাগ টিকে থাকার জন্যে যথেষ্ট সামর্থ্যবান হতে পারলে, বাজারের ভারসাম্যহীনতার কারণে জীবন যাপনে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণী।এই সংকট ও অর্থনৈতিক তাড়ণায় দরিদ্ররা স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারছে না। বাজারে বৃদ্ধি পাওয়া জীবাণুনাশক ও পরিষ্কারক পণ্যের বাজারের  সাথেও দরিদ্র শ্রেণীর আয়ের একটা বড় পার্থক্য দাঁড়িয়েছে এই মহামারীতে। ফলে, দরিদ্র শ্রেণীর এই স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন কেবলমাত্র অবহেলাই নয়, অসংগতিও বলা যায়। করোনার শ্রেণীবৈষম্যের তীব্রতা কেবল স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নয়। সরকারী প্রভাবকও বিচার্য। সরকারসমূহ শ্রেণীবৈষম্যকে আরো প্রকট করে তুলেছে। নিউ ইর্য়ক টাইমসের মতে, ২০২০ এর মে মাসে ৭৫ টি দেশের মোট জনসংখ্যার ৮৮% মাস্ক পড়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছেন। এর মধ্যে  উন্নয়নশীল রাষ্ট্র ভিয়েতনামে মাস্ক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯১% তার বিপরীতে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাস্ক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০% এবং যুক্তরাজ্যে ১৬% (স্ট্যাটিকা)। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হওয়ার পরও ভিয়েতনামে এখনও পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ১০৪৯ জন এবং মৃত্যু ৩৫ জন। যেখানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট আক্রান্ত ৬৪৩১১৬০ এবং মৃত্যু ১৯৮২০ জন। ভিয়েতনাম সরকারের নিষ্ঠাগত দায়িত্ব পালন ও যথাসময়ের পদক্ষেপের ফলে  সে দেশে অনেকটাই কমে এসেছে করোনার প্রকোপ। তবে, সরকারের পাশাপশি প্রয়োজন পড়ে জনসংখ্যার নিজের সচেতনারও। ধনিক শ্রেণী স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উদিগ্নতায় এই করোনার সময় বেড়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাস্ক, স্যাটনিটাইজারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্যের  ক্রয় বিক্রয়।

অপরদিকে, রীতিমত স্বাস্থ্যবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছে দরিদ্র শ্রেণী। তাদের খুব কমই কাপড়ের মাস্ক পড়লেও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকির তোয়াক্কা করেন না। তাদের অনেকের মতে, এসব স্বাস্থ্যবিধি তার জীবিকার সাথে সাংঘর্ষিত বিধায় তারা এড়িয়ে চলেন। দরিদ্র শ্রেণীর এই অবহেলার জন্যে অনেকে শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় কুসংস্কারকে দায়ী করেন।  ধনী-দরিদ্রের আর্থিক বৈষম্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিকের পার্থক্য বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক। অনেক দরিদ্র শ্রেণীই সামান্য জ্বর মনে করে এবং চিকিৎসার খরচের তারতম্য বিবেচনা করে হাসপাতালেও যেতে রাজি হচ্ছেন না। যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ধনিক শ্রেণীর বড় অংশই স্বাস্থ্য ঝুঁকির উৎকন্ঠায় পাড়ি দিচ্ছে উন্নত দেশগুলোতে- নিজস্ব জেট প্লেনে।সেখানে, দরিদ্র শ্রেণীরা মেতে উঠছেন অলৌকিকতায়। এই দুই শ্রেণীর স্বাস্থ্যদর্শনগত পার্থক্য এবং সংঘাত করোনার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে কয়েকগুণ। দরিদ্র শ্রেণীর যেখানে অসচেতনা, সেখানে ধনিক শ্রেণীর অতি উৎকন্ঠায় বাজার পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক চিত্র হয়ে পড়ছে বেসামাল। বাড়ছে স্বাস্থ্য আতঙ্ক।

আগামীনিউজ/মিথুন