Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

বিষাক্ত স্কিম মিল্ক পাউডারে তৈরি হচ্ছে তরল দুধ


আগামী নিউজ | তরিকুল ইসলাম সুমন প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২০, ১১:২০ এএম
বিষাক্ত স্কিম মিল্ক পাউডারে তৈরি হচ্ছে তরল দুধ

ছবি সংগৃহীত

ঢাকা : দেশে দুধের ঘাটতি থাকায় গুঁড়া দুধ আমদানি বাড়ছেই। সেইসঙ্গে আসছে নিম্নমান ও মেয়াদ উত্তীর্ণ গুঁড়া দুধ। এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গুঁড়া দুধ থেকে কিছু দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানি পাস্তুরিত তরল দুধ তৈরি করছে। তৈরিকৃত এ দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিলিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খামারিরা অন্যদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একজন মানুষের প্রতিদিন ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। এ হিসেবে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টন দুধ প্রয়োজন। কিন্তু দুধের যোগান সীমিত।  ফলে ঘাটতি মেটাতে নানা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে ফটকা ব্যবসায়ীরা। এসব ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নামি দামি কোম্পানির দুধের মোড়কে ভেজাল দুধ ভরে বিক্রি করছে। এই  ব্যবসায়ী শ্রেণি বিভিন্ন ঈদ ও অন্যন্য উৎসবকে পুঁজি করে ব্যবসা করে। ফলে দেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ডেইরি শিল্প বিকাশ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়। আর গুঁড়া দুধ আমদানির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে শুল্কহার কমায় এক্ষেত্রে উৎসাহিত হচ্ছে আমদানিকারকরা। গত পাঁচ অর্থবছরে গুঁড়া দুধ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২৮ শতাংশ হয়েছে। বাজেটে শিশু খাদ্যের কথা বলে গুঁড়া দুধ আমদানিতে প্রায় প্রতি বছরই শুল্কহার কমানো হয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদিত তরল দুধের ভ্যাট মওকুফ সুবিধা ছাড়া আর কোনো সুবিধা নেই। এমনকি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী মেশিনপত্র, মোড়কীকরণ উপাদান আমদানিতে ভ্যাট প্রদান করতে হয়।

জানা গেছে, দুগ্ধশিল্পে ব্যবহূত মিল্ক ট্যাংকার, এসেপটিক প্যাকেজিং আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ, দুগ্ধজাত পণ্যের মোড়কীকরণ উপাদান আমদানি পর্যায়ে ৩২ শতাংশ শুল্ক ও দুগ্ধ শিল্পের জন্য শীতলীকরণ ট্যাংক, মিল্কিং মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে ৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এছাড়া দুগ্ধশিল্পের উপর ৫ শতাংশ করপোরেট কর রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে দুধের বাজার সমপ্রসারণের বিরাট সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারের নীতি সহায়তার কোন বিকল্প নেই। সরকারের নীতি সহায়তা পেলে দেশ একদিকে যেমন দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে অন্যদিকে এ খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (খামার) ড. এবিএম খালেদুজ্জামান আগামীনিউজ ডটকমকে জানান, আমাদের দেশে প্রায ২ লাখের অধিক ছোট  বড় ডেইরি ফার্ম রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় তা সীমিত। সীমিত যোগানের সুযোগ নিয়ে অনেকে ভেজাল দুধের কারবার করছে। 

তিনি জানান, আমরা বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করেছি। অনেক দুধ নষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, করোনাকালীন সময়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত দুগ্ধ খামারিদের প্রতি গরু (৫ লিটারে) ৫০০০ টাকা এবং প্রতি গরু (১০ লিটারে) ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর রমজানসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে যখন তরল দুধের চাহিদা বেশি থাকে, মূলত তখনই অধিক মুনাফার আশায় গুঁড়া দুধ থেকে তরল দুধ তৈরি করে কিছু কোম্পানি। দুধের চাহিদাকে পুঁজি করে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। বড় কোম্পানির কিছু এজেন্টদের একটি চক্র এই নকল দুধ তৈরি করছে। এই দুধ তারা বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করছে। এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও কিছু কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ছানার পানিই নকল দুধ তৈরির প্রধান উপকরণ। আর এই ছানার পানির সঙ্গে ক্ষতিকর স্কিম মিল্ক পাউডার, ফরমালিন, কাটার অয়েল, সোডা ও দুধের ননীর সঙ্গে দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। পরে আসল দুধের সঙ্গে নকল দুধ মিশিয়ে বিভিন্ন নামি-দামি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে তা সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুধের ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এ অসাধু চক্র ভেজাল দুধে ফরমালিনসহ স্কিম মিল্ক পাউডার ব্যবহার করে। এতে দুধের ঘনত্ব বেড়ে যায়, দুধ তাজা থাকে। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযানে ল্যাকটো-মিটার দিয়ে এই সূক্ষ্ম প্রতারণা ধরা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। 

এদিকে, তরল দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে বলে হাইকোর্টে জমা দেওয়া দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নকল-ভেজালের বিরুদ্ধে বছরজুড়ে অভিযান চললেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। 

সম্প্রতি র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বারো আউলিয়া ডেইরি মিল্ক অ্যান্ড ফুড লিমিটেড ফ্যাক্টরিতে অভিযানে গেলে দেখা যায়, সেখানে ১০০ লিটার দুধের সঙ্গে পানি , স্কিম মিল্ক পাউডার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে ২৮০০ লিটার পাস্তুরিত দুধ তৈরি করা হচ্ছে। কখনও কোনো দুধ ছাড়াই শুধু স্কিম মিল্ক পাউডার ও সোডিয়াম, লবণ, চিনি ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত পাস্তুরিত দুধ তৈরি করছে তারা।

আগামীনিউজ/টিআইএস/এমআর

Dr. Neem