Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

জীবনের অনিশ্চয়তায় ঢাকা ছাড়ছে সাধারণ মানুষ


আগামী নিউজ | আরিফুর রহমান প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২০, ০৫:৩০ পিএম
জীবনের অনিশ্চয়তায় ঢাকা ছাড়ছে সাধারণ মানুষ

ফাইল ছবি

ঢাকা: সন্তান বাড়ি এসেছে। মায়ের খুশির অন্ত নেই। সন্তানের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করাই তার সারা দিনের কাজ। কেন না, দু’দিন পরেই প্রিয় সন্তান আবারো শহরে চলে যাবে। বছরে অল্প কয়েক দিনের জন্য যতবারই সন্তানকে কাছে পাওয়া যায়, আদর যত্নের কোনো কমতি রাখেন না বাবা-মা। কখনো কখনো সন্তানকে দেখতে ইচ্ছে করলেও পড়াশুনা বা চাকরির ব্যস্ততার কারণে তারা বাড়ি আসতে পারে না। সেই সন্তানরাই এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ি এসে বসে আছে।

তারা দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকবেন এমন খবরেও খুশি হতে পারেছেন না বাবা-মায়েরা। কেন না সন্তান যে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখতে পেয়েই গ্রামে চলে এসেছেন। কবে ফিরবেন তাও জানেন না। কেউ চাকরি হারিয়ে, কারো ইউনিভার্সিটি বা স্কুল-কলেজ বন্ধ, কেউবা চাকরি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে শিকড়ে ফিরে গেছেন। তারা জানেন না আবার এই যান্ত্রিক শহর ঢাকায় কবে ফিরবেন।

করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে সারা বিশ্বই প্রায় ঘরবন্দি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ চাকরিজীবীই অফিস করছেন ঘরে বসে। অথবা কারো কারো কর্মস্থলে যাওয়া লাগলেও তা সীমিত আকারে। অর্থাৎ কিছু দিন অফিস করছেন আবার কিছু দিন বাসায় থাকছেন।

তবে এরমধ্যে অনেককেই চাকরি হারিয়ে কর্মস্থল ঢাকা শহর ছেড়ে হগ্রামে চলে যেতে হয়েছে। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী যারা বিভিন্ন মেসে থাকতেন তারাও মেস ভাড়ার ঘানি টানতে না পেরে গ্রামে চলে গিয়েছেন।

রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে খিলগাঁওয়ে কয়েক বন্ধুর সাথে মেসে থাকতেন উজ্জল হোসাইন। অপেক্ষায় ছিলেন একটি ভালো চাকরি জোগাড় করে স্থায়ী হবেন এই শহরে। এর ফাঁকে টিউশনি করে চলতো তার খরচপাতি। কিন্তু মহামারি করোনার কারণে টিউশনি হারিয়েছেন আরো আগেই। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত মেস ভাড়াও দিতে পারছিলেন না। তাই বাধ্য হয়েই রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে গিয়েছেন তিনি।

উজ্জল আগামী নিউজকে বলেন, মাস্টার্স শেষ করেছি দুই বছর হয়ে গেল। এখনো একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারিনি। টিউশনি করে চলতাম। করোনার কারণে এখন তাও বন্ধ হয়ে গেল। উপায় না পেয়ে বাড়ি চলে এসছি। এখন আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে বাবা-মাও চিন্তার মধ্যে আছে।

তিনি আরো বলেন, তার মেসেই তিনিসহ ছয়জন চাকরি প্রত্যাশি ছিলেন। সবাই বুধবার (২৪ জুন) মেস ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে গেছেন।

ঢাকা কলেজের সমাজ বিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ নাদির হোসাইন। কলেজ বন্ধ প্রায় তিন মাসের বেশি সময় ধরে। এতোদিন বাড়ি থেকে টাকা এনে মেস ভাড়া দিলেও আর কতোদিন এভাবে দিতে হবে, সে অনিশ্চিয়তায় তিনিও মেস ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে গিয়েছেন।

একটি বায়িং হাউজে চাকরি করতেন কুমিল্লার বাহারুল ইসলাম। করোনার কারণে মে মাসে চাকরিচ্যুত হন তিনি। এরপর আরো একমাস এই শহরে ছিলেন, নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশায়। নতুন চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারায় তিনিও তিন সন্তান নিয়ে গ্রামে চলে গিয়েছেন।

গ্রামে গিয়ে কী করবেন আগামী নিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রামে গেলে অন্তত পক্ষে বাড়ি ভাড়াটাতো আর দেওয়া লাগবে না। তবে চিন্তায় আছি সন্তানদের পড়াশুনা নিয়ে। স্কুল খুললেতো আবার ওদের নিয়ে আসতে হবে। ততোদিনে একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারলে কী হবে?

একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইনে ভার্সনে সাংবাদিকতা করেন জহুরুল ইসলাম। বাসায় বসেই অফিসের কাজ করার সুযোগ দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। তাই তিনি রমজানের ঈদের আগ পর্যন্ত রাজধানীর শুক্রাবাদের মেসে থেকেই অফিস করেছেন। পরে ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আর ঢাকায় আসেন নি। ফরিদপুর থেকে বাড়িতে বসেই অফিসের কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি গতকাল একদিনের জন্য ঢাকায় এসেছেন, কেননা তার রুমমেটরা বেশির ভাগই ছাত্র অথবা চাকরি প্রত্যাশী। তাদের এখন কোন আয় উপার্জন না থাকায় মেস ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। তাই তিনিও তার জিনিসপত্র নিতে এসেছেন।

ভাড়াটিয়া পরিষদর সভাপতি বাহরান সুলতান বাহার আগামী নিউজকে বলেন, গত এক মাসে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংখ্যা সামনে আরো বাড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাইলেই বাড়িভাড়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে।

গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘কোভিড ১৯-এর সময় জীবিকা, ক্ষতি ও সহায়তা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে রেস্তোরাঁর কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ। রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছেন ভাঙারির কর্মীরা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুরের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। শিল্পীসমাজের আয়ও কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানার কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষিশ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ, দোকান, সেলুন, পার্লারের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ। পোশাককর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ। অপর এক জরিপে দেখা যায়, কোভিড ১৯-এর কারণে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে এক সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, করোনা মহামারীর কারণে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ চাকরি হারাতে যাচ্ছে। এদের মধ্যে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতেই চাকরি হারাচ্ছে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ। বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খণ্ডকালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোনো না কোনোভাবে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইএলও বলছে, বিভিন্ন আয়ের মানুষ এর ফলে ক্ষতির শিকার হবে; কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার সময় যত মানুষ চাকরি হারিয়েছে, এই হার তার চেয়েও বেশি।

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী আবাসন ও খাদ্যের পাশাপাশি নির্মাণ, খুচরা বিক্রি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

আগামী নিউজ/আরিফ/জেএফএস

Dr. Neem