Agaminews
Bangla Noboborsho
Dr. Neem Hakim

নামেই লকডাউন, বাস্তবে নেই কার্যকারিতা


আগামী নিউজ | প্রভাত আহমেদ প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২১, ০১:০৪ পিএম

ঢাকাঃ করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে সামাল দিতে সরকার ঘোষিত ‘কড়াকাড়ির’ চতুর্থ দিনেই স্বাভাবিক চেহারায় ফিরেছে রাজধানী ঢাকা। কড়াকড়ির প্রথম দুদিনের দুর্ভোগের পর অফিসগামীদের দাবির মুখে বুধবার থেকে রাজধানীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে চলতে শুরু করেছে গণপরিবহন।

ফলে রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতিও ছিল বহুলাংশেই বেশি। অতিরিক্ত গাড়ির ছাপে কোথাও কোথাও যানজটও লেগে যেতে দেখা গেছে। রাস্তায় জনসমাগম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উধাও হতে শুরু করেছে স্বাস্থ্যবিধিও।

বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় দোকান খুলে দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। রাইড শেয়ার চালু করার দাবিতেও সমাবেশ করেছেন রাইড শেয়ারকারীরা। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ঢাকার বাইরের চিত্র আরো নাজুক। কোনোভাবেই ‘কড়াকাড়ি’কে পাত্তা দিচ্ছেন না মানুষ।

বুধবার কাকডাকা ভোর থেকেই সড়কে অবাধে চলাচল শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন গণপরিবহনের পাশাপাশি প্রাইভেটকার, জিপ, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, ভ্যানগাড়ি ও রিকশা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে তাকে যাত্রীদের চাপ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা মোড়ে মোড়ে সৃষ্টি যানজট।

সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, উন্মুক্ত স্থানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কাঁচাবাজার ছাড়া বন্ধ থাকার কথা সব দোকানপাট ও বিপণিবিতান। কিন্তু তা মানেননি রাজধানীর অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করেই তারা খুলেছেন দোকানপাট। জীবন ও জীবিকার তাগিতে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষেরা। দোকানপাট বন্ধ কিংবা মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি।

রহিম মিয়া থাকেন রাজধানীর পান্থপথ এলাকায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই চাকরিজীবী, জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ছুটে যান উত্তরা। তবে কিছুটা নির্ভার তিনি। কারণ লকডাউনের তৃতীয় দিনে এসে, চলছে বাস। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিটা মাথায় নিয়েও, খরচ কমবে এটা ভেবেই স্বস্তিতে তিনি। তিনি আগামী নিউজকে জানালেন, ‘যতটা পারি সাবধান থাকি। কিন্তু অফিস যেহেতু যেতে হচ্ছে, কিছু তো করার নেই। বাস হলে খরচটা অনেক কমে আসে। সিএনজি নিয়ে তো প্রতিদিন যাওয়া-আসা আমার পক্ষে অসম্ভব।’

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। যদিও এটি লকডাউন কি না, তা নিয়ে সরকার নিজেই দ্বিধাবিভক্ত। সরকারের মন্ত্রীরা লকডাউন বললেও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলছেন বিধিনিষেধ।

পান্থপথ মোড়েই খোলা ছিল কয়েকটি চায়ের দোকান। সেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন বেশ কয়েকজন তরুণ। প্রশ্ন করলে দায়ের দোকানি বলেন, আমার এই দোকানের উপরই নির্ভর করে আমার সংসার। দোকান বন্ধ রাখলে খাব কী? তাই দোকান খোলা রেখেছি। তবে দোকান খোলা রাখায় এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ বাধা দেয়নি।

ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে কথা হয় দিনমজুর পারভেজ আলীর সঙ্গে। তিনি আগামী নিউজকে বলেন, লকডাউনে ঘরে বসে থাকলে পরিবার নিয়ে কী খাব। কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়েছি। আমাদের মতো দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষদের লকডাউনে পড়তে হয় মহাবিপদে। কর্ম আর খাবারের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়েছি।

এক কোম্পানির বিক্রয়কর্মী পারভেজ মিয়া বলেন, ‘গতবছর মানুষের মনে ভয় বেশি ছিল। এবার অনেকটা সহ্য হয়ে গেছে। আগে সরকারের সহযোগিতা পেয়েছিল অনেকে; কিন্তু এবার পাবে তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে বাইরে আসছে।

লকডাউন নিয়ে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘একদিকে বই মেলা খোলা, অন্যদিকে রাস্তায় যানবাহন চলছে। এভাবে হলে নামমাত্র লকডাউন হবে। কাজের কাজ কিছু হবে না।’

লকডাউনের প্রথম দুদিন বাস ছাড়া রাজধানীর চেহারা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু অফিসমুখী মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে তৃতীয় দিনে এসে অনুমতি দেয়া হয় বাস চলাচলের। তাতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের গতিতে লাগাম টানা মুশকিল হিসেবেই দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আগামী নিউজকে বলেন, এখন যে লকডাউন কিংবা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে এর মধ্যে কতগুলো অন্যায্যতার বিষয় রয়েছে। যেমন- গার্মেন্টস খোলা, গণপরিবহন চলছে, শিল্প কলকারখানাগুলো খোলা কিন্তু বিপণিবিতান বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ। আবার দোকানপাট বন্ধ কিন্তু মেলা চলতেছে, খেলা চলতেছে। তার মানে লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞা কার জন্য দেয়া হয়েছে? শুধু কী বিপণিবিতানের জন্য লকডাউন। সরকারি-বেসরকারি অফিস চলতেছে কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানকে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ফলে মানুষকে ক্ষুব্ধ হচ্ছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে কিন্তু মানুষ তা মানতে আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, পুরো বিষয়টার সঙ্গে কিন্তু সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয় নাই। সরকার প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে এবং পরিপত্র জারি করে বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। কিন্তু তা জনগণ মানতে চাচ্ছে না। জনগণকে মানাতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠে নামাতে হবে।

এদিকে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান লকডাউনের তৃতীয় দিনে শপিংমল খুলে দেয়ার দাবিতে বসুন্ধরা-ইস্টার্নপ্লাজার ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন। সোমবার দুপুরের দিকে রাজাধানীর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের সামেন ব্যবসায়ীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে জড়ো হতে থাকেন। কোনো কোনো ব্যবসায়ীর হাতে নিজেদের মার্কেটের মালিক সমিতির ব্যানারও দেখা যায়।

প্রায় শতাধিক ব্যবসায়ী বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে ইস্টার্নপ্লাজার সামনেও একদল ব্যবসায়ী মানববন্ধন করেন।

আগামীনিউজ/প্রভাত