Agaminews
Dr. Neem Hakim

দুনিয়া ও হাকীকত


আগামী নিউজ | এস এ চৌধুরী প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২০, ০৩:৩৪ পিএম
দুনিয়া ও হাকীকত

ছবি সংগৃহীত

একদিন দ্বীনের রাস্তায় ব্যয় করা সম্পর্কে হুজুর বললেন-‘বাবা আমার এমন মুরীদ আছে যারা অজ্রস্র টাকার মালিক, কিন্তু দ্বীনের রাস্তায় ব্যয় করতে তাদের অনেক কষ্ট সবাই কেবল দুনিয়া-দুনিয়া! বলেই হুজুর বিষন্ন হয়ে গেলেন। সালাম দিয়ে ঐ দিনের মত বিদায় হয়ে গেলাম।

১৯৮৯ সালের ২৯ জুন, দুপুরে হুজুরের মেয়ের বাড়িতে আলোচনা প্রসঙ্গে হুজুর বললেন- “দুনিয়ায় পীর,ফকির আর ওলামায়ে কেরাম কই? সব দুনিয়াদার, কোন পীর মাসায়েখ নাই'।

পরিপূর্ণ হালাল রুজি নয় বিধায় আমি পূর্বের পেশা বাদ দিলে হুজুর আমাকে কিছু টাকা দিলেন সৎভাবে ব্যবসা করে হালাল রুজি করার জন্য। আমি হুজুরকে বললাম, বাবা আমাকে এতগুলো টাকা দিলেন যদি ফেরত না আসে। হুজুর বললেন- 'বাবা তাতে আমার লোকসান
নাই। কারণ তুমি যদি হালাল রুজি কর তাতেও আমার সওয়াব আর যদি টাকা না দাও তবে আমার পাপগুলো তুমি নিয়ে গেলে এতেও আমার লাভ। প্রকৃত পক্ষে ইজ এ লায়াবিলিটি অফ এ ম্যান। এটা ক'জন বোঝে?

১৯৮৯ সালের ২৬ নভেম্বর রবিবার। পীর সাহে জামাই’র মৃত্যুবার্ষিকী। কোরআন খতম করা হয়েছে। দোয়া-দরুদের পর আমি এবং ডাক্তার ফজ হুজুরের সাথে একান্তে আলাপ করছি। হুজুরের শীরের ব্যথা।

 ডাক্তার ফজলুল ইসলাম বললেন- এটা মাসকুলার পেইন, ঔষধ খেতে হবে। আমি বললাম- হুজুর আপনার এই বৃদ্ধ বয়সে এতো পরিশ্রম করা ঠিক না। আপনার এখন বিশ্রামের দরকার। হুজুর বললেন- ‘বাবা বিশ্রাম তো কবরে। দুনিয়া বিশ্রামের জায়গা না, কবরে অনেক বিশ্রাম পাওয়া যাবে। দুনিয়া পরিশ্রমের জায়গা, এখানে মৃত্যু পর্যন্ত পরিশ্রমই করতে হবে।

১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, হুজুরের লেখা ‘নামাজ ও অন্যান্য এবাদতে মাইক ব্যবহার’ নামক বইটির নুতন সংস্করণের কাজে হাত দেবার জন্য হুজুরের কাছে গেলাম মোহাম্মদপুরের বাসায়। কাজ-কর্ম কিছুটা সেরে বিদায়ের সময় আমার কাছে থাকা ইকবালের ‘কাব্য সঞ্চয়ন’ নামক বইটি দেখিয়ে হুজুরকে বললাম- বাবা, ইকবালের লেখা বই পড়তে কি অসুবিধা আছে? হুজুর বললেন- “এ বিষয়ে আমার কোন ধারণা নেই। তবে যে বইগুলো প্রয়োজনীয় শুধু তাই পড়া উচিৎ। জীবনের পরিসীমা খুবই কম, এখানে অযথা সময় নষ্ট করে কি লাভ।

আসলে জীবনে যা কিছু করেছি, এখন দেখছি সবই ভুল।এর কোনই মূল্য নেই। আর সব কিছুর একটা এ্যাফেক্ট আছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন- “একটা বিষয় আমার ধারণায় আসে, এটা মোরাকাবা-ই হোক আর কাশফ-ই হোক। সেটা হলো- বাবার বীর্য মায়ের গর্ভে যায়, কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে মায়ের গর্ভে গিয়ে তা পারিপার্শ্বিক থেকে বেড়ে উঠে এবং তিনমাস পর যখন রুহ আসে তখন মায়ের সব বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করতে থাকে। এতে সন্তানের দেহ-মনে মায়ের প্রভাব পড়ে। অনুরূপভাবে দেহ থেকে ও ক্বালবে প্রভাব পড়ে। এখানেই সংস্পর্শের প্রশ্ন তোমার সাথে উঠা-বসায়, কথা-বার্তায় আমার যেমন এ্যাফেক্ট হবে, আমার কথা-বার্তায়ও তেমন তোমার এ্যাফেক্ট হবে।

 আমার পীর সাহেব কেবলা বলেছেন- 'বাবা যত পার ক্বালব খালি কর, তাহলে ক্বালবে জ্যোতি আসবে। ক্বালবে অন্য কিছু আসার স্থান কোথায় । কাজ-কর্ম, কথা-বার্তায়, চিন্তা-চেতনা সব কিছুরই একটা এ্যাফেক্ট কালবে পড়ে।

১৯৯০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোজ শুক্রবার । পীর সাহেব হুজুর, মোর্তজা সাহেব, লুফুল হক সাহেব, হক সাহেব, নাসিরউদ্দিন ভাই, হাসান ভাই আর আমি রওনা হয়েছি কুমিল্লা গোবিন্দপুর দাদা পীর মাওলানা হাতেম আলী বাগদাদী (রঃ) এর মাজার শরীফ জেয়ারত ও বাৎসরিক ইছালে সওয়াবে যোগদানের উদ্দেশ্যে। পথে ময়নামতি
ক্যান্টনমেন্টে লুফুল হক সাহেবের জামাই লে: কর্নেল মাহবুব সাহেবের বাসায় গেলাম, সবাই ওজু সেরে জুমার নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে গোবিন্দপুরে গিয়ে নামাজ পড়ব বলে এই নিয়তে। মাইক্রোবাস বাসার সামনে ভিড়লো,লুফুল হক সাহেব গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। আমরা সবাই বসে থাকলাম বিষাদ চিত্তে । পীর সাহেব কেবলা মোর্তজা সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “বাবা মৃত্যুর সময় এভাবেই একজন আরেকজনকে ছেড়ে চলে যাবে”।

১৯৯০ সালের ২৮ মার্চ, ব্যবসায়ের একটি হিসাব-নিকাশ নিয়ে হুজুরের নিকট গেলাম। মাগরিবের আগেই সব শেষ হলো। হুজুরের মুরীদ এডিশনাল কমিশনার সিরাজুল হক সাহেব এলেন। আমার তাড়া থাকলে আমি যেন চলে যাই, এ কথা ফরজ নামাজ পড়ে হুজুর আমাকে বললেন। কিন্তু সুন্নত নামাজ কয়েক রাকাত পড়ার পর আবার বললেন- 'আখেরী দোয়া করে যাওয়াই ভালো। যা-হোক আমি বসে রইলাম, নামাজ শেষ করার আগে হুজুর বললেন- “মাইন্ড না করলে উনার সামনে তোমাকে কিছু কথা বলবো। বাবা, হিসাব-নিকাশ বড় কথা নয়, এ দিয়ে কোন কাজও হবে না। এসব টাকা-পয়সা হলো দুনিয়ার স্ত্রী-পুত্র, পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্বের কারণে। তবে যতটুকু না হলেই নয় এর অতিরিক্ত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা-পয়সা একটা য়াবিলিটিস,
এটা ইউসলেস” ।

“দ্বিতীয় কথা হলো- খাটি ঈমানদার হতে হলে সুন্নত লেবাসে চলতে হবে। আমার পীর সাহেব বলতেন- বাবা,পোশাকে-আসাকে, চলনে-বলনে সব সময় হুজুর (সাঃ) কে অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া কোন পথ নাই”। তার দাড়ি দেখায়ে বললেন- “দাড়ি লম্বা রাখতে হবে। অন্ততঃ একটি মুঠো করে এরকম। হানাফী মাজহাবের লোকদের জন্য এটাই বিধান। এর কম রাখলে চলবে না। তুমি শাফেয়ী মজছাবের হলে আমি কিছু বলতাম না। আর দাড়ি ছাটলে অনেকে মনে করে তাকে বুঝি খুৰ সুন্দর দেখায়। আসলে আমি নিজে দেখেছি, দাড়ি ছাটলে চেহারা বিশ্রী এবং রোগাগ্রস্ত মনে হয়। আর নিজেরটা নিজে দেখা যায় না। তখন অন্যকে সুন্দর দেখার জন্য তুমি গোনাহর কাজ করবা কেন? আর সুন্নতই নষ্ট করবা কেন?”


প্রসঙ্গক্রমে বললেন- “আমার ছেলে রুমী ছাত্রজীবনে টেডি চোস পায়জামার প্রচলন হলে তা পরতো। আর বাসায় এসে চাকরকে দিয়ে টেনে খুলতো। আমি একদিন বললাম- এত কষ্ট করে চোস পরার দরকার কি? ও বলল ‘সুন্দর দেখায়। সুন্দর কি তুমি দেখ? বলল ‘না’। তবে অন্যকে সুন্দর দেখানোর জন্য তুমি কষ্ট করবে কেন?
তারপর ব্যাপারটা বুঝে আসল তার”।


সবশেষে হুজুর বললেন- “বাবা সুন্নতি লেবাস আমার মত। লম্বা কোর্তা, (মুঠ করে নিজের দাড়ি ধরে দেখালেন)। একমুঠি পরিমাণ লম্বা দাড়ি রাখবা, মাথায় পাগড়ি পরবা। আমি দেখি আমার একটা পাগড়ি তোমাকে দিব। সব কিছুতে ইসলামী আকিদা চাই। অলি-আউলিয়ারা কিছুই সুন্নতের এদিক ওদিক করেন নাই”।

১৯৯০ সালের ১২ জুন, মোহাম্মদপুরের বাসায় আসরের নামাজের সময়, সুন্নত পড়া হয়ে গেছে এমন সময় বাদল এসে বলল শাজাহান নামে একজন লোক এসেছে। হুজর বললেন, ‘বসতে বল। তারপর বাদল না যেতেই আবার ডেকে বললেন, ‘যদি নামাজ না পড়ে থাকে তবে উপরে নিয়ে আস। লোক দুইজনকে বাদল উপরে নিয়ে এললো। সবাই একসাথে আসরের নামাজ পড়লাম। এরপর শাজাহান সাহেবের সাথে আসা লোকটির পরিচয় হল। তিনি অবসরপ্রাপ্ত প্রথম চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। বর্তমানে উকালতি করবেন বলে মনস্থ করেছেন। হুজুর বললেন- “এটা করার আগে যেহেতু আপনার বাবা বেঁচে আছেন তাই তার কাছে অনুমতি নেয়া দরকার।

তারপর বললেন- “বাবা মানুষের এত বেশি সময় নেই, মানুষ দুনিয়ায় এসেছে কিছু ডিউটি নিয়ে, সেটা তাকেই পালন করতে হবে। বাজারে যদি চাকর পাঠান ফর্দ দিয়ে। তবে তাকে ফর্দ অনুযায়ীই জিনিস কিনে আনতে হবে। মানুষ ঠিক এমন কিছু করবার ফর্দ নিয়েই এসেছে, যদি
ঠিক মত ডিউটি না করে মারা যায় তবে আল্লাহর সামনে কিভাবে ফর্দ নিয়ে হাজির হবে? তাই অযথা সময় ব্যয় না করে কোরআন হাদিস পড়েন। পরে জানা গেল,শাজাহান সাহেব হুজুরের সাথে আসরের নামাজ পড়ার নিয়ত করেছিলেন।


১৯৯০ সালের ১২ জুলাই, খানকা শরীকে হতে আলোচনা করলেন সম্পদ, আল্লাহর প্রোগ্রাম, মিমের পর বা আল্লাহ ও আল্লাহর রসুল (সাঃ) সম্পর্কে এবং সর্বশেষ আল্লাহ ও মানুষ সম্পর্কে।

“মানুষ সব সময় সম্পদকে আঁকড়ে ধরে থাকে। আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, অথচ এ সম্পদ মৃত্যুর পর তার কোনই কাজে আসবে না। যা সে ছহিভাবে খরচ করে গেলো তা থেকে সে মুক্তি পেল, যা খরচ করল না তা তার জন্য বোঝা হয়ে থাকল। সম্পদ কিভাবে আয় করা
হয়েছে এবং তা কিভাবে খরচ করা হয়েছে এ সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সম্পদ মানুষের জন্য লায়াবিলিটি বা বোঝা বৈ কিছু নয়।

সংকলনঃ ড. নিম হাকিম

Dr. Neem