Dr. Neem on Daraz
Dr. Neem Hakim

নিজেকে প্রতারক কর্মী মনে হয়, ইপোস্টর সিন্ড্রোমে আক্রান্ত নন তো?


আগামী নিউজ | নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২২, ০১:১৬ এএম
নিজেকে প্রতারক কর্মী মনে হয়, ইপোস্টর সিন্ড্রোমে আক্রান্ত নন তো?

ঢাকাঃ ফারুক কবিরের ( কাল্পনিক চরিত্র ) বয়স ৩৫। আইটি ফার্মের সেলস এক্সিকিউটিভ। কর্মজীবনে তিনি সফল একজন মানুষ। ব্যক্তি জীবনেও তাকে সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা পছন্দ করেন এবং তার সফলতা নিয়ে অন্যদের কাছে উদাহরণ দেন। মাঝেমধ্যে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার কাজের প্রশংসা করেন। সম্প্রতি তার বেতন বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়েছে। তবে ফারুক এসবে খুশি নন। তিনি মনে করেন এই সব প্রশংসা তার প্রাপ্য না অথবা তিনি এসবের যোগ্য নন। তার মাঝে সবসময় একটা অপরাধবোধ কাজ করে। মনে হয় প্রতারণা করছে তিনি। তাই প্রশংসা শুনতে বা ভালো কাজের বিনিময়ে কোনো উপহার গ্রহণ করতে চান না এই ব্যক্তি।

উপরে উল্লেখিত ঘটনায় থাকা ব্যক্তিটি মূলত ইপোস্টর সিন্ড্রোম (আইএস)-এ ভুগছেন। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন তার সমস্ত অর্জন বা বর্তমান সাফল্য ভাগ্য দ্বারা প্রাপ্ত, যোগ্যতার দ্বারা নয়। যারা এ রোগে ভুগছেন, তাদের কাছে মনে হয় তারা যে সফলতা অর্জন করেছেন তার কোনো কিছুই তার যোগ্যতা দ্বারা অর্জন হয়নি। যেকোনো মুহূর্তেই সব অর্জন শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকেন তারা।

যদিও এটি মূলত একজন ব্যক্তির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তবে গবেষকরা আইএস-এর ইতিবাচক দিকগুলোও আবিষ্কার করেছেন। এমআইটি এর এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা আইএস সমস্যায় ভুগছেন তারা কর্মক্ষেত্রে আরও ভালো করে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশ করেছেন। নিজেদের কাজের প্রতি তারা আরও যত্নশীল থাকে এবং অন্যদের থেকেও আরও ভালো করে কাজের নির্দেশনাগুলো শুনে। তথ্য সংগ্রহের কাজেও তাদের দক্ষতা চোখে পড়ার মতন। আইএস একজন কর্মচারীর মানসিকতার স্থায়ী বৈশিষ্ট্য নয়। কর্মক্ষেত্রে লোকেরা তাদের অবস্থানে আরও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরণের উদ্বেগ দূর হতে পারে।

লক্ষণ, উপসর্গ ও উৎস

গবেষণায় দেখা যায়, আইএস আক্রান্ত ব্যক্তিরা মনে করেন তারা অন্যদের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রতারণার করছে, এরা নিজেদের প্রতারক ভাবে। আরও মনে করেন যে অন্যরা তাদের কাজকে অত্যধিক মূল্যায়ন করছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের সাফল্যকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। এমন অবস্থায় নিজেদের সফলতার পিছনে সম্পূর্ণ সৌভাগ্য, সুযোগ, বিশেষাধিকার ইত্যাদির মতো বাহ্যিক কারণগুলিকে দায়ী করা হয়।

এই ভুল বিশ্বাস একটা কাজের জন্য অধিক যোগ্য, পেশাগতভাবে সফল এবং দক্ষ হওয়ার পরও তৈরি হতে পারে। সাধারণত যারা কম আত্মবিশ্বাসী, আধিপত্য করার ক্ষমতা কম অথবা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন এমন ব্যক্তিরা আইএস দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। 

আইএস হলও বেশ কিছু জৈবিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণের বহিঃপ্রকাশ। এটি নির্ণয়ের জন্য গবেষকরা সাইকো-মেট্রিক যন্ত্র তৈরি করেছেন। কিন্তু এগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে আই-এসের লক্ষণ এবং উপসর্গ বিভিন্ন মানুষের মধ্যে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। নিজের কাজ নিয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ প্রকাশ বা আত্ম-সন্দেহের প্রবণতা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এটাকে ইপোস্টর সিন্ড্রোম বলা যেতে পারে। 

অনেকেই এ থেকে নিজেই নিজের কাজে ক্ষতি করে। নিজস্ব বাস্তবতা, অতীত অর্জন এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকেই নিজেদের প্রশ্ন করা শুরু করে।

ইতিবাচক দিক

এই ধরনের ব‍্যক্তিদের আত্ম-অনুমানের বোধ আছে। তারা নিজেদের যুক্তি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেন না এবং নিজের কাজে নমনীয় থাকেন। এমন ব্যক্তিরা সাধারণত অন্যদের কাজকে সম্মান করে এবং নিজে আস্থা ও বিশ্বাস রাখে। নিজের কাজ যে সব সময় সঠিক নয় তারা এতে বিশ্বাস রাখে বলেই অন্যদের কাজ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দল বা সংগঠন পরিচালনা করার জন্য এটি খুবই ভালো দিক। 

মূলত আইএস আক্রান্ত ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রের কার্যকারিতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে না। কারণ এটি প্রায়শই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সফলতা অর্জনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়, যারা নিয়মিত সহজ কাজের চেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজে আগ্রহী। এই ধরনের ব্যক্তিরা সাফল্য এবং ব্যর্থতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত চিত্র পেতে চান। এর জন্য তারা প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা করেন। এমন আচরণ একজন মানুষকে নম্র হতেও সাহায্য করে।

নেতিবাচক দিক

এই সত্যটি ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে আইএস হলও বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসন্দেহপ্রবণ একটি অসুখ। বেশিরভাগ সময় এটি একজন ব্যক্তির উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম। আইএস এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের জন্য অবাস্তব পারফরম্যান্সের মাপকাঠি সেট করে, যার প্রভাব অন্য কর্মীদের উপরও পরে। এরা যেকোনো কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং যদি তারা ব্যর্থ হয় তবে তাতাদের ভয়কে পুনরায় নিশ্চিত করে। 

এই বিষয়গুলো অবশ্যই একটা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কাজের ক্ষতি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় আইএস দ্বারা প্রভাবিত কর্মকর্তারা বিভিন্ন সুযোগ গ্রহণ করে না কারণ তারা তাদের সিদ্ধান্তে আস্থাহীন ও ঝুঁকি নিতে অপ্রস্তুত থাকে। ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্ট অনেক পেশায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু আইএস-এর লোকেরা এটিতে প্রভাব ফেলতে পারে না। যেসব পেশায় কর্মকর্তার স্বমূল্যায়ন একটি কোম্পানির কর্মক্ষমতার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ সেখানে এরা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম। 

এই সমস্যা অনুকূল কর্ম পরিবেশের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠা সম্ভব। একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তামূলক কাজের পরিবেশ, অন্য সব কর্মীর দুর্দান্ত নেতৃত্ব ইপোস্টর সিন্ড্রোম আক্রান্ত ব‍্যক্তিদের সহযোগিতা করতে পারে।  তাছাড়াও ইতিবাচক স্ব কথোপকথনের সাহায্যে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়ও এর সমাধান করা যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিয়মিত তত্ত্বাবধায়নে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি মেলা সম্ভব।

এসএস