Agaminews
Dr. Neem Hakim

বিধ্বস্ত চিংড়ি ঘের বেড়িবাঁধে বিদ্যুৎ সংযোগ


আগামী নিউজ | নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২০, ০৩:৫৮ এএম
বিধ্বস্ত চিংড়ি ঘের বেড়িবাঁধে বিদ্যুৎ সংযোগ

ছবি: বাংলাদেশ প্রতিদিন

অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তান্ডবে শুধু সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি, ভেসে গেছে এসব অঞ্চলের মানুষের ঈদ আনন্দও। সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন তারা শুরু হা-পিত্যেস করে চলেছেন। ঝড়ের তা-বে বিধ্বস্ত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার চিংড়ি ঘের, বেড়িবাঁধসহ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থার। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো বিবরণ-

সাতক্ষীরা : সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তা-বে ভেসে  গেছে উপকূলের ঈদ আনন্দ। প্রিয়জনের নতুন কাপড় উপহার দেওয়া তো দূরের কথা অনেকেই সেমাই চিনি কেনার সাধ্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যে প্রলয়ঙ্ককরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষদের সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কাঁকড়া ও চিংড়িচাষিরা। সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আম্ফানের তা-বে উপকূলীয় উপজেলা কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ মোট ৩টি উপজেলার ছোট বড় ১০ হাজার ২৫৭টি চিংড়ি ও মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। চিংড়ি মাছ, রেণু ও অবকাঠামোসহ মোট ১৭৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর কাঁকড়া প্রজেক্ট ও চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মোট ৪০ লাখ টাকার। এদিকে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী গ্রামের আকরাম হোসেন গতকাল জানান, আম্ফানের তা-বে বাড়ির সামনে চুনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বাড়িঘর পানিতে থই থই করছে। ভেসে গেছে ১০০ বিঘা চিংড়ি ঘের, ও তিনটি মিষ্টি পানির পুকুরসহ ২ হাজার ডিম দেওয়া মুরগির (লেয়ার) খামার। ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের। বাঁধ মেরামত না হওয়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এবারের ঈদ যেন তাদের কাছে মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন। বাড়িতে বৃদ্ধ মাতার অজু করার মতো একটু মিষ্টি পানিও নেই। সেখানে আবার ঈদ। জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঈদ আনন্দ।’ পার্শ¦বর্তী দাঁতিনাখালী গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মুছাগাইন জানান, চুনা নদীর বাঁধ ভেঙে বাড়ির উঠানে পানি উঠে আছে। এই পরিস্থিতিতে তারা ঈদের আনন্দ ভুলে গেছেন। বাড়িতে চাল নেই, ঈদের জন্য এখনো সেমাই চিনিও কিনতে পারেননি। একই এলাকার দিনমজুর ফারুখগাজী জানান, বাঁধ ভেঙে নদীর পানিতে তলিয়ে আছে বাড়িঘর। দুর্গাবাটি ও দাঁতিনাখালী বাঁধ মেরামত না হওয়ায় বাড়ির সঙ্গে নদীর পানির জোয়ার-ভাটা খেলছে। সেখানে এবারের ঈদের বিষয় মনে নেই তাদের।

ভোলা : ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলায় ৪ শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ, মাঠের ফসল, পুকুরের মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে ভোলার সর্ব দক্ষিণ চরফ্যাশন উপজেলার সাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নের অনেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এখন অনেকেই খোলা আকাশের নিচে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। ঢালচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সালাম হাওলাদার জানান, দুর্গম ওই ইউনিয়নে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দুই দিন পরও জেলায় ৮০ ভাগ এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শহর এলাকায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হলেও উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল অন্ধকারে রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঝড়ের তান্ডবে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ২০০ পোল ভেঙে পড়েছে। এতে করে ১ হাজার তার ছিঁড়েছে ও ৭ হাজার মিটার ভেঙে গেছে। পিডিবির ৩০টি পিলার ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়াও তার ছিঁড়ে সঞ্চালন লাইনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বিপাকে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের মানুষ। চার্জ দিতে না পারায় মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। দিনাজপুর : ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কাঁচা ঘরবাড়িসহ বোরো ধান ও আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে পড়েছে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি। এতে করে কিছু কিছু এলাকায় বন্ধ হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ। গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে বৃহস্পতিবার রাত অবধি ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীসহ আশপাশ এলাকায় ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিশুরু হয়। এতে জমিতে থাকা পাকা বোরো ধানের গাছ জমিতে শুয়ে পড়েছে। এতে করে গাছপালা ও কাঁচা ঘরবাড়ি, ঝড়ে উড়ে গেছে অনেকের টিনের চালা, বোরো ধান, আম-লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজার : কক্সবাজারে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই সুপার সাইক্লোন ‘আম্ফান’ পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় সার্বিক ত্রাণ, উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের দিকনির্দেশনায় আগে থেকেই সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন সমগ্র কক্সবাজার ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের ক্যাম্পে ঘূর্ণিঝড় প্রাক ও পরবর্তী সচেতনতা, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ তৎপরতা ও চিকিৎসাসেবা প্রদানে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। বর্তমানে তারা ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বাঁধ পুনঃনির্মাণে স্থানীয়দের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি দুর্যোগ উপদ্রুত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের জন্য রামু সেনানিবাসের ১০টি মেডিকেল টিম গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে একযোগে কাজ করছে, প্রয়োজনীয় রসদ ও ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে দুর্গতদের ঘরে ঘরে। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পরবর্তী সময়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে কক্সবাজারে দুর্গত ও করোনাভাইরাসের কারণে কর্মহীন অসহায় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী এবং কাঁচাবাজারের চাহিদা পূরণ করতে সেনাবাজারের আয়োজন করে প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে ঈদের খুশি ছড়িয়েছেন রামু সেনানিবাসের সেনাসদস্যরা।

আম্ফানে পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০ : কলকাতা প্রতিনিধি জানান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে গত বুধবার রাতে বয়ে যাওয়া প্রবল ঘূর্ণিঘড় আম্ফানের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও অন্তত ৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ডাকে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

এদিন বেলা ১১টা নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে নামেন মোদি। সেখানে তাকে স্বাগত জানান রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, দলের সংসদ সদস্য লকেট চট্টোপাধ্যায়, কেন্দ্রীয় নেতা রাহুল সিনহা প্রমুখ। এরপর বিমানবন্দরেই সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা সাড়েন মোদি-মমতা। পাশাপাশি বিজেপির প্রতিনিধি দলটির সঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে একটি হেলিকপ্টারে করে মমতা ও ধনকারকে সঙ্গে নিয়ে আকাশপথে উত্তর এবং দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলার আম্ফান বিধ্বস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন নরেন্দ্র মোদি। এ সময় অন্য আরেকটি হেলিকপ্টারে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, দেবশ্রী চৌধুরী, ধর্মেন্দ্র প্রধান ও প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গী।

উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলার রাজারহাট-ভাঙর-মিনাখা হাসনাবাদ-সন্দেশখালী-গোসাবা-বাসন্তী-হিঙ্গলগঞ্জ-মথুরাপুর-পাথরপ্রতিমা-কাকদ্বীপ-নামখানা-কুলতলী-ডায়মন্ড হারবার হয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পরিদর্শন করার পর দুপুরে উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার বসিরহাটে একটি প্রশাসনিক বৈঠকে মিলিত হন মোদি ও মমতা। ওই বৈঠকে মূলত ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হয়। 

পশ্চিমবঙ্গ সফর শেষ করে মোদি আকাশপথে উড়িষ্যার ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে আম্ফানের তা-ব চালানোর পর দুই দিন কেটে গেলেও গতকাল কলকাতাসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একাধিক জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তান্ডবের চিহ্ন। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় পড়ে রয়েছে বড় বড় গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, বিজ্ঞাপনের হোডিং। বহু এলাকা এখনো বিদ্যুৎ এবং টেলিযোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে আছে।সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

আগামীনিউজ/বিজয়
 

Dr. Neem