Agaminews
August

রূপগঞ্জে বর্ষায় নৌকা তৈরির ধুম


আগামী নিউজ | নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ (নারায়নগঞ্জ) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২১, ১০:৫৩ এএম
রূপগঞ্জে বর্ষায় নৌকা তৈরির ধুম

ছবি : আগামী নিউজ

নারায়নগঞ্জঃ “সারা বছর কেউ কোনো খবর নেয় না। বর্ষা এলেই নৌকা ও আমাদের মিস্ত্রিদের কদর অনেক বেড়ে যায়। আমাদের আয় রোজগারও বাড়ে। পরিবার পরিজন নিয়ে এ সময়টায় ভালই থাকি। তারপরও বাপ দাদার ঐতিহ্য হিসেবে এ পেশাকে ধরে রেখেছি। বছরের অন্য সময়টা বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালাই। বর্ষা আইছে তো তাই এখন নৌকা ও মিস্ত্রিদের অনেক চাদিহা।” কথাগুলো বলছিলেন নয়ামাটি গ্রামের নৌকা তৈরির কারিগড় আব্দুল হক ভুইয়া।

বর্ষা এসেছে। আসতে শুরু করেছে পানি। ধীরে ধীরে লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে পানি। আর এ বর্ষার পানির সাথে সাথে ভেসে আসছে নতুন পানির মাছ। এ মাছ খাওয়ার মজাই আলাদা। আর এ মাছ ধরার জন্য জেলেদের দরকার বিশেষ ধরনের নৌকা। গরুর খামারীদের ঘাস কাটার জন্যও প্রয়োজন নৌকা। গ্রামের বৌ ঝি রা বেড়াতেও নৌকার প্রয়োজন। এমনকি ঢাকা থেকেও অনেকে আসেন নৌকায় নিরাপদে ভ্রমন করার জন্য। যোগাযোগ ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক না কেন, আসলে বর্ষায় নৌকা ছাড়া চলেই না। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া নৌকার হাটের পরিচিতি রয়েছে আশেপাশের জেলাগুলোতে। ঢাকার নিন্মাঞ্চল থেকেও অনেকে কায়েতপাড়ার নৌকার হাট থেকে তাদের পছন্দমত নৌকা কিনে নিয়ে যান।

স্থানীয় বর্ষীয়ানরা বলেন, নৌকা তৈরি ও বেচাকিনির ধুম পড়েছে কায়েতপাড়ার এ হাটে। শত বছর আগেও এখানে নৌকার হাট বসত। আসলে কায়েতপাড়ায় শনিবার সাপ্তাহিক হাট বসত ব্রিটিশ আমল থেকে। কিছু কাঠমিস্ত্রি বর্ষায় নিজেদের প্রযোজনে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের পিরুলিয়া ও নয়ামাটি গ্রামে নৌকা তৈরি করতেন। তাদের দেখাদেখি অনেকে নৌকা বানিয়ে নিতেন। এভাবে নৌকার চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে মিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি করে কায়েতপাড়ার হাটে নিয়ে আসতেন বিক্রির জন্য। সেই থেকে বাড়তে থাকে পরিচিতি। আজও বহাল আছে। শনিবারে সাপ্তাহিক হাট বসে। আর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত অবধি নৌকার হাট বসে। আগের সেই জৌলুশ না থাকলেও প্রতি বৃহস্পতিবার নৌকার পাশাপাশি মুড়ি মুড়কির দোকানও বসে।

বর্ষায় নৌকায় বসে বানানো চানাচুর আর পিয়াজু আলুর চপ বেগুনি খাওয়ার মজাই আলাদা। মেরাদিয়া থেকে নৌকা কিনতে এসেছেন আবুল খায়ের। তিনি বলেন, আমি এ হাটে আসি ২০ বছর। দু এক বছর পর পরই নৌকা কিনতে হয়। সব সময়ই নৌকা পাওয়া যায় দামও ভাল। তবে বন্যা হলে চাহিদা বেড়ে যায়। তখন দামও বেড়ে যায়। কায়েতপাড়ার হাটেই নৌকা বানাচ্ছেন কারিগররা। কেউ নিজেই পুজি বিনিয়োগ করে নৌকা বানাচ্ছেন আর বিক্রি করছেন। আবার কেউবা অন্যের কাজ করে দিচ্ছেন টাকার বিনিময়ে।

নৌকার হাটে কথা হয় এনাজুল মিস্ত্রির সাথে। তিনি বলেন, কাড়িগড়ের রোজ বেশি। এখন আর আগের মত লাভ হয় না। ৭/৮ টাকা করে রোজ দিতে হয়। কাঠেরও দাম বেড়ে গেছে। সারা বছর তেমন একটা বেচাকিনি না হলেও বর্ষার আগমনে বেচাকিনি ভালই হচ্ছে। দামও ভাল পাচ্ছি।

আরেকজন মিস্ত্রি সত্ত সরকার বলেন, এখন তো কাজের অভাব নাই। অর্ডারী মালও বানাচ্ছি। আবার লোকাল মালও বানিয়ে হাটে বিক্রি করছি। ব্যবসা ভালই চলছে। তিনি আরো বলেন, ৫ হাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের, বিভিন্ন ধরনেসর নৌকা বানাই। খরচপাতি গিয়ে বেশি একটা থাকে না। তারপরও বাপদাদার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য এ কাজে আছি। যে যার পছন্দ মতো দরকারী নৌকা কিনে নিয়ে যায়। কোসা, ডিঙ্গি, নৌকা সবই পাওয়া যায় এখানে।

উপজেলার বাঘবের এলাকা থেকে নৌকা কিনতে এসেছেন নায়েব আলী। তিনি বলেন, এ হাটে সব সময় নৌকা পাওয়া যায়। তাই এ হাট থেকে প্রায়ই নৌকা কিনতে আসি।

ফকির খালী এলাকার আল আমিন মিয়া বলেন, দেশ এত এগিয়ে যাচ্ছে। এত উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ণ আজও তো হল না। নাই কোনো রাস্তা। গ্যাস নাই। বিদ্যুৎ আছে নড়বড়ে। বর্ষায় নৌকা ছাড়া ঘর থেকে বেড় হতেই পারি না আমরা। তাই বর্ষায় নৌকাই আমাদের যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন।

বিল্লাল মাস্টার বলেন, ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট আর কত দিন টিকে থাকে তা ই এখন দেখার বিষয়। চর্তুদিকে যেভাবে বালু ভরাট শুরু হয়েছে তাতে নৌকা চালানোর জায়গাই পাওয়া যাবে না। অথচ সরকার কৃষি জমি জলাশয় ভরাটে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কেউ তো তা মানছে না। নৌকাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারী উদ্যোগ এ মুর্হূতে অতিব জরুরী।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুশরাত জাহান বলেন, ঐতিহ্যবাহী কায়েতপাড়ার হাট ব্রিটিশ আমল থেকেই বসে। এখানে সারা সপ্তাহ মিস্ত্রিরা নৌকা বানায়। প্রতি বৃহস্পতিবার নৌকার হাট বসে। দুরদুরান্ত থেকে অনেক লোকজন আসে। দিনভর বেচাকিনি হয়। এ হাট যাতে সব সময় টিকে থাকে তার জন্য যা করার সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নিব।