Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim
পাবনার

শিল্পীরা ফেরি এবং ইটভাটার কাজ করছেন


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০, ০৩:০৪ পিএম
শিল্পীরা ফেরি এবং ইটভাটার কাজ করছেন

ছবি : সংগৃহীত

পাবনা: তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধ পাবনা। শিল্প সংস্কৃতিতেও বৈচিত্র্যময় এই শহরে লোকসংগীত, লোকগাঁথা, লোকনৃত্য, নকশা, পালাগান ইত্যাদি লোকসংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যময় এই জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, জোড়বাংলা মন্দির, তাঁতীবন্দ জমিদারবাড়ি, লালন শাহ সেতু, ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প, তাঁতশিল্প, চিনিকল, কাগজমিল, তাড়াশ জমিদার ভবন, পাবনায় অবস্থিত উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ডখ্যাত পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আরো আছে কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের বাড়ি। পাবনায় রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

এদের মধ্যে পাহাড়িয়া, মাহাতো, মুণ্ডা, সিং, রাজবংশী, বাগদি, পাহান, রবিদাস, বুনো, ওঁরাও প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নানা জাতি-গোষ্ঠীর সম্মিলনে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এই পাবনা শহরেও করোনা হানা দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য। তারপরও অনলাইনে বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে সংস্কৃতি জগতের মানুষরা।

সূত্র জানায়, পাবনায় রয়েছে প্রায় শতাধিক সংগঠন। যেখানে রয়েছে ২ হাজারের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন। করোনায় ধাক্কায় যাদের জীবন থমকে গেছে। নিরুপায় হয়ে অনেকে বেছে নিয়েছেন মুদি দোকান, তরিতরকারির ব্যবসা, চায়ের দোকানদারি, ইটভাটার শ্রমিকের কাজ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রণোদনা এবং জেলা পরিষদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হলেও তা অপ্রতু। এমন দুর্যোগের মধ্যেও শিল্পী নয়, কিন্তু কোনো কোনো দলীয় লোকও প্রণোদনার প্যাকেট নিচ্ছে অন্যায়ভাবে। অথচ কথা ছিল পেশাদার সংস্কৃতিকর্মীরা পাবে সরকারের প্রণোদনা।

জানতে চাইলে পাবনার ইছামতি থিয়েটারের পরিচালক ভাস্কর চৌধুরী বলেন, পাবনার সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একেবারে স্তিমিত হয়ে গেছে। যারা নৃত্য, সংগীতের শিক্ষকতা করেন তাদের অবস্থা করুণ থেকে করুণতর। অনেককে দেখছি, পেশা বদল করে ফেরি করছে, মুদি দোকানের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করছে, অনেকে

তরকারি বিক্রি করছে। অনেকে চায়ের দোকানও দিয়েছে। অনেকে বিপদের কথা কাউকে লজ্জায় বলতেও পারছে না। অনেকে এর-ওর কাছ থেকে নিয়ে চলছে। সরকারি প্রণোদনা পেয়েছে কেউ কেউ। কিন্তু তা অপ্রতুল। শুনেছি সরকার শিল্পীদের তালিকা করছে। এ তালিকা যাতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই হয়। কারণ সংস্কৃতি চর্চা না থাকলে সমাজের চিত্র বদলে যাবে। কিছু মানুষ আছে তারা চায় না সমাজে সুন্দর পরিবেশ থাকুক। তাদের সেই সুযোগ দেয়া যাবে না।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মো. আবুল কাশেম বলেন, সবকিছু খুললেও এখনো সংস্কৃতিকর্মীরা ঘরবন্দি অবস্থায় আছি। তারপরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমরা কিছু নাটকের প্রোডাকশন নামানোর চেষ্টা করছি। আমাদের নাট্যকর্মীদের মধ্যেও অনেকে প্রবল অর্থসংকটে পড়ে নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু আমরা কারো কাছে হাত পাততে পারি না। বেঁচে থাকার তাগিদে পরিবার চালাতে অনেকে ইটভাটার শ্রমিকগিরিও করছে।

পাবনার সংগীত প্রশিক্ষক ও সংগীত একাডেমির পরিচালক শংকর বিশ্বাস দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে শত শত ছাত্রছাত্রীকে গড়ে তুলছেন। তার সংগীত সাধনা প্রায় চার দশক। তিনি বলেন, সংগীত শেখানোই আমার একমাত্র আয়ের পথ। আমার মতো সংগীত শিক্ষক যারা আছেন তারাই ভুক্তভোগী বেশি। কারণ ৭ মাস ধরে গানের প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই বন্ধ। অনন্যোপায় হয়ে আমি মেয়ের গোছানো সঞ্চয়পত্রের টাকা ভেঙেই চলছি।

করোনাকালীন এই দুর্যোগে সরকার শিল্পীদের করোনাকালীন ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করলে অন্তত কিছুটা হলেও রিলিফ পেত। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এটা সম্ভব।

অবশ্য শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জরী খান শিল্পীদের অনেক আন্তরিকভাবে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কাউকে কাউকে ডেকে অনুষ্ঠানও করাচ্ছেন। তরুণ নৃত্যশিল্পী হাসিম শেখ জন বলেন, আমি শিক্ষকতা করেই পরিবারকে সহায়তা করতাম। কিন্তু করোনা আমার বাঁচার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি নিয়েছিলাম। সেটাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবনের চাকা একেবারেই থমকে গেছে। সম্প্রতি বাবাকেও হারিয়েছি। কোথায়, কার কাছে যাব? কোথাও তো কেউ নেই!

শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার মারুফা মঞ্জরী খান বলেন, পাবনায় সংস্কৃতি জগতের মানুষদের পরিস্থিতি খুব ভালো বলা যাবে না। অবশ্য সব শিল্পীর সম্পূর্ণ সংসার ব্যয়নির্বাহ করাও কঠিন। তারপরও জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১২৫ জনকে প্রণোদনা দিয়েছি। এছাড়া জেলা প্রশাসনও খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকলার পক্ষ থেকে কিছু শিল্পীকে দিয়ে অনুষ্ঠান রেকর্ড করার মধ্য দিয়ে তাদের একটা সম্মানীর ব্যবস্থা করারও চেষ্টা করছি।

আগামীনিউজ/এএইচ