পদ্মা সেতু ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২২, ১২:১৩ পিএম
পদ্মা সেতু ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র

ফাইল ছবি

ঢাকাঃ পর্যটন সম্ভাবনার বড় দুয়ার পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র। র্দীঘ প্রতীক্ষার সেতু উদ্বোধনের পরপরই বেড়েছে পদ্মা পাড়ে দর্শনার্থীর পদচারণা। খরস্রোতা নদীর থই থই জলরাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর রঙের দ্বিতল কাঠামোর এই জাতীয় স্থাপনার প্রতি মানুষের অন্যরকম অনুভূতি ও উচ্ছ্বাসের শেষ নেই।  

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর জেলার জাজিরাসহ দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য জেলার সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক যোগসূত্র স্থাপন হয়েছে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর দুই পাড় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

প্রায় প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক পদ্মার দুই পাড়ে নান্দনিক সৌন্দর্য দেখার জন্য ঘুরতে যায়। মাওয়া ও শরীয়তপুর প্রান্তে রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট, হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানাবিধ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করেছে। পদ্মা সেতুর ল্যান্ডিং পয়েন্ট জাজিরায় তাঁত পল্লী প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান ও খ্যাতনামা দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এসব এলাকায় বিনিয়োগ করছে যা উক্ত অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। ঢাকার সাথে মংলা বন্দর, বরিশাল, কুয়াকাটা, পায়রা বন্দর, খুলনা, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য জেলার অর্থনৈতিক খাতে এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর ভূমিকা নিয়ে এর আগে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, সেতু বাস্তবায়িত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যাবে। আর প্রতি বছর দারিদ্র্য নিরসন হবে শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ।

পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে রাজধানী থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্মৃতিবাহী এবং সমাধিস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ঘুরে আসা যাচ্ছে মাত্র দুই ঘণ্টায়। একইভাবে গোপালগঞ্জ এলাকার মানুষও রাজধানীতে পৌঁছাতে পারছে একই সময়ে। যেখানে আগে সময় লাগতো ৫ থেকে ৭/৮ ঘণ্টা।

স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি গোপালগঞ্জ এমনিতেই তাঁর অনুসারী ও পর্যটকদের কাছে তীর্থ স্থান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু বাড়ি, যেখানে রয়েছে তাঁর বাল্যস্মৃতি। সেখানেই রয়েছে তার সমাধিসৌধ। গড়ে ওঠেছে স্মৃতি কমপ্লেক্স। রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত নিদর্শন নিয়ে স্মৃতি জাদুঘর।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন চরগুলোতে এগ্রো ইকো ট্যুরিজম করে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব। এগ্রো ইকো ট্যুরিজম গ্রামীণ অঞ্চলে অবসর সময়ে কর্মকাণ্ড যা একজন ব্যক্তিকে জমি এবং এর উপরে বসবাসকারী লোকদের বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। এগ্রো ইকো ট্যুরিজম বিশ্বব্যাপী এমনকি ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যে একটি ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয় শিল্পে পরিণত হচ্ছে। এছাড়াও ফিস ফিডিং,পল্লীর জীবন যাত্রা, জেলের পল্লীর জীবন যাত্রা এবং পদ্মায় সুস্বাদু ইলিশ মাছ ধরা দেখা নিয়েও ব্যাপক দেশি ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে তিনটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট রয়েছে তন্মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ ও ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এই দুইটি হেরিটেজ দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত তবে ওই অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পর্যটকদের পছন্দের পর্যটন কেন্দ্র হওয়া স্বত্বেও ভ্রমণে আগ্রহ ছিল কম। পদ্মা সেতুর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণগুলোতে ভ্রমণে আগ্রহ বেড়েছে পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটক আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, ভাসমান পেয়ারা বাজার, ঐতিহাসিক দুর্গা সাগর, কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইন্সটিটিউট, খান জাহান আলী সেতু, খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর, জাতিসংঘ পার্ক, দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের মাজার, রূপসা নদী, শহীদ হাদিস পার্ক, খানজাহান আলী কর্তৃক খননকৃত বড়দীঘি, খুলনা শিপইয়ার্ড, গল্লামারী স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি,বরেণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতানের সমাধি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি, রজকিনি চন্ডিদাসের মাজার, জাহানাবাদ বনবিলাস চিড়িয়াখানা ও শিশুপার্ক, পিঠাভোগ, প্রেম কানন বকুলতলা, মংলা পোর্ট, রাড়ুলী, রেলস্টেশনের কাছে মিস্টার চার্লির কুঠিবাড়ি, সোনাডাঙ্গা সোলার পার্ক ও অন্যান্য পর্যটন আকর্ষণগুলোর চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে  শুরু করেছে।

দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন চরগুলো কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মালদ্বীপের ন্যায় পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করা গেলে প্রচুর পরিমাণ আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব। ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে যে সময় লাগে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় তার চেয়ে অর্ধেক সময়ে পর্যটকেরা কুয়াকাটা ও সুন্দরবন পৌঁছে যাচ্ছে।

পায়রা বন্দরের সাথে বুলেট ট্রেন চালু করার কথা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটাসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে যা দেশি ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রতিবছর পর্যটকবাহী ৪৫টি ক্রুজ ভারতে কুচবিহার-চেন্নাই-গোয়া হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে চলে যায়। তবে এই ক্রুজগুলো যদি পায়রা বন্দরে আকৃষ্ট করা যায় তবে আন্তর্জাতিক পর্যটক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। পদ্মা সেতু গতিশীল করবে মংলা ও পায়রা বন্দরকে যা সুনীল অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখবে।

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল যেমন কুয়াকাটা, মংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর কেন্দ্র করে সমুদ্র পর্যটনের সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। নদীভিত্তিক ও সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনে সময়োপযোগী সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য মাত্রা বাস্তবায়নের পাশাপাশি তৈরি করবে কর্মসংস্থান সুযোগ, শক্তিশালী হবে জাতীয় অর্থনীতি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণের জন্য পদ্মা সেতুর ও দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণগুলো ছোট ছোট প্রমো তৈরি করে ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন।

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, পায়রা বন্দরকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলেছে পদ্মা সেতু এবং মাত্র ৬ ঘণ্টায় উপরের উল্লেখিত পর্যটন আকর্ষণগুলোতে পর্যটকেরা যেতে পারবে। তবে কুয়াকাটা থেকে কটকায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো।

অন্যদিকে কুয়াকাটার গা ঘেঁষে অবস্থিত ফাতরার চর, লাল কাকড়ার চর, শুঁটকি পল্লী, লালদিয়ার চর, চর বিজয়, ফকিরহাট, সোনার চর, ক্র্যাব আইল্যান্ড এসবই কম কিসে? একটি স্পট থেকে আরেকটি স্পট নান্দনিক এছাড়াও রয়েছে ভিন্ন রকম জীব-বৈচিত্র্যর সমারোহ। দারুণ সময় কাটাতে চাইলে এসব পর্যটন স্পটের জুড়ি পাওয়া কঠিন। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত (যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়), ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন সংলগ্ন ছোট ছোট দ্বীপগুলোকে মালদ্বীপের ন্যায় পর্যটন আকর্ষণ তৈরি করা সম্ভব এবং সুন্দরবন ঘিরে ওয়াইল্ড লাইফ ও ইকো ট্যুরিজম উন্নয়নের অনন্য সুযোগ রয়েছে।

এসএস