Dr. Neem
Dr. Neem Hakim
মানি লন্ডারিংয়ের মহোৎসব

ব্লাড ক্লান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ মাল্টিলেভেল ব্যবসা


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২১, ১২:১৬ পিএম
ব্লাড ক্লান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ মাল্টিলেভেল ব্যবসা

প্রতিকি ছবি

ঢাকাঃ স্বল্প পুঁজিতে অল্প সময়ে ধনী হওয়ার লোভনীয় অফার দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানীর প্রতারকরা। বর্তমান সময়ে এই প্রতারকরা ব্লাড ক্যান্সারের মত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের প্রতারণা এখন এ্যানালগ থেকে উঠে এসেছে ডিজিটাল ভার্সনে। ই-কর্মাসের আদলে ওয়েব সাইট তৈরী করে পণ্য বিক্রি, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ও আবাসিক হোটেল সহ বিভিন্ন প্রজেক্টে বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বিগুণ অর্থ ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি সহ নানা কৌশলে তাড়া এই প্রতরণার ফাঁদ পাতছেন।

দুই হাজার সালের ডেসটিনি থেকে হালের এসপিসি ওর্য়াল্ড, ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি, ধামাকা শপিং, কিউকম, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, প্রিয়শপ, ২৪টিকেট ডট কম, গ্রিনবাংলার মত প্রতিষ্ঠানের টার্গেট একটাই-টাকা হাতিয়ে নেয়া। অভিনব পন্থায় তারা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। 

ভিন্ন নামে ডেসটিনি কিংবা এমএলএম এর খোলস পাল্টে প্রতারণা এখন অব্যাহত রেখেছে এই এমএলএম প্রতারকরা। সদস্য হওয়াসহ প্রশিক্ষণের জন্য টাকা নেওয়ার পাশাপাশি অধিক মুনাফার ফাঁদে ফেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত প্রতিষ্ঠান গুলো। ই-কমার্সের আড়ালে ডেসটিনির মতো মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার নামে রাজধানীতে সক্রিয় এ রকম একাধিক প্রতারক চক্র। প্রতারণা ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতরাই ই-কমার্সের নামে এমএলএম কোম্পানি খুলে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিলেই ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্যাকেজের পণ্য। এসব প্যাকেজে আছে গৃহস্থালি পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজ পণ্য এবং হারবালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এসব পণ্যের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। 

এ প্যাকেজ বিক্রি করলেই মিলবে কমিশন। সদস্য ভর্তি করলে কমিশন, আবার তাদের সারিতে ক্রেতা যুক্ত হলেও মিলবে বিশেষ কমিশন। ধাপে ধাপে মিলবে বিভিন্ন পদ ও কমিশন। লোভনীয় অফার দিয়ে অভিনব এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এই এমএলএম প্রতারকরা।  

২০ হাজার বেকার যুবক ও তরুণকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও পণ্য বিক্রির মাধ্যমে টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ডেসটিনি গ্রুপ অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসার মাধ্যমে ২০০০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে মানুষের কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রতারণা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।শত কোটির বেশি টাকা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে ডেসটিনির ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

পরবর্তী সময়ে ডেসটিনির আদলে যুবক, ইউনিপে টু ইউসহ একের পর এক এমএলএম কোম্পানি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ২০০৬ সালে যুবক ২ হাজার ৬০০ কোটি, ২০১১ সালে ইউনিপে টু ইউ ৬ হাজার কোটি আত্মসাত করে উধাও হয়ে যায়। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ডিজিটাল ই-কমার্স পরিচালন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ইভ্যালি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  গ্রাহক, মার্চেন্ট ও অন্যান্য সংস্থার কাছে ইভ্যালির দেনা ৫৪৩ কোট টাকা। ইভ্যালির পর ই-অরেঞ্জ নামে আরেকটি কোম্পানির নাম সামনে আসছে। ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে ভুক্তভোগীরা। এছাড়াও এসপিসি ২২ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। 

তবুও থেমে থাকেনি এই পদ্ধতিতে প্রতারণা। এখন বদলেছে প্রতারণার ধরন। অনেক প্রতারণামূলক স্কিমে অর্থ বিনিয়োগ করে প্রতারনার শিকার  হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। হালের আলোচিত ই-কমার্স ইভ্যালি, ধামাকা, ই-অরেঞ্জ, এসপিসি ওয়ার্ল্ড, নিরাপদডটকমসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে গ্রাহকদের অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগ উঠেছে অর্থপাচারেরও। এছাড়া রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন সমবায় সমিতির নামে দ্বিগুণ মুনাফার কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে উধাও হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৯ সময়ে ২৬৬টি সমবায় সমিতির গ্রাহকদের ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে লকডাউনের সময় মানুষজন ঘরে বন্দি, দোকানপাট বন্ধ এই সুযোগে লোভনীয় অফার দিয়ে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকম, এসপিসি ওয়ার্ল্ড, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, সিরাজগঞ্জ শপ, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ই-কর্মাসের নামে ডেসটিনির আদলে ব্যবসা পরিচালনা করতেছে। ডেসটিনিতে যেমন প্রশাসনের নজর দারি ছিল না তেমনি পরর্বতী সময়ে প্রশাসনের নজর দারি না থাকায় এসব ই-কর্মাস এত কোটি টাকা আত্মসাত করার সুযোগ পেয়েছে। অতিরিক্ত লোভী মার্সেন্ট ও গ্রাহকরা সরকারের কাছ থেকে এসব কোম্পানির বৈধতা যাচাই না করে লেনদেন করায় অনেকাংশে দ্বায়ী। যত ই-কর্মাস হচ্ছে তাদের কর্নধাররা বা কোম্পানির সাথে সংযুক্ত অনেকেই ডেসটিনির সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত বলে জানা যায়।

এমন সব প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে বর্তমানে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকম, এসপিসি ওয়ার্ল্ড, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, দালাল, সিরাজগঞ্জ শপ, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, এসকে ট্রেডার্স, প্রিয়শপ, ২৪টিকেট ডট কম, গ্রিনবাংলা, এক্সিলেন্টবিগবাজার, ফাল্গুনিশপসহ প্রায় ২৬টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক, পুলিশ, র‌্যাব, সিআইডিসহ সরকারের অন্তত নয়টি সংস্থা।

আগামীনিউজ/শরিফ