Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় পূজা মন্ডপ পাহাড়া দিচ্ছে মুসলমানরা


আগামী নিউজ | জিকরুল হক, উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০২১, ০২:২৮ পিএম
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় পূজা মন্ডপ পাহাড়া দিচ্ছে মুসলমানরা

ছবি: আগামী নিউজ

নীলফামারী: জেলার সৈয়দপুরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা মন্ডপে পাহাড়া দিচ্ছে স্থানীয় মুসলমানরা। এটি ঘটেছে শহরের অদুরে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের চান্দিনার মোড় এলাকায়। রাত ১০টা থেকে শুরু করে ভোর চারটা পর্যন্ত পূজা মন্ডপে পাহাড়া দেন এলাকার মুসলমানরা।

কি কারনে পূজা মন্ডপ পাহাড়া দেয়া হচ্ছে তা জানতে কথা হয় ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন, খাতিবুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আছিমুদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে। তারা জানান, পূজা মন্ডপের পাশে প্রতি বছর ১০ মহরম ইমাম হাসান ও হোসাইনের নামে মিলাদ মাহফিল ও তাদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া শেষে বিতরন করা হয় এলাকার দুস্থ পরিবারের মাঝে শিড়নি। ওই স্থানটিকে বলা হয় পাঁচপীরের মাজার। প্রায় দেড় মাসে আগে দোয়া মাহফিলের স্থানটিকে চিহ্নিত করতে স্থানীয় মুসলিমরা মাটি দিয়ে কবর সদৃশ্য করে। পাশে পোতা হয় ইসলামী পতাকা। ওই সব ব্যক্তিরা জানান প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বংশ পরম্পরায় তারা মহরমের ১০তারিখে মাত্র একদিন ইসলামী অনুষ্ঠান করেন। এর পর সারা বছর জায়গাটি পরিত্যক্ত থাকে। কিন্তু কবর সদৃশ্য স্থান চিহ্নিত করায় পূজা মন্ডপের সঙ্গে জড়িত সনাতন ধর্মীরা ওই স্থান থেকে কবর সড়াতে জোর প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এনিয়ে বাড়তে থাকে উত্তেজনা।

মুসলিম সম্প্রদায়ের কথার জবাব জানতে কথা হয় একই এলাকার অধিবাসী শ্রী স্বরবিন্দুশীল, চিত্ত রঞ্জন সরকার, সূশীল চন্দ্র সরকারসহ একাধিক হিন্দু ধর্মাম্বলীর সঙ্গে। তারা জানান, প্রায় ১৫০ ধরে তারা কবর সদৃশ্য এলাকার পাশে দূর্গোৎসব করে আসছে। হঠাৎ করে পূজা মন্ডপের পাশে কবর সদৃশ্য মাজারের উদ্ভব হওয়ায় তাদের ধর্ম পালনে বাধার সৃষ্টি হতে পারে এমন আশংকা বাড়তে থাকে।

এ নিয়ে তারা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেন এবং থানায় এলাকার সাত মুসলমানের নামে জিডি করেন। তবে উভয় সম্প্রদায় বলছে আমরা আতংকে আছি। দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি বিনষ্ট যাতে না ঘটে সেই সুরাহা টানতে মধ্যস্তাকারির ভূমিকায় নামে স্থানীয় ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম ও প্রবীণ ব্যক্তি আবুল হোসেন। এ নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের সাতজন সাতজন করে ১৪ জন, বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী ও তিন ইউপি সদস্য, বিশিষ্টজন আনোয়ার হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষক আব্দুল হাফিজ হাপ্পুকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষের চারজন চারজন করে নিয়ে গঠন করা হয় জুড়িবোর্ড। জুড়িবোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেয় তা বৈঠকে উপস্থাপন করেন বোতলাগাড়ী ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী।

বৈঠকের আয়োজক ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, বৈঠক আমার বাড়িতে অনুষ্ঠিত হলেও জুড়িবোর্ডকে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়েছিলো। বৈঠকের অংশিজনরাও জুড়িবোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বলে অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।

জুড়িবোর্ডের সিদ্ধান্ত মতে, পূজামন্ডপের এলাকা চিহ্নিত করে সীমানা প্রাচীর দেয়ার জন্য পূজামন্ডপ পরিচালনা কমিটিকে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে পূজামন্ডপের প্রাচীর ঘেষে মাত্র সিকি শতক জমি পাঁচপীরের মাজারের নামে ছেড়ে দিতে করা হয় অনুরোধ। ঘোষিত এই সিদ্ধান্ত সেদিন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মেনে নেয়। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের জুড়িবোর্ডের সদস্যদের সিদ্ধান্ত অন্যান্য সনাতন ধর্মাম্বলীরা মেনে না নিয়ে উল্টো পথে হাটা শুরু করে। থানায় সাতজন স্থানীয় মুসলমানের নামে জিডি করেন। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন, পুলিশের ওসি আবুল হাসনাত খান।

সরকারি ওইসব কর্মকর্তারা উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেও সুরাহা করতে পারেননি। এমন অবস্থায় স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা রয়েছে আতংকে। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে। সে জন্য ইসলামের ঝান্ডাবাহী মানুষরা শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পূজামন্ডপ পাহাড়া দিচ্ছে।

পূজামন্ডপ ও পাঁচপীরের মাজারের জায়গা বিষয়ে জানতে কথা হয় স্থানীয় সার্ভেয়ার খাতিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, বিএস রেকর্ড মোতাবেক পূজামন্ডপ ও পাঁচপীরের মাজারটি যে জমির ওপর আছে তা সরকারের খাস সম্পত্তি। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বিএস রেকর্ড সংশোধ করতে ২০১২ সালে আদালতে মামলা করেছিলো। কিন্তু আদালতে মালিকানার স্বপক্ষে উপযুক্ত প্রমান বা কাগজপত্রাদি উপস্থাপনা করতে না পারায় আদালত ২০১৬ সালে মামলাটি খারিজ করে দেন। খাস ভূমি হিসেবে বর্তমানে তা বলবত রয়েছে।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা বাবু রঞ্জন সরকারের সঙ্গে বিরোধীও বিষয় নিয়ে জানতে কথা হয়। তিনি আগামী নিউজকে বলেন, ইউপি সদস্য রবিউল ইসলামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের রায় সন্তোষজনক ছিলো। কিন্তু কেউ তা মানতে চাইছেন না।

এদিকে একাধিক বিশিষ্টজনের মন্তব্যে ও অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে অনুমিত হয়েছে যে এলাকার উভয় সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের মস্তিস্কে উগ্র সম্প্রদায়িক চিন্তা বিরাজ করছে। যার কারণে সামান্য ঘটনা বৃহৎ আকার নিতে যাচ্ছে।

বিশিষ্টজনরা আরো বলেন, ১১ অক্টোবর হতে মন্ডপে পূজা অর্চনা শুরু হবে। মন্ডপ এলাকায় বাড়বে ভীড়। এ সময় কবর সদৃশ্য মাজার চিহ্নিত এলাকায় কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের পায়ের চিহ্ন পড়লে অনাকাঙ্খিত ভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এ জন্য তারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপসহ পূজামন্ডপ ও মাজারের জায়গা পৃথকীকরণের দাবি জানিয়েছেন।

বিরোধ বিষয়ে জানতে কথা হয় সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সাধারণ) আবুল হাসনাত খানের সঙ্গে। তিনি মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি পরে জানাব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন জানান, বিষয়টি সুরাহা করতে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিন বলেন পূজামন্ডপ ও মাজার সদৃশ্য জায়গাটি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। 

আগামী নিউজ/ হাসান