Dr. Neem on Daraz
Dr. Neem Hakim

চা শ্রমিকরা কি সভ্যতার অভিশপ্ত দাস?


আগামী নিউজ | ড. নিম হাকিম প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২২, ০৯:২৯ পিএম
চা শ্রমিকরা কি সভ্যতার অভিশপ্ত দাস?

ঢাকাঃ বাংলাদেশে চা শিল্প বিকাশের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রীস্টপূর্ব সময় থেকে চীনদেশে মূলত চায়ের প্রচলন। ৮০০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে প্রচলন শুরু হলেও  বাংলাদেশে চায়ের প্রচলন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরেই। ১৮৩৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের গঠিত কমিটি বিস্তর গবেষণার পর ঘোষণা দেয় যে, আসামের চা চীনা চায়ের চেয়ে অনেক উন্নতমানের। এ ঘটনা চা শিল্পের জন্য নবদিগন্ত উন্মোচন করে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানের মাধ্যমে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হয়। কিন্ত সমস্যা হলো বাগান করতে প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এত শ্রমিক আসবে কোথা থেকে? এর সমাধান খুঁজতে গিয়ে তৈরি হয় মানবসভ্যতার এক নির্মম ইতিহাস।

আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, বাকুড়া প্রভৃতি অঞ্চল থেকে গরীব চাষীকে চা শ্রমিক হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। ব্রিটিশরা তাদের সামনে প্রচার করেছিল উন্নত জীবনের নানা গল্প, বলেছিল বাগানের গাছ নাড়া দিলেও নাকি পয়সা পড়বে। শুধুই ছলনা দিয়ে নয়, অনেকক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়-ভীতি দেখিয়েও বাধ্য করা হতো তাদের কথা শুনতে।

বর্তমানে চা বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরি ফসল। বিশ্বের প্রায় ২৫ টি দেশে চা রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে। প্রায় ১৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শ্রমে সচল হয় দেশের অর্থনীতি। দেশে সাধারন শ্রমিকের বেতন কমপক্ষে ৫০০ টাকা তখন চা শ্রমিকের মজুরি মাত্র ১২০ টাকা। যদিও তাদের সামান্য পরিমান রেশন ও ওষুধপত্র দেওয়া হয়, সুষ্ঠু চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই।

চা শ্রমিকরা যে মজুরি পান এতে তাদের পুষ্টির নূন্যতম চাহিদাও পূরণ হয় না। কর্মক্ষেত্রে বিশ্রাম, পানীয় জল ও স্বাস্থ্যকর সেনিটেশনের অভাবে শ্রমিকরা আছেন চূড়ান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। চা শ্রমিকদের ৬৪ শতাংশই নারী শ্রমিক। নারী শ্রমিকরা কেউ কেউ মাতৃকালীন সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ দিন ছুটি পেয়ে থাকে। কেউ কেউ এই ছুটিটাও পায়না। এরপরও তারা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে চা বাগানে গিয়ে নিজেদের পড়নের শাড়ি দিয়ে দোলনা বানিয়ে বাচ্চাগুলো রাখে, সেখানে পাশাপাশি কুকুরও ঘুমায়। আরো সমস্যা হলো এই চা বাগানগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অনেকসময় নিষিদ্ধ কীটনাশকও ব্যবহার করা হয় যা মানবদেহে ক্যান্সার হতে  পারে। বাতাসে এসব কীটনাশক বাচ্চাদের শরীরে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের সর্দি-কাশি ও  চুলকানিসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয় বাচ্চারা। গর্ববতী মহিলাদেরও এসব কীটনাশক নিঃশ্বাসের সাথে যায় এবং পেটের বাচ্চার ক্ষতি হয়। তাছাড়া সাপ, জোঁক এবং নানান রকম ঝুঁকির মধ্যে তারা এসমস্ত কাজ করে থাকে। এরপরেও তাদের বেতন ১২০ টাকা যা একটা চরম নির্যাতনের সামিল।

অনেক জায়গায় শোনা যায় মালিকরা বাল্য বিবাহে তাদেরকে উৎসাহ করে। কেননা অল্প বয়সে বিয়ে হলে তারাতাড়ি বাচ্চা হবে, একটা শ্রমিক পাবে তারা। এ থেকে বলা যায় শ্রমিক বাড়াতে মালিকরা বাল্যবিবাহ প্রমোট করে। এর প্রধান কারণ সমতল ভূমির কেউ এতো কম বেতনে কাজ করতে চায় না এবং সবাই এই চায়ের পাতা কিভাবে সংগ্রহ করে সেটা জানে না।

এছাড়াও চা বাগানে অনেক ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের মতোও ঘটনা ঘটে যা তারা নিরবে সহ্য করে যায় এবং এটা প্রকাশও করে না। সব কিছু মিলে দেখা গেছে বার বার তারা আন্দোলনে যায় অনেকসময়  ইউনিয়নের নেতারা বড় অংকের টাকা পয়সা নিয়ে মালিকদের সাথে সমঝোতা করে তাদের আন্দোলন নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এবার এই শ্রমিকরা শপথ করেছে ইউনিয়নেও যদি তাদের বিপক্ষে যায় তারা এই ধর্মঘট থেকে সরে যাবে না।

বছরের পর বছর অবহেলা ও অপমানের বোঝা বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীকে সভ্যতার আলো থেকেই বঞ্চিত করেনি, নিজেকে মানুষ ভাবার অধিকার থেকেও যেন বঞ্চিত করেছে। তাদের এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ শিক্ষার অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা।

গত দেড়শ’ বছরে অনেক কিছু পাল্টালেও, চা শ্রমিকদের এ দাসত্বের জীবন পাল্টায়নি। তারা আজও অধিকার বঞ্চিত। আজো সমাজ-সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন। চা শ্রমিকদের এই দীর্ঘ পথচলা মূলত বঞ্চনা, শোষণ আর অপমানের ইতিহাস। ক্রমে তাদের নিঃশেষ হবার ইতিহাস। সভ্যতার এ নির্মমতার অধ্যায় আর কতকাল চলবে তার উত্তর মেলা ভার। তাদের সকল স্বপ্ন কেড়ে নিয়ে তৈরি হয় মালিকের মুনাফার পাহাড়।

চা পছন্দ করে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। তবে চা পছন্দ করেন এমন মানুষের সংখ্যা বেশি সেটা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। সারা পৃথিবীতে চা কে এক নামে ‘চা’ হিসেবেই চিনে।

এই চায়ে আছে শ্রমিকদের রক্ত ও ঘাম। অথচ চা বাগানের বাংলোগুলো এতো দামি যে, একটি চা বাগানে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ব্যবহৃত খাট ও গাড়ির চেচিসসহ ব্রিটিশ আমলে চা বাগানে ব্যবহৃত প্রায় শতাধিক আসবাব পত্র সংরক্ষিত আছে। এসব স্মৃতি বহন করছে পাকিস্তান ও ব্রিটিশের। অতএব চা বাগান শ্রমিকদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। আর্ন্তজাতিক এতো মানবাধিকার সংস্থা, শ্রম অধিকার সংস্থা কিন্তু কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না।

৮ ঘন্টা কাজ করে সাপের কামর, জোঁকে রক্ত খাওয়া, ক্ষতিকর কীট নাশকের প্রভাব সব কিছু সহ্য করে বেতন মাত্র ১২০ টাকা ! ওদের ঘাম আর রক্তের মুল্য কি এতই কম!! ওরা বড় বাবুদের(বাগানের ম্যানেজার) পায়ের জুতাও খুলে দেয়!!! বড় বাবুরা হাফ প্যান্ট পরে হাতে লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখলে মনে হয় ব্রিটিশ বেনিয়ারা এখনও আছে এদেশে। মেহনতি মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নতো এটা ছিল না!! 

এসএস