Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

মে দিবস-২০২১: শ্রমিকের কাজ ও সামাজিক নিরাপত্তার সংগ্রাম


আগামী নিউজ | প্রফেসর ড. এম এম আকাশ প্রকাশিত: মে ৩, ২০২১, ১২:০১ পিএম
মে দিবস-২০২১: শ্রমিকের কাজ ও সামাজিক নিরাপত্তার সংগ্রাম

ঢাকাঃ গত ১মে ছিলো মহান মে দিবস। প্রতি বছর ১লা মে তারিখে সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই দিবসটি পালন করে থাকেন। পৃথিবীর প্রতিটি বড় শহরে হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ শ্রমিক লাল পতাকা হাতে রাজপথে মিছিলে সামিল হন। এবারো তাই হওয়ার কথা ছিল। তবে বিশ্বব্যাপী অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চলছে করোনা মহামারী। এই মুহূর্তে ভারতের কোথাও কোথাও তা খুবই ভয়াবহ। যদিও মনে হচ্ছে চীনে-ভিয়েতনামে-কেরালায় তা এখন খুবই কম বা প্রায় নাই। কিন্তু আবার বাংলাদেশসহ অনেক দেশই এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। যে কোনো সময় করোনা ছোবল মারতে পারে বিপুল বেগে। 

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এখনও চলছে করোনাজনিত মন্দা কাটানোর প্রচেষ্টা। জীবন না জীবিকা এই দ্বন্দ্বে পৃথিবী অস্থীর। আমাদের দেশে চলছে এক অসম বিকাশ। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কম। রেমিট্যান্স আকস্মিকভাবে বেশ বেড়ে গেছে! রপ্তানি-আমদানি তথা বৈদেশিক বাণিজ্য ততটা বেহাল হয়নি। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প কল-কারখানা (পোষাক শিল্প ছাড়া), দোকানপাট, পরিবহন ইত্যাদি সবই সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। ফলে নতুন করে অনেক লোকজনের কাজ নাই, আয় কমে গেছে, ভোগও কমে গেছে, ধার কর্জ করে, গ্রামে চলে গিয়ে, সম্পদ বিক্রী করে সংকটাপন্নরা কোনোমতে টিকে আছেন। দেশে নতুন দরিদ্র-পুরানো দরিদ্র মিলে ৪০ শতাংশ হয়ে গেছে বলে দাবি করছেন অনেকেই। প্রায় সর্বত্রই মহামারীর প্রথম আঘাতটা গিয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রমিক শ্রেণির উপর। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে চাকুরি হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা। কাজ না থাকলে মজুরী বা বেতন পাচ্ছেন না শ্রমজীবিরা। বাংলাদেশের ৮৫% শ্রমিক কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। সেখানে শ্রমিকের জন্য কোনো লিখিত কন্ট্রাক্ট নেই, মালিকের রয়েছে যে কোনো সময় ‘হায়ার এন্ড ফায়ার রাইট’। নিম্নতম মজুরি এসব খাতে নাই--পোশাক শিল্প খাতে সেরকম একটা জিনিষ থাকলেও তা পৃথিবীতে নিম্নতম– মাসিক মাত্র ৯৫ ডলার বা ৮০০০ টাকা মাত্র। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রম আইনের বাতাবরণও নেই– নেই কোনো চাকুরির নিরাপত্তা, নেই ছুটি, নেই নির্ধারিত শ্রমঘণ্টা, নেই বোনাস, নেই উৎসব ভাতা, নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার। আনুষ্ঠানিক খাতে এসব আইন কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেখা থাকলেও সেখানে শ্রমিকদের সীমিত সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং অন্যদিকে মালিক, আদালত ও শিল্প পুলিশের বিশাল ঐক্যবদ্ধ শক্তির কারণে এই সংকটকালে সেসব আইন অনেকটাই ‘কাজীর গরুতে’ পরিণত হয়েছে, অর্থাৎ কিতাবে আছে, কিন্তু গোয়ালে নেই। শুধু আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না তা নয়, সম্প্রতি বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের গুলি করে হত্যাও করা হয়েছে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চল বাঁশখালীতে। 

তাই এবারের মে দিবসের আনন্দ শ্রমিকদের জন্য অনেকখানি আশংকায় ভরপুর। শ্রমিকরা জানেন এখন সংকটের সময়, মালিকেরা হয়তো শিগগিরই ছাঁটাইয়ের অভিযানে নামবেন। শুরু হবে টিকে থাকার শ্রেণিযুদ্ধ। তাই সংগঠন ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সমর্থন ছাড়া তাদের পক্ষে আত্মরক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। মে দিবসের যে প্রধান শ্লোগান ছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা ঘুম, সেই আদি এবং অকৃত্রিম দাবি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই এখনো প্রধান অনাদায়ী সংগ্রাম। বিশেষভাবে তা সত্য বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য– গ্রামীণ মৌসুমী কৃষি মজুর, রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়লা, মাটি কাটা মজুর, গৃহকর্মী, নির্মাণ কাজে নিয়োজিত অদক্ষ শ্রমিক, হোটেল রেঁস্তোরায় নিযুক্ত শ্রমিক, টুকটাক এদিক-ওদিক করে দিন এনে দিন খায় যারা, এস.এম.ই.-তে নিয়োজিত নারী ও শিশু শ্রমিকরা, এরাই এখনো আমাদের সবচেয়ে বড় অসংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি। এঁরা এখনো ৮ ঘণ্টা কাজ-, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন না। করোনা এখন তাদেরকে আরো নীচে ঠেলে দিয়েছে। 

তাই আজকের মে দিবসে শ্রমিক শ্রেণির শ্লোগানে কারখানা ও সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদের বিপ্লবী শ্লোগানই প্রধান শ্লোগান হয়ে হয়ত অনেক জায়গাতেই আসছে না। তাই বলে যেটুকু রাষ্ট্রায়ত্ত খাত আছে তা লুটপাটের মাধ্যমে অলাভজনক বানিয়ে ব্যাক্তির হাতে সেগুলি তুলে দিয়ে তারপরে দ্বিতীয়বার লুটের ব্যবস্থা কোনো সমাধান নয়। একথা আজ প্রমাণিত যে ব্যবস্থাপনা যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাসম্পন্ন হয় এবং প্রযুক্তির যদি প্রতিযোগিতাক্ষম উৎপাদনশীলতা থাকে তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও চিনিকলের সমস্যার সমাধান ব্যক্তিগতকরণ নয়। তাতে বরং কারখানাগুলো আরেক দফা লুট হবে- স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বরং সমাধান হচ্ছে নতুন মেশিনারীতে বিনিয়োগ ও দুর্নীতিহীন ব্যবস্থাপনা। 

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাত রক্ষার পাশাপাশি এবার মে দিবসে প্রধান শ্লোগান হয়ে আসছে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে গণতান্ত্রিক দাবি দাওয়ার শ্লোগান। তাই মে দিবসে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের অনেক জায়গাতেই শ্রমিকরা লড়ছেন শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের মধ্যে বৈষম্য হ্রাসের জন্য এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রসারিত করে সামাজিক নিরাপত্তার গ্যরান্টি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের সামনে আশু দাবিগুলো হচ্ছে- 

ক) ৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজের মাত্রা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে এই যে আইন আছে তা বাস্তবায়িত করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেও একে কার্যকরী করতে হবে। 

খ)শ্রমিক হিসাবে একটি স্থায়ী চাকুরীর গ্যারান্টি ও নিয়োগপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক -অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় খাতকেই তার আওতায় আনতে হবে। 

গ) একটি মানসম্মত মজুরির (Decent Wage) ব্যবস্থা করতে হবে। 

ঘ)যোগ্যতা অনুযায়ি মজুরীর পাশাপাশি একটি ন্যূনতম মানসম্মত মানবিক মজুরীর আইনগত বাধ্য-বাধকতার ব্যবস্থা করতে হবে এর চেয়ে নীচে মজুরী কোনো মজুরকেই দেয়া যাবে না। এর সুনির্দিষ্ট মাত্রাটি শ্রমের খাতওয়ারী উৎপাদনশীলতা অনুযায়ি যদি দেয়া অসম্ভব হয় তাহলে সরকারকে তা সেই ব্যক্তির জন্য পুরণ করে দিতে হবে অথবা ঐ উদ্যোগটি আরো সক্ষম ও আধুনিক করে তুলতে হবে যাতে সকল শ্রমিকের জন্য একটি প্রাথমিক সার্বজনীন ন্যূনতম আয় (Universal minimum income- যেটা বেকার ভাতার চেয়ে কম হবে না) নিশ্চিত হয়। ধীরে ধীরে সেই নির্ধারিত জাতীয় ন্যূনতম আয়ের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র বা/এবং সকল পুঁজিপতিদের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

ঙ)নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য রাখা চলবে না। একই কাজের জন্য একই মজুরি দিতে হবে। 

চ) অসুখ হলে চিকিৎসার সুযোগ থাকতে হবে। রাষ্ট্র বা মালিককে এই দায়িত্ব বহন করতে হবে। মহিলাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

ছ) সন্তানের শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। সেটা রাষ্ট্রই দিক্ বা মালিকই দিক্ কাউকে না কাউকে দিতে হবে। 

জ) বাসস্থানের, বিদ্যুতের, পয়ঃনিস্কাশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। 

ঝ) বেকার হলে পরবর্তী কাজ না পাওয়া পর্যন্ত ন্যূনতম বেকার ভাতা দিতে হবে। 

ঞ) সর্বোপরি শ্রমিকরা লড়ছেন তাদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগের জন্য এবং কারখানার ভাল-মন্দ পরিচালনার ব্যবস্থায় তাদের কণ্ঠস্বর (Voice) ও অংশিদারিত্বের জন্য । 

সে জন্য কারখানার ভাল-মন্দের সঙ্গে শ্রমিকদের ভাল-মন্দের একটি যোগ থাকতে হবে। এটা সম্ভব যদি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব ও উভয়ের জবাবদিহীতা ধাপে ধাপে নিশ্চিত করা যায়। এই দাবিগুলোই আজ সারা দুনিয়ায় শ্রমিকরা উঠাচ্ছেন। কিন্তু এর বেশিরভাগ দাবিই যখন অপূর্ণ থেকে যায়- তখনই বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা পথে নামেন এবং কখনো কখনো গণতান্ত্রিক দ্বন্দ্বটি সংঘাতময় বৈপ্লবিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়ে যায়। 

বর্তমান পটভূমিতে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে দুটি ধারার সৃষ্টি হয়েছে। একটি ধারা ‘সামাজিক অধিকার ও মালিকানার’ প্রশ্নটি উহ্য রেখে শ্রমিক শ্রেণির আর্থ-সামাজিক ইতিবাচক সংস্কারের জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। বিশেষত অনুন্নত দেশগুলি যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিই এখনো অর্জিত হয়নি সেখানে এই আশু সংস্কারের দাবি ও সংগ্রামই প্রধান ও প্রাথমিক সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। 

অন্যদিকে বিপ্লবী ধারায় বিশ্বাসী ট্রেড ইউনিয়নগুলিও এই আশু গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়ার লড়াইকে বাদ দিয়ে এক লাফে বিপ্লব করা যে সম্ভব নয় তা ক্রমশঃ বুঝতে পারছেন। এই গণতান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক সংগ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যেদিয়েই শ্রমিক শ্রেণিকে আগে যেতে হবে এবং এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে বিপ্লবের উচ্চতর পরীক্ষায় শ্রমিক শ্রেণি নাম লেখাতে পারবে না- এটাই হচ্ছে এধরনের বিপ্লবী ধারার অ-হঠকারী বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করতে সক্ষম অংশটির বক্তব্য বা বুঝ। সংস্কার আর সংস্কারবাদ একজিনিস নয়। বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদী সংস্কারের জন্য লড়াই এর অর্থ নিশ্চয়ই বিপ্লবের স্বপ্ন বিসর্জন দেয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে ‘আকাশচারী স্বপ্ন’ না দেখে মাটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা। বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে ক্রমশঃ সেই ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ হওয়া বা ম্যাচিওরিটি’ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দুটাকে মেলাতে সক্ষম এরকম শ্রমিক আন্দেলন ও শ্রমিক নেতৃত্বের জন্য মে দিবসে আমরা পথ চেয়ে আছি।

লেখকঃ চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়