Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

ফিরে দেখা রাজশাহী কলেজ দাঙ্গা ও উত্তরবঙ্গের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বরূপ


আগামী নিউজ | রিফাত করিম প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২০, ০৪:১৪ পিএম
ফিরে দেখা রাজশাহী কলেজ দাঙ্গা ও উত্তরবঙ্গের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বরূপ

রাজশাহী কলেজ

১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে। কলেজটি প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এ সকল  গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে দুবলহাটির জমিদার হরনাথ রায় চৌধুরী, দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়, রাজা প্রমোদ রায় ও বসন্ত রায়, পুঠিয়ার রাণী শরৎসুন্দরী দেবী ও হেমন্ত কুমারী দেবী প্রমুখ।  

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই রাজশাহী কলেজ জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে বিশেষ করে হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু, এই অসাম্প্রদায়িক মেল বন্ধন শাসকগোষ্ঠীর কাছে হয়ে উঠে চক্ষুশূল। যার ফলশ্রুতিতে কলেজ হোস্টেল এর আসন বরাদ্ধের সমস্যা তৈরি করে। তাকে কেন্দ্র করেই ১৯৩৭ সালে রাজশাহী কলেজ সাময়িক বন্ধ ঘোষনা করে তৎকালীন সরকার। ঘটনার সূত্রপাত হয় হিন্দু ছাত্রদের জন্য বরাদ্ধকৃত ৫টি হোস্টেলের মধ্যে ১টি মুসলিম ছাত্রদের দেওয়া নিয়ে। যদিও তাদের (মুসলিম ছাত্রদের) বসবাসের জন্য আগে থেকেই হোস্টেল ছিল। তৎকালীন সরকারের এই সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতে আগত যেকোন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হিন্দু ছাত্রদের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা হতে থাকে এমনকি ভয়ভীতি প্রদর্শনার্থে সরকার  প্রলুব্ধ জনতা হিন্দু ছাত্রাবাস ঘেরাও করে।

সূত্রঃ প্রবাসী পত্রিকা

ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ঘটনায় ছাত্রদের কিংবা অধ্যক্ষের কোন হাত ছিল না, বরং শাসকগোষ্ঠীর আদেশে হুকুম জারী হয়। এছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকান্ডও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

শের - এ- বাংলা ফজলুল হক (মাঝে)

উল্লেখ্য, যে ঘটনাটি  খুব সহজে মীমাংসা করা যেত, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী এই ঘটনাকে আরো জটিল  করে তুলেন। এছাড়াও, কংগ্রেস এর নেতৃবৃন্দের নিশ্চুপ ভুমিকাও সন্দেহের উদ্রেক তৈরি করে। সরকারিভাবে কলেজ বন্ধের হুকুম জারী হবার পূর্বেই শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ হতে মুসলিম ছাত্রদের টেলিগ্রাম করা হয়  অভয় দেবার করার জন্যে। শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক সাহেবের এই রকম পক্ষপাতমূলক আচরণ সত্যি লজ্জার ছিল। শিক্ষামন্ত্রীর মূলমন্ত্র হবার কথা ছিল অসম্প্রদায়িকতা, অথচ তিনি তা না করে সাম্প্রদায়িকতার নীতি গ্রহণ করেন। কলেজ বন্ধ করার হুকুম দিতে একবারও ভেবে দেখেন নি তিনি। সব থেকে ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি হয় যখন শিক্ষামন্ত্রী জনরোষের মুখে পরে এই বিবাদ মীমাংসার এবং তদন্তের দায়িত্ব দেন শ্রী শরৎ চন্দ্র বসু এবং ডক্টর প্রমথনাথ বন্দোপাধ্যয়-কে। কিন্তু সাথে এর শর্ত জুড়ে দেন যে তা মুসলিম ছাত্রদের পছন্দ হওয়া চাই। তিনি হয়ত মনে করতে পারেন, এই আপোষ-মীমাংসা হয়ত মুসলিম ছাত্র সম্প্রদায়ের দাবি রক্ষার পক্ষে অনুকুল ছিল না। এই রকম হঠকারিতা স্বাভাবিক ভাবেই একজন মানুষের সম্পর্কে সন্দেহজনক। শিক্ষামন্ত্রী এ.কে.ফজলুল হকও তার বাইরে নন।

সূত্রঃ প্রবাসী পত্রিকা

উল্লেখ্য, সে সময় আইন পরিষদে মুসলিম লীগ এর রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের পাশাপাশি কংগ্রেস এর রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ সমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতেন। সে হিসাবে তাদের বক্তব্য গ্রহণীয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শরৎ চন্দ্র বসু এবং  ডক্টর  প্রমথনাথ বন্দোপাধ্যয় প্রমুখ ব্যাক্তি শুধু মান-সম্মান বাঁচানোর তাগিদ হতে রাজশাহী যাওয়া থেকে বিরত ছিলেন সে সময়।

সূত্রঃ অমৃতবাজার পত্রিকা

কলেজ বন্ধের এ রকম হুকুমের বিরোধিতা করে কোন বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি তারা। তার থেকেও সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় যাদের হাতে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত তারাও নিশ্চুপ ছিলেন এই ব্যাপারে। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে তখনি, যখন শিক্ষামন্ত্রী সাম্প্রদায়িক রূপ ঢাকতে কলেজ হোস্টেলকে আক্ষরিক নামে বিভক্ত করার চেষ্টা করেন। বস্তুত, শিক্ষামন্ত্রীর এই রকম বাসস্থান বন্টন তৎকালীন মুসলিম এবং হিন্দু ছাত্রদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা অধিকতর শোচনীয় আকার ধারন করে।

সূত্রঃ অমৃতবাজার পত্রিকা

" কোন হোস্টেল-ভুবনে কারো একচেটিয়া অধিকার নাই" এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত শিক্ষামন্ত্রী দূর্নীতির আশ্রয় নিলেন এই মর্মে, কলেজ এর ভাল বাসস্থান থাকবার অধিকারের সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে। এ রকম আসন  বরাদ্ধ করার মধ্যে দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আপামর সাধারণ ছাত্রদের কাছে দেয়া কথা ভঙ্গ করেন। পররর্তীতে এই কর্মকান্ড ছাত্রদের মাঝে ঘৃনার সৃষ্টি করে এবং একজন শিক্ষামন্ত্রীর দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ছাত্রদের কাছে যে নিরপেক্ষতার চিত্র ফুটে উঠেছিল তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই বন্টনের মীমাংসা না করে হক-প্রমুখ মন্ত্রীসভা কলেজের স্থায়ী শিক্ষকদের অন্যত্র বদলি করার সিদ্ধান্ত নেন। অস্থায়ী শিক্ষকদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং অবশিষ্ট  শিক্ষকদের রাখা হয় কলেজ খোলার জন্য। এছাড়াও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের উপর হুকুম জারী হয়েছিল যে, তারা যেন অন্যত্র ভর্তি হন। কিন্তু, পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ছাত্রদের অন্য কলেজে ভর্তির জন্য প্রযোজ্য সার্টিফিকেট প্রদান নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়।

সূত্রঃ অমৃতবাজার পত্রিকা

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় যে পরবর্তীতে কলেজ খোলা হলেও হিন্দু ছাত্ররা কলেজ হোস্টেলে  যায় নি এবং সরকারি সিদ্ধান্তকে তারা মেনে না নেওয়ার এক প্রকার অসহযোগিতা মূলক কার্যক্রম পালন করতে শুরু করে। অনেকে অনশন-ধর্মঘট পালন করে। এরই অংশ হিসাবে তারা কলেজ হোস্টেল ত্যাগ করে শ্রীযুক্ত কিশোরী মোহন চৌধুরি মহাশয়ের ভাড়া করা বাড়িতে বসবাস শুরু করে।

সূত্রঃ প্রবাসী পত্রিকা

এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করে সংবাদ প্রকাশিত হয় অমৃতবাজার এবং সাপ্তাহিক প্রবাসীতে। সেসব সংবাদপত্র দুটি শিক্ষামন্ত্রীর এই রকম ন্যাক্কারজনক কাজকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে তার এই কাজ কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেসব পত্রিকা থেকে জানতে পারা যায়, শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টরেরা বিভাগীয় তদন্ত করতে গিয়েছিলেন। এতে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়- যে কেন তদন্ত কমিটিতে সরকারি-বেসরকারি গণ্য-মান্য ব্যাক্তিদের রাখা হয় নি, এই মর্মে। এছাড়াও পত্রিকাটিতে  তদন্তের সময়ক্ষেপণ নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলা হয়েছিল যে, তদন্ত প্রথমে কেন করা হল না। তারা এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট তদন্তকে হটকারীতা বলে চিহ্নিত করে। তাদের সংবাদের  ভাষ্যমতে তারা  এই ঘটনাটি উভয় সম্প্রদায়ের মেলামেশা জনিত সমস্যা বলতে নারাজ। এই সমস্যাকে তারা চিহ্নিত  করে ধর্মীয় আচার এবং খাদ্য জনিত সমস্যা  হিসাবে। সংবাদের যুক্তিযুক্ততা হিসাবে তুলে ধরা হইয়েছিল- উভয় সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্মাচার এবং খাদ্য প্রণালীতে পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে, সে কারনে তাদের আলাদা বাসস্থানে রাখাই উত্তম। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে, হিন্দু ছাত্ররা তাদের মধ্যে মুসলিম ছাত্রদের স্থান না দেওয়াকে যুক্তিসংগত বলে সংবাদটিতে উল্লেখ করা হয়। পত্রিকাটি আরো চিহ্নিত করে যে, যদি কলেজটি সরকারি আদেশে একেবারে বন্ধ করা হয় তবে দাতারা কি এই ব্যাপারে ভারত সচিবের নিকট নালিশ করতে সম্মত হবেন কিনা বা অধিকারি হবেন কিনা।

সূত্রঃ অমৃতবাজার পত্রিকা

রাজশাহী কলেজ বন্ধের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে পত্র-পত্রিকা গুলো হতে এই প্রস্তাবনা পাওয়া গিয়েছিল- যারা অদূর ভবিষ্যতে কলেজ উন্নয়নের জন্য সরকারকে বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালকে দান করবেন তারা যেন নিজেদের অধিকার এবং ক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হন এবং কলেজ সংক্রান্ত যেকোন অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো ভুমিকা রাখতে পারেন।

সূত্রঃ অমৃতবাজার পত্রিকা

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সর্বশেষ বলা হয়েছিল, যেহেতু সমাজের একটি অগ্রবর্তী অংশ কলেজটি তৈরিতে এবং মান উন্নয়নে অগ্রণী ভুমিকা রাখে, এবং কলেজের কলেবর দিন দিন বাড়ছিল। এছাড়াও সামগ্রিক বিষয়কে ধর্তব্য মনে করে দেখানো হয়েছে যে, হিন্দু ছাত্রাবাস ৫টি ব্লকে ৫০ জন ছাত্রের এবং মুসলিম ছাত্রাবাস ১টিতে ৫০ জন ছাত্রের বসবাসের ব্যবস্থা ছিল এবং শিক্ষাদাতা অধ্যাপকের সংখ্যা দেখানো হয় ৪৭ জন সুতরাং কলেজটি যদি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে, এত সংখ্যক লোকের ভবিষ্যত কি হবে সেই বিষয়ে সরকারের মূল্যায়ন কি হবে  তা নিয়ে ভাবনার উদ্রেক হয়।

শরৎ চন্দ্র বসু (ডানে)

আর এইভাবেই সৃষ্টি হয় রাজশাহী কলেজের দাঙ্গা। সেটি ছড়িয়ে পড়ে সে সময়ের সিলেটের শ্রীহট্ট কলেজেও। আর, এইভাবেই তৈরি হয় উত্তরবঙ্গের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নীল নক্সা। যাতে জড়িত ছিল সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা। আর, খোদ বৃটিশ রাজনীতির হাওয়া, কংগ্রেস ও মুসলীম লীগ তিন পক্ষই।

 

লেখকঃ রিফাত করিম

স্নাতকোত্তর

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়