Dr. Neem on Daraz
Dr. Neem Hakim
দেখার কি কেউ নেই?

নকল ও ভেজালে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২২, ১১:০০ পিএম
নকল ও ভেজালে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ

ফাইল ছবি

ঢাকাঃ দেখতে একই রকম। মোড়ক, দাম ও আর পণ্য-কোথাও তেমন পার্থক্য নেই। তবে একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, যে কোনো ব্র্যান্ডের নামের শেষের শব্দে কিংবা দ্বিতীয় শব্দটি ভিন্ন দিয়ে উচ্চারণে সামান্য পার্থক্যে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল পণ্য বাজারজাত বাজারজাত করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। আসল পণ্যের মোড়কের সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য না থাকায় ক্রেতার পক্ষে বুঝে ওঠা মুশকিল যে, তিনি নকল পণ্য কিনছেন। যথাযথ পদক্ষেপে পণ্য নিয়ে প্রতারণা বন্ধ করা না হলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রাণের জুস, রূপচাঁদা সয়াবিন, তিব্বতের কাপড় কাঁচার সাবান, রিন, হুইল, কফিকো ক্যান্ডি, হারপিক,বিদুৎতের তার, জুতা, হাকিমপুরী জর্দার মোড়কের আদলে পণ্যের নাম ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়া মোড়ক দেখতে একই রকম। বাজারে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত এসব ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতা নকল পণ্যটি তাৎক্ষণিক বুঝতেও পারছেন না। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন না থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি মানহীন এসব পণ্যে একদিকে ক্রেতা প্রতারণার শিকার হচ্ছে অন্যদিকে যেনতেনভাবে তৈরি এসব পণ্যে ঝুঁকিতে পড়ছে ক্রেতার স্বাস্থ্য। শহরের বাজারের পাশাপাশি মফস্বলের ক্রেতারা এসব পণ্যে প্রতারিত হচ্ছেন।

বাজারে বিক্রি হওয়া প্রসাধনীর একটি বড় অংশই নকল। এগুলো ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নকল ওষুধের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রেতাদের পক্ষে নকল ওষুধ চেনা সম্ভব নয়। তবে সরকারকে কর না দিয়ে ট্যাক্স স্ট্যাম্প নকল করে কিংবা পুরোনো স্ট্যাম্প ব্যবহার করে এবং চোরাপথে বিদেশ থেকে এনে অবৈধভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে সিগারেট। মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারেও নকলের দৌরাত্ম্য রয়েছে। অপরাধীরা সরকারের রেভিনিউ স্ট্যাম্পও জাল করছে। এখানেও সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি নকল হচ্ছে প্রসাধনসামগ্রী। দেশে ব্যবহূত প্রসাধনসামগ্রীর প্রায় ৪০ শতাংশ নকল। আর দেশে ব্যবহূত মোবাইল ফোন সেটের ২০ শতাংশ নকল। নকল ইলেকট্রিক পণ্যের আয়ু স্বল্প হওয়ায় দেশে ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর। নকল মোবাইলের রেডিয়েশন উচ্চ মাত্রার।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত ঠেকানো না গেলে তা একদিকে দেশের অর্থনীতিকে যেমন আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। তাই নকল পণ্য উৎপাদন ঠেকানোয় সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি করা না গেলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন। সরকারের রাজস্ব আহরণে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নকল ও ভেজাল পণ্য কিনে প্রতারিত হলে তার প্রতিকারের জন্য ভোক্তা নিজেই আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন। বিশ্বের অনেক দেশেই নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তার ব্যক্তিগত সচেতনতা অনেকদূর এগিয়েছে। নানা কারণেই ভোক্তা আইন প্রয়োগে দেশে ভোক্তার সচেতনতা সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। ১৯৯৪ সালে ইসা লিসবেক নামের এক মার্কিন নারীর শরীরে ম্যাকডোনাল্ডসের ৫০ সেন্টের কফি পড়ে পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে দিতে হয়েছে ছয় লাখ ডলার। অভিযোগ ছিল- স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কফি সরবরাহ করা হয়েছিল।

ক্রেতা অধিকার ও নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। হাইকোর্ট পণ্যের মান ঠিক রাখতে বছরজুড়ে বিএসটিআইকে নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষারও নির্দেশ দিয়েছে। ভেজাল খাদ্যপণ্য ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি রুখতে ভোক্তারা যাতে যে কোনো সময়ে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য হটলাইন সার্ভিস চালু করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। আদালত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে উপজেলা পর্যায়েও ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পরামর্শ দেন।

সংশ্নিষ্টরা জানান, নকল ও ভেজাল রোধ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে বাংলাদেশে আইন রয়েছে অনেক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনগুলোর অধীনে কিছু জরিমানা ও সর্বোচ্চ দুই বছরের শাস্তি দেওয়া হয়। কেউ কেউ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। অনেকে আবার জামিনে বেরিয়ে একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছেন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (গ) এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল মেশালে বা ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করার অপরাধ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান আছে। তবে এই আইনে মামলা হয় খুবই কম। আবার মামলা হলেও কারও শাস্তির নজির নেই।

আগামী নিউজ/এসএস