Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

কুমিল্লার রসমালাই স্বাদে ও মানে অনন্য


আগামী নিউজ | গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২১, ০৫:১৬ পিএম
কুমিল্লার রসমালাই স্বাদে ও মানে অনন্য

ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লাঃ রসমালাই শব্দটির সঙ্গে আমরা সকলেই কম বেশি  পরিচিত। সময়ের ধারাবাহিকতায় বিশেষায়িতভাবে তৈরি  মিষ্টি রসমালাই নাম ধারণ করে  আমাদের মন বিশেষ করে মিষ্টি প্রিয় মানুষদের মন জয় করে  নিয়েছে এই স্বাদে রসমালাই। রসমালাই দক্ষিণ এশিয়ার (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল) জনপ্রিয় মিষ্টান্ন। ছোট ছোট আকারের রসগোল্লাকে চিনির সিরায় ভিজিয়ে তার ওপর জ্বাল দেওয়া ঘন দুধ ঢেলে রসমালাই বানানো হয়। কথিত আছে, রসমালাই বঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গের মিষ্টান্ন খাদ্য। ১৯৩০ সালে এটি রসগোল্লা থেকে রসমালাই নামে পরিচিত হয়। কুমিল্লার রসমালাই তৈরির উপাদান উৎপত্তি ও ইতিহাস

পাক-ভারত তথা উপমহাদেশে কুমিল্লার রসমালাইয়ের সুখ্যাতি সর্বজনবিদিত। আমাদের দেশে পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যে কোনো অনুষ্ঠানেই মেনুর শেষ পর্বে থাকে কুমিল্লার রসমালাই।

সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রপ্রধানদের আপ্যায়নের তালিকায় কুমিল্লার রসমালাই আপন মহিমায় উজ্জ্বল। 

রসমালাই-নাম শুনলেই জিভে জল আসে। সুস্বাদু এই মিষ্টান্নের খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও। রসমালাইয়ের নাম বলতেই সবার আগে মনে হয় কুমিল্লার নাম। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে রসমালাই তৈরি হলেও কুমিল্লার রসমালাইয়ের স্বাদের তুলনা নেই। দেশ-বিদেশের যে কোনো পর্যটক কুমিল্লায় বেড়াতে এসে রসমালাই না খেয়ে বা না নিয়ে  কারও ফেরত যাওয়ার ঘটনা বিরল। কুমিল্লার রসমালাইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কুমিল্লা নামে ঐহিত্য।

রসমালাই একদিকে যেমন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐহিত্যকে সমৃৃদ্ধ করেছে, তেমনি সুস্বাদু মিষ্টি হিসেবে বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। কুমিল্লার রসমালাই জেলাবাসীর সব উৎসব আয়োজনে যেমন কদর পায়, তেমনি কুমিল্লা থেকে কেউ বেড়াতে গেলেও রসমালাই নিয়ে যাওয়া বর্তমানে ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

রসমালাই নামে উৎপত্তিঃ

কুমিল্লা রসমালাইয়ের আদি উদ্ভাবক ত্রিপুরা রাজ্যের ঘোষ সম্প্রদায়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তারা অর্ডার অনুযায়ী বাহারি রকমের মিষ্টি সরবরাহ করত। সেই সময় রসগোল্লার সঙ্গে মালাইকারির প্রলেপ দেয়া এক প্রকার মিষ্টির প্রচলনও ছিল। কেউবা এটাকে মালাই রসগোল্লা বলত। পরবর্তী সময়ে দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর বানিয়ে তার মধ্যে শুকনা রসগোল্লা ডুবিয়ে তৈরি করা হয় ক্ষীরসহ রসগোল্লা। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্ষীরভোগ’। রসমালাইর প্রথম নাম ক্ষীরভোগ। ত্রিশ দশকে এই রসগোল্লার আকার ছোট করে দুধের ক্ষীরের মধ্যে ডুবিয়ে পরিবেশন করা শুরু হয় এবং এর নামকরণ হয়ে যায় রসমালাই।

যেখানে পাবেন উৎকৃষ্ট রসমলাইঃ

কুমিল্লা কান্দিরপাড় মনোহরপুরে অবস্থিত মাতৃভান্ডারে পাওয়া যায়। তবে উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু রসমলাই পেতে হলে আসতে হবে মনোহরপুরে অবস্থিত মাতৃভান্ডারে।

কুমিল্লার রসমলাইয়ের দোকানের মধ্যে মাতৃভান্ডারের রয়েছে বাড়তি নাম। কুমিল্লার মনোহরপুরের আনাচে কানাচে রসমালাইয়ের এসব দোকানগুলোতে নেই কোন চাকচিক্য। বেশিরভাগ দোকানে বসার ব্যবস্থাও নেই। তবে ২/১ টি দোকানে বসে খাওয়ার জন্য আছে ৫/৬ টি আসন। বাইরের চাকচিক্যের চেয়ে স্বাদ এবং মানই এসব দোকানিদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, দোকানগুলোর নাম, সুনাম ছড়িয়ে আছে।

কুমিল্লার প্রসিদ্ধ রসমালাইয়ের দোকান মাতৃভাণ্ডার। 

কুমিল্লার রসমালাইয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে অসংখ্য দোকান গড়ে উঠেছে। সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে কুমিল্লার রসমালাই বলে। আসলে এগুলো খাঁটি নয়। কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই বিক্রেতা মাতৃভাণ্ডার। তাদের ব্যবসার সুনাম রাখার জন্য কোথাও কোনো শাখা খুলেনি। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লা অংশে এখন অসংখ্য দোকানে বিক্রি হচ্ছে রসমালাই। এ দোকানগুলো মাতৃভাণ্ডার ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের প্রতারিত করে আসছে।

কুমিল্লা জেলার রেল ষ্টেশন, গুরুত্বর্পূণ বাস স্ট্যান্ড, আলেখারচর বিশ্বরোড, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, হাইওয়ে রোডের বড় বড় হোটেলগুলোসহ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার ৯৭ কিঃমিঃ রাস্তার আশেপাশে গড়ে উঠছে এসব নকল শো-রুম।

ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম,কক্সবাজার, সিলেট, বি-বাড়িয়া প্রভৃতি জেলায় ভ্রমণকারি লোকজন যাত্রাপথে গাড়ি থামার পর রসমলাই কিনে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে তারা প্রতারিত হচ্ছেন, আসল রসমলাইয়ের স্বাদ গ্রহণ থেকে। স্বাদের ভিন্নতা ছাড়াও তুলনামূলক ভাবে দামও বেশি রাখা হয়। আসল রসমলাই পেতে হলে মনোহরপুর, কান্দিরপাড় এর দোকান থেকে রসমলাই কিনতে হবে, তাহলেই প্রকৃত স্বাদ থেকে কেউ আর বঞ্চিত হবেনা।

স্পেশাল রসমালাইঃ

জগৎ বিখ্যাত কুমিল্লার রসমালাইয়ের প্রথম তৈরি ও বিক্রি শুরু হয় শহরের মনোহরপুরে অবস্থিত ‘মাতৃভাণ্ডারে’। ক্ষণী সেন ও মনি সেন নামের দুই ভাই কুমিল্লার মিষ্টি ব্যবসায় রসমালাই তৈরি করে আধুনিক ছোঁয়া নিয়ে আসেন। সেই থেকে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাণ্ডার আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এখনও মাতৃভাণ্ডারে প্রতিদিন ১ থেকে দেড় টন রসমালাই বিক্রি হয়।

বর্তমানে কুমিল্লার কিছু কিছু দোকানে স্পেশাল রসমালাই নাম দিয়ে রসমালাইকে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। এটি অন্য কিছু নয়। স্পেশাল রসমালাইয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হলো দানা আকারের মিষ্টিগুলো অপেক্ষাকৃত একটু বড়।

ডায়াবেটিক রসমালাইঃ

ডায়াবেটিক রোগীরা যাতে কুমিল্লার রসমালাইয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য কুমিল্লায় এখন ডায়াবেটিক রসমালাইও তৈরি হয়। ডায়াবেটিক রসমালাই প্রথম শুরু করেন শহরের নজরুল এভিনিউতে অবস্থিত অমৃত মিষ্টি।