Agaminews
August

কুমিল্লার রামমালা গ্রন্থাগার এখন ধুলাবালুতে ধূসর


আগামী নিউজ | গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২১, ০৪:০৫ পিএম
কুমিল্লার রামমালা গ্রন্থাগার এখন ধুলাবালুতে ধূসর

ছবি : আগামী নিউজ

কুমিল্লাঃ শতাব্দী প্রাচীন গবেষণা গ্রন্থাগারের নাম রামমালা গ্রন্থাগার। ঐতিহ্যের রামমালা গ্রন্থাগার এখন ধুলাবালুতে ধূসর। তালপাতা, ভোজপাতা ও কাঠের মধ্যে খোদাই করা বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃৃতির দুর্লভ পুথি ধুলাবালু আর পোকা-মাকড়ে বিনষ্ট হচ্ছে। অযত্ন-অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন ধ্বংসের পথে যাচ্ছে শতবর্ষের রামমালা গ্রন্থাগারের দুর্লভ সব পাণ্ডুলিপি। এ গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার দুর্লভ গ্রন্থ। এর মধ্যে রয়েছে সংস্কৃত পুথি ৬ হাজার, বাংলা পুথি ২ হাজার। ১৯৪৪ সালে রামমালা গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর 'মহেশ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট' গঠনের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। গ্রন্থাগারটির এমন বেহাল অবস্থার কারণে হতাশা ব্যক্ত করেছেন গবেষক, শিক্ষানুরাগী ও সুশীল সমাজ।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১০৯ বছর আগে ১৯১২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য। কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর এলাকায় বর্তমান কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বিপরীতে ৮ একর জায়গায় তিনি 'মহেশাঙ্গন' গড়ে তোলেন। এখানে তিনি তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন রামমালা গ্রন্থাগার এবং ১৯১৪ সালে তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালাসহ আরও জনহিতকর অনেক প্রতিষ্ঠান। তার অপরিসীম শ্রম ও দানের ওপর নির্ভর করেই এই পাঠাগারটি গড়ে ওঠে। রামমালা গ্রন্থাগারে ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য ও দর্শনের গ্রন্থ আছে। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ পাঠকের উপযোগী জীবনীগ্রন্থ, ইতিহাস, ভ্রমণবৃত্তান্ত, উপন্যাস ও পত্রপত্রিকা রয়েছে। পুথি বিভাগে সনাতন ধর্ম-দর্শনের প্রাচীন শাস্ত্র ও সংস্কৃতিবিষয়ক হস্তলিখিত গ্রন্থ রয়েছে। বিশেষ করে তুলোট কাগজে লেখা প্রাচীন পুথি, দুর্লভ বই, ধর্মগ্রন্থ ও পত্রপত্রিকার অমূল্য সংগ্রহশালা এই গ্রন্থাগার দেশি-বিদেশি গবেষকদের কাছে প্রিয় পাঠাগার।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ১৯১৫ সালে এখানে দৃষ্টিনন্দন করে ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের নিচতলায় রয়েছে গ্রন্থাগারের পুস্তক বিভাগ। পুথি বিভাগটি মহেশাঙ্গনের দেবালয়ের পাশে। পুস্তক বিভাগের ১৪টি আলমারি দুষ্প্রাপ্য বইয়ে ঠাসা। সেখানে (মহেশাঙ্গন) কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামাঙ্কিত একটি স্মৃতিফলকও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মহেশাঙ্গনে এসেছিলেন ১৯২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। রামমালা গ্রন্থাগারে ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকেও এক সময় গবেষকরা আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এক চুক্তিমতে রামমালা পুথি বিভাগের প্রায় ২ হাজার ৫০০ পুথি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোফিল্ম করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বহু গবেষক রামমালা পুথি বিভাগে গবেষণার জন্য আসেন।

এ বিষয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা পাপন পাল বলেন, বর্তমানে এ প্রাচীন গ্রন্থাগারের বইগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর্কাইভের মতো করে বড় আকারের আধুনিক লাইব্রেরির মাধ্যমে দুর্লভ বই ও পুথিগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সরকার নজর  বা খেয়াল  না নিলে গ্রন্থাগারটি আরও বেহাল হয়ে পড়বে।

ঈশ্বর পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুধাংশু কুমার মজুমদার বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে এসব বই ও অন্যান্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে ইতিহাস-ঐতিহ্যের এ গ্রন্থাগারটির সমস্যার সমাধানসহ সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

রামমালা গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক ইন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, প্রাচীন এ গ্রন্থাগার আমাদের জাতীয় সম্পদ। এখানে শুধু হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান নয়, বিশ্বের সব ধর্মের যে কেউ গবেষণা করতে পারেন। এটি দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহশালা। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মের বই এখানে আছে। পুথিগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ এখনই নিতে হবে, নইলে নষ্ট হয়ে যাবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান আগামী নিউজ কে বলেন, এ জেলায় যোগদান করে এখনও প্রাচীন এ গ্রন্থাগারটি দেখা সম্ভব হয়নি। এখানে প্রাচীন সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অনেক দুর্লভ পুস্তক রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এগুলো জাতীয় সম্পদ, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্বার্থে এগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। তাই এর পরিচালনায় যে ট্রাস্ট রয়েছে তাদের সঙ্গে কথা বলে এ বিরল সংগ্রহশালার প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।