Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

সড়ক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করলেন সাহান 


আগামী নিউজ | জহির খান, বরিশাল জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২১, ০৪:৩৩ পিএম
সড়ক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করলেন সাহান 

ছবি : আগামী নিউজ

বরিশালঃ পিচ, কয়লা ও বিটুমিন ব্যবহার করে ২ লেনের এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে কমপক্ষে ৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পানি ঢুকে যে কোন সময়ে এই সড়ক নষ্ট করে ফেলতে পারে। ফলে সরকারের ব্যয় বাড়ে প্রতি বছর। এছাড়া প্রযুক্তির যুগে সকল কাজেই বিদ্যুৎ শক্তি অপরিহার্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে আলাদা করেই বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে সড়ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপযোগীতা অটুট রাখতে।

এই সড়ক নির্মাণে আর বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় সংকোচন করতে ‘স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্লান্ট’ এর উদ্ভাবন করেছেন সরকারি ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষার্থী মোসলে উদ্দীন সাহান। তার উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সড়ক থেকে তিন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। যার মাধ্যমে আধুনিক শহর চালিয়ে রাখা যাবে। সড়ক সংস্কারে বাড়বে না বাজেট। উল্টো দুই লেনের এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ব্যয় কমে আসবে চার কোটি টাকায়। এই সড়কের কোন অংশ সংস্কারের দরকার হলে পুরো সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন নেই বরং ক্ষতিগ্রস্থ অংশটুকু মেরামত করলেই চলবে।

শিক্ষার্থী মোসলে উদ্দীন সাহান বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হলেও বর্তমানে থাকেন সিটি কর্পোরেশনের ২০ নং ওয়ার্ড কলেজ এভিনিউয়ের ৫ নম্বর গলিতে। তার পিতা ডাঃ মোখলেসুর রহমান আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো)। মা কামরুন্নাহার নূর গৃহিনী। আর বড় ভাই মেজবাহ উদ্দিন রায়হান একটি বেসরকারি কোম্পানীতে কাজ করেন। ২০১৮ সালে আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি এবং ২০২০ সালে সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ নিয়ে এইচএসসি পাস করেছেন শিক্ষার্থী মোসলে উদ্দীন সাহান। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাহানের ইচ্ছা খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিজ্ঞানে নতুবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসী বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা। আর সারাজীবন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করবেন সে। মেধাবী শিক্ষার্থী সাহানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দেশে পরিচিতি না পেলেও স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার জিতে দেশের বাইরেও প্রদর্শিত হয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে জাপানের সাইন্স এবং টেকনোলজি এজেন্সির আমন্ত্রনে সাকুরা সাইন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করে। সেখানে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীদের সাথে সাহানও অংশ নেন।

সাহান জানিয়েছেন, স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্লান্ট প্রযুক্তি জাপানের ২ কিলোমিটার সড়কে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। সুফল মিললে তারা বৃহৎ পরিসরে কাজ শুরু করবে বলে আমাকে সেমিনারে জানানো হয়। তরুণ এই উদ্ভাবকের মতে, অগ্রসরমান পৃথিবীর জন্য এই ‘স্মার্ট সোলার হাইওয়ে অ্যান্ড পাওয়ার প্লান্ট’। কি কারণে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চিন্তা এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থী মোসলে উদ্দিন সাহান জানান, মূলত বিভিন্ন মাধ্যমে সড়ক ও বিদ্যুৎ বিভাগে লোকসানের প্রতিবেদন পড়ে প্রথম মোসলে উদ্দীন সাহানের চিন্তা আসে কিভাবে এই লোকসান খাত থেকে বেড় হওয়া যায়। এই চিন্তার সূত্র ধরে ২০১৬ সালে প্রথমে একটি ডায়াগ্রাম প্রস্তুত করে স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্টের। ১০ মার্চ শুরু হয় নির্মাণ। এক বছর বিভিন্ন গবেষণা, সংযোজন-বিয়োজন করে ২০১৭ সালের মার্চ মাসে পুরোপুরি প্রস্তুত হয় সোলার হাইওয়ের। ওই বছরের এপ্রিলে মোসলেহ উদ্দীনের উদ্ভাবিত স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট সৃজনশীল মেধা অন্বেষনে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই সালে জাতীয় পর্যায়ে ‘বছরের সেরা মেধাবী’ নির্বাচিত হন। একই বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৩৮ তম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে দেশসেরা হয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের হাত থেকে পুরষ্কার গ্রহন করেন। ২০১৮ সালের এপ্রিলে জাপানের সাইন্স এবং টেকনোলজি এজেন্সির আমন্ত্রনে সাকুরা সাইন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করে। আর ২০১৯ সালে সৃজনশীল মেধা অন্বেষনে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জনসহ জাতীয় পর্যায়ে বছরের সেরা মেধাবীর খেতাবও অর্জন করেন শিক্ষার্থী সাহান। এই প্রযুক্তি কেন দরকার এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থী সাহান বলেন, স্বল্প পরিসর ব্যবহার করে অধিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্চ। স্মার্ট সোলার হাইওয়ে পাওয়ার প্লান্ট হচ্ছে তেমনি একটি প্রযুক্তি, যেখানে একটি সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও হাইওয়ের সুবিধা নেয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় সবাই সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন না। সাধারণত একটি বাসা-বাড়িতে ১৫-২০ ওয়ার্ডের একটি সৌর প্যানেল ব্যবহার করলে ব্যাটারি, কন্ট্রোলারসহ ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। যা সকলের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু সোলার হাইওয়ে নির্মাণ হলে ব্যক্তি পর্যায়ের খরচ দরকার হবে না। সেই সাথে বছর বছর বাড়বে না বাজেট। একবার নির্মাণ করে নিলে তা কমপক্ষে ৬০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে।

এই প্রযুক্তিবিদ জানান, স্মার্ট সোলার হাইওয়ে তিন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এর মধ্যে মানুষের হাটাচলা ঘর্ষণ শক্তির মাধ্যমে, সূর্যের আলোর সাহায্যে সোলার সেলে থেকে এবং গাড়ি চলাচলে সৃষ্ট চাপ শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তরিত করবে। তিনটি প্রাকৃতিক শক্তিকে ন্যানো টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ শক্তিতে পরিণত করা হচ্ছে এজন্য প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট পরিবেশ বান্ধব ও নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস। যতদিন সূর্যের আলো থাকবে এই সড়ক দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তাছাড়া সোলার হাইওয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা সকল জনগন ব্যবহার করতে পারবেন। এমনকি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও সংযুক্ত করা যাবে। স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট তৈরীতে রাস্তার সবার নীচে বালুর বা পাথরের কোন স্তর লাগবে না জানিয়ে শিক্ষার্থী মোসলে উদ্দিন সাহান বলেন, এই রাস্তার সবার নীচের স্তরে থাকবে পিজো (চরবুড়); যার কাজ প্রেসারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এরপর সোলার সেল (ঝড়ষধৎ পবষষ); যার কাজ সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এছাড়া সোলার সেল তৈরির সময় তার সাথেই ডায়োড (উরড়ফব) থাকবে; যার মাধ্যমে মানুষের হাটাচলার সময় ঘর্ষণে যে ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয় তাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। প্রশ্ন থাকতে পারে যে ঘর্ষনের মাধ্যমে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তা মানুষকে তরিতাহত করতে পারে। এ কারনে এখানে এমন টেকনোলজি ব্যবহার করা হবে যাতে মানুষ তরিতাহত না হয়। তিনি আরও জানান, পলি ক্রিস্টালিন ও পলি কার্বোনেট ব্যবহার করে বিশেষ ধরণের গ্লাস সড়কের উপরে স্থাপন করা হবে। যার ফলে সড়কটিতে যানবাহন চলাচল উপযোগী হবে। এই গ্লাসের ওপর থেকে ৩০ মেট্রিকটন ভারবাহী যানবাহন অনায়াসে চলাচল করতে পারে। পুরো প্রকল্পটিতে ন্যানো টেকনোলজি নির্ভর। তরুণ এই মেধাবী শিক্ষার্থী জানান, সাধারণত পিচ, কয়লা ও বিটুমিন পুড়িয়ে সড়ক নির্মাণকালে কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাস উৎপন্ন হয়। যে গুলো আমাদের পৃথিবীর ওজন স্তরকে ধ্বংস করে। ওজন স্তরের কাজ হচ্ছে সূর্যর ইউভি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করা। কিন্তু সেগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আর যদি জ্বালানির সাথে সালফারের যোগসূত্র থাকে তাহলে এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এইসব ক্ষতিকারক দিক থেকে একটি স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট হতে পারে আদর্শ শক্তির উৎস। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের মতো দুই লেনের ২ কিলোমিটার রাস্তায় বছরে ৬ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আর যে বিদ্যুৎ পাবো সেটা ডিসি বিদ্যুৎ, সেটাকে বাসাবাড়ি, শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য ইনভার্টার ব্যবহার করে এসি করা হবে। এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পাওয়ার স্টেশনে যাবে, যেখানে স্টোরেজ ডিভাইজও থাকবে। ঝড়-বৃষ্টি হলে যাতে ব্যাকআপ দিতে পারে। আর এটির ভালো দিক হচ্ছে ন্যানো টেকনোলজির কারনে আকাশ মেঘলা থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই বিদ্যুৎ দিয়ে শহরে মেট্রোরেলও চালানো সম্ভব। ফলে এক সড়কের বিদ্যুৎকে নানান কাজে ব্যবহার করা যাবে।

মোসলে উদ্দিন সাহান বলেন, বর্তমানে এই প্রযুক্তির আরো আধুনিকায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর সাথে অটো ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম, ডাস্ট সেন্সর সিস্টেম যুক্ত করার কাজ করছি। স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে উল্লেখ করেন এই তরুন উদ্ভাবক।

বরিশাল জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সোহেল মারুফ বলেন, স্মার্ট সোলার হাইওয়ে এন্ড পাওয়ার প্লান্ট সর্ম্পকে জেলা প্রশাসনে জমা দিতে পারেন। ইউনিক উদ্ভাবন হলে সরকার সবোর্চ্চ সহায়তা করবে। উদ্ভাবন যদি ‘ইউনিক’ হয় তাহলে সেই প্রযুক্তি সর্ম্পকে জেলা প্রশাসন থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে গৃহিত হলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রহন করা হয়। এতে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট দফতর।