Agaminews
Bangla Noboborsho
Dr. Neem Hakim

রোগীর চাপ সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত হাসপাতাল?


আগামী নিউজ | প্রভাত আহমেদ প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২১, ০৪:০৩ পিএম
রোগীর চাপ সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত হাসপাতাল?

ঢাকাঃ দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এতে হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ কতটা সামাল দিতে পারবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর ভীড়। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকে। গুরুতর অসুস্থ হলেও আইসিইউ সংকটে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায় সরকারি পাঁচটি হাসপাতালকে পুনরায় প্রস্তুত করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউ বেড বাড়ানো হয়েছে দশটি। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে দুইটি আইসিইউ ও সাধারণ বেড ৫০টি বাড়ানো হচ্ছে।

এদিকে ঢাকায় যখন এমন অবস্থা, তখন বাইরেও হাসপাতালগুলোর চিত্র বেশ খারাপ। কারণ বেশিরভাগ হাসপাতালে নেই আইসিইউ সুবিধা। ফলে গুরুতর অসুস্থদের নিয়ে আসতে হচ্ছে ঢাকায়।

এদিকে যে হারে রোগী বাড়ছে তাতে হাসপাতালগুলো সবশেষ কতটা সামাল দিতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, প্রতিদিন পাঁচ হাজার রোগী শনাক্ত হলে সারা ঢাকায়ও রোগীর জায়গা হবে না। এমন অবস্থায় ঢাকায় রোগী আসা কমানোর পাশাপাশি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সংখ্যা বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ (শনিবার পর্যন্ত) পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাদেশে সব মিলিয়ে করোনার সাধারণ বেড ৯হাজার ৭২২ টি। এরমধ্যে খালি আছে ৫হাজার ২৭৪টি। আর মোট ৫শ ৯৬টি আইসিইউ বেডের মধ্যে খালি আছে ২শ ৪টি।

চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. ফজলুর রহমান আগামী নিউজকে বলেন, হাসপাতালগুলোর ওপর যে হারে চাপ বাড়ছে, তাতে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় সরকার ঢাকা সরকারি হাসপাতালগুলোতে আড়াই হাজার সাধারণ শয্যা এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলো এক হাজারের বেশি শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

মার্চের প্রথম দিক থেকে ক্রমেই দেশে বাড়ছে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর হার। সবশেষ এক সপ্তাহের ব্যবধানে শনাক্ত বেড়েছে ৬৬.৫৪ ভাগ। সুস্থতার হার ২০.০৬ ভাগ ও মৃত্যুও হার বেড়েছে ৭১.১৪ ভাগ।

করোনার এমন উর্ধ্বগতির কারণে শঙ্কা প্রকাশ করে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন যদি পাঁচ হাজার করে শনাক্ত হয়, আর তার একটা অংশ যদি হাসপাতালে আসে, তাহলে হাসপাতালে জায়গা করা সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যেই হাসপাতালগুলো প্রায় ভরে গেছে।’

এদিকে রোগীর চাপ বাড়ার কারণে গত ২২ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে করোনার কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়া মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টার এবং সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে আবারো প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হাসপাতালগুলো প্রস্তুতের কাজ চলছে। পৃথক আদেশের পর শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে করোনা রোগীর চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়েছে।

ঢাকার হাসপাতালের হাল হকিকত

দিনে দিনে রোগীর চাপ বাড়ায় ঢাকার দশটি করোনা চিকিৎসার হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না অনেকে। কারণ অনেক জায়গায় সাধারণ বেডেও জায়গা নেই। বিশেষ করে আইসিইউ খালি না থাকায় বেশি বিপদে আছেন গুরুতর অসুস্থ রোগীর স্বজনরা। অনেক চেষ্টায়ও মিলছে না কোনো আইসিইউ।

সরকারি হাসপাতালে যখন এমন অবস্থা তখন বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র কিছুটা ভালো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান মোট ঢাকার দশটি হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দুই হাজার ৫১১টি সাধারণ বেডের মধ্যে শনিবার পর্যন্ত খালি ছিল ১০৫টি। আর ১১৮টি আইসিইউর মধ্যে খালি আছে মাত্র তিনটি বেড।

তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ১৬৯টি বেডের মধ্যে খালি আছে মাত্র ১৮টি। আইসিইউর ১৬টি বেডেই রোগী আছে। ৫০০ শয্যার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ২৭৫ বেডের মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ৪২৮জন। এছাড়াও ১৫৩জন করোনা রোগীর চিকিৎসা চলছে হাসপাতালটিতে। আর আইসিইউর ১০ বেড রোগী আছে হাসপাতালটিতে।

২৫০ শয্যার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ঢাকা ১৪০ বেডের মধ্যে খালি আছে মাত্র ১৯টি। ১৬টি আইসিইউর সবগুলো রোগীতে পূর্ণ হয়ে আছে। ফুলবাড়িয়ার সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে ৯০ বেডের মধ্যে ১৪টি খালি আছে। জায়গা নেই ৬টি আইসিইউ বেডে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ইউনিট-২) ও বার্ন ইউনিটের ৮৮৩টি বেডের মধ্যে খালি আছে ১৭০টি। ২০টি আইসিইউর মধ্যে খালি আছে মাত্র ১টি। ৫০০ শয্যার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১০টি বেডের মধ্যে খালি আছে ১০টি। ১৯টি আইসিইউর খালি নেই একটাও।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ১৫০টি বেডের মধ্যে খালি আছে মাত্র ২৩টি।

অন্যদিকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি আছে বলে জানা গেছে। করোনা ইউনিটের ২৫০ বেডে ৩৫৮জন রোগী ভর্তি আছে। ১৫টি আইসিইউর খালি আছে মাত্র দুইটি। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১০ বেডে মধ্যে ৯টি খালি আছে। এখানে আইসিইউ বেড নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা ইউনিটে ২৩৪ বেডের মধ্যে খালি আছে ৪৯টি। ১৬টি আইসিইউ রোগীতে পূর্ণ হয়ে আছে।

এদিকে ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৭০ র মধ্যে খালি আছে ১১৯টি। ৩০টি আইসিইউর মধ্যে ১১টি খালি আছে। আসগর আলী হাসপাতালের ১৬৮টির মধ্যে ১২১টি খালি আছে। ৩২টি আইসিইউর ১৭টি এখনো খালি আছে।

আর স্কয়ার হাসপাতালের ৬৫টির মধ্যে ১০টি খালি আছে আর ১৯টির মধ্যে আইসিইউ খালি আছে দুইটি। ইবনে সিনা হাসপাতালের ৪৪টির মধ্যে সবগুলোতেই রোগী আছে। আর পাঁচটি আইসিইউর সবগুলোতেই রোগী আছে। ইউনাইটেড হাসপাতালের ৮০টির মধ্যে খালি আছে ১২টি। আইসিইউ ২২টির মধ্যে খালি আছে ৮টি। এভার কেয়ার হাসপাতালের ২৮টির মধ্যে একটি বেড খালি আছে। ২১টি আইসিইউর মধ্যে খালি আছে মাত্র একটি। ইম্পালস হাসপাতালের ২৫০ বেডের মধ্যে খালি আছে ৯৬টি। ৪০টি আইসিইউ বেড রোগীতে ঠাসা। এ এম জেড হাসপাতালের ৯০টি বেডের মধ্যে খালি আছে ৭টি। ১০ বেডের আইসিইউর একটিও খালি নেই। আর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের ৬২টি বেডের মধ্যে খালি আছে তিনটি। নয়টি আইসিইউর মধ্যে খালি আছে মাত্র দুইটি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আগামী নিউজকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো বাদ দিয়ে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা এবং আইসিইউ ব্যবস্থাপনা উন্নত না হওয়ায় অনেক করোনা রোগী ঢাকা আসতে বাধ্য হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সামলাতে এখনই ব্যবস্থা না নেয়া হলে চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়তে পারে।’ এই অবস্থায় ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা গেলে কিছুটা দুর্ভোগ লাঘব হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আগামীনিউজ/প্রভাত