Agaminews
 অমর একুশে
Dr. Neem Hakim

বিলুপ্তির পথে উর্দুভাষীদের মাতৃভাষা


আগামী নিউজ | জিকরুল হক, উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১, ০৫:০৮ পিএম
বিলুপ্তির পথে উর্দুভাষীদের মাতৃভাষা

ছবিঃ সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলঃ খন্ডিত ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে যে সব উর্দুভাষী বিহারী পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে এসেছিলেন দেশের উত্তরাঞ্চলে সেই সব উর্দুভাষীদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে। তাদের মাতৃভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা দখল নিতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে উর্দুভাষার বাক্যে বাংলা শব্দ প্রবেশ করেছে।

বাঙ্গালীরা যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল পাকিস্থানিদের বিরুদ্ধে তখনও ভাষা সংখ্যালঘু তথা বিহারীরা পাকিস্তানি শাসক গোষ্টির সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে বাঙ্গালীদের দাবির বিপক্ষে এদেশে বসবাস করেও অবস্থান নিয়েছিল।

পাকিস্তানি শাসক গোষ্টির বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীরা ৫২’র পথে ৭১’র জন্ম দিলেন। পাকিস্তান ভেঙ্গে দুই টুকরা হলো। রক্তক্ষয়ি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লাখো বাঙ্গালীর জীবনের মূল্যে পাকিস্তানের পূর্ব অংশ তথা পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে নতুন পতাকা ও মানচিত্র নিয়ে পৃথিবীর বুকে বাঙ্গালীর দেশ সৃষ্টি হলো। যার নাম হলো বাংলাদেশ।

ভারতের বিহার প্রদেশের যেসব মুসলিম উর্দুভাষী বিহারি পাকিস্তান অপশন দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বসতি গড়েছিলেন তারা এদেশে ভাষা সংখ্যালঘু হয়ে বাঙালীদের আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। এতে করে মুসলমান হয়েও শুধুমাত্র ভাষার ভিন্নতার জন্য বিহারীরা বাঙ্গালীদের শত্রুতে পরিণত হল। দেশ পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত হলে আড়াই লাখ বিহারি পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজপথে নামে। সেই সময়কার সরকার তাদের বসবাসের জন্য ক্যাম্প করে দেয়। যা বর্তমানেও আটকে পড়া পাস্তিানীদের ক্যাম্প হিসাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি রয়েছে। পাকিস্তান অপশন দিলেও পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন যুগের পর যুগ ধরে বাস্তবের মুখ দেখছে না। ফলে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে পাকিস্তান গমনেচ্ছুক উর্দুভাষীরা বাংলাদেশর শরনার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে। বর্তমানে তারা প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে পুনর্বাসনের দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়েছে।

সেই সময়ে তাদের পূর্ব পুরুষরা বাঙ্গালীদের দাবীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানী শাসকের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল। সেটি ভুল ছিল বলে উর্দুভাষীদের বর্তমান প্রজন্ম মনে করছেন। সেজন্য তারা তাদের সন্তানদের বাংলা মিডিয়ামে শিক্ষিত করার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে উর্দুভাষীর সন্তানরা স্কুলমুখো হয়েছেন। অনেক পরিবারের ছেলে মেয়েরা যৎ সামন্য হলেও বাংলা ভাষায় উচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন। পড়ালেখা শেষে অনেকে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরীও করছেন। তারা কেউ আর পাকিস্তানে যেতে চাইছে না। তাদের সাফ কথা অতীতের ভুল আর এই প্রজন্ম করবে না। সেজন্য উর্দুভাষী বিহারিরা পুরোপুরি বাংলা ভাষা চর্চা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজ মাতৃভাষা থেকে সরে আসছে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের সৈয়দপুর, রংপুর, ঈশ্বরর্দী, বগুড়া ও রাজশাহীর শিরোইলে প্রায় দুই লাখ উর্দুভাষী বিহারী বসবাস করছে। এর মধ্যে সৈয়দপুরে উর্দুভাষীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

কথা হয় উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবালের সঙ্গে। তিনি বলেন ক্যাম্পে অবস্থানরত শতভাগ শিশু এখন স্কুলমুখী হয়েছে। তারা বাংলা ভাষায় লেখাপড়া শিখছে। আমাদের বাব-দাদারা  এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সেদিন সামিল না হয়ে ভুল করেছিল। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দেশ যেমন টুকরা হয়েছে, তেমনি আমরা যারা তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম সেই পাপের প্রায়শ্চিত্য আজ আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ভোগ করছি। বাঙালীরা আমাদের শত্রু ভাবে। শুধু তাই নয়, ক্যাম্পের বাইরে যেসব উর্দুভাষী আছে তারাও ক্যাম্পে বসবাসকারী উর্দুভাষীদের সামাজিক মর্যাদা দিতে চায় না, ঘৃণার চোখে দেখে। যুগের পরিবর্তনে মানুষ সচেতন হচ্ছে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে শিক্ষা গ্রহণের বিকল্প নেই। আর যেহেতু এদেশে থাকতে হবে সেই কারণে বাংলা ভাষায় জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। তার মতে আমাদের মাতৃভাষা উর্দুকে বাচিয়ে রাখতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বিলুপ্তির পথ থেকে উর্দুভাষীকে কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় এ বিষয়ে জানতে কথা হয় সৈয়দপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহিন আখতার বিএসসির সঙ্গে। তিনি বলেন, উর্দুভাষাটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যে ভাষার মাধ্যমে অনেক ভালো ভালো সাহিত্য রচনা হয়েছে। এই ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে দেশের অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠির ভাষা যে পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে তেমন উদ্যোগ নিলে ভাষাটি বাঁচানো সম্ভব হবে। তার মতে সেই সময়ে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির একচোখা নীতির কারণে উর্দুভাষার প্রতি এদেশের মানুষের বিতৃষ্ণা রয়েছে। ভাষার কারণে দেশ ভাগ হয়েছে। তবে বর্তমানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও উর্দুভাষার একটি পুর্ণাঙ্গ ফ্যাকাল্টি আছে। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে উর্দুভাষার চর্চা অব্যাহত আছে।

কথা হয় সাবেক পৌর কাউন্সিলর আলহাজ্ব কায়সার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা বাস করি। বাঙ্গালি হয়ে থাকতে চাইছি। তাই উর্দুর পরিবর্তে আমরা পারিবারিকভাবেই বাংলা ভাষার চর্চা করি।হাজী কায়সার আলী আরও বলেন, বাংলা ভাষাকে বেশী আয়ত্ব করতে আমরা বাঙ্গালী পরিবারে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছি। বাঙালি সংস্কৃতি আত্মস্থ করতেই আমরা আত্মীয়তা করছি বাঙালীদের সঙ্গে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে যেন কোন বিভাজন বিরাজ না করে।

কথা হয় ব্যবসায়ী, সমাজসেবী সাবেক কাউন্সিলর ও শিক্ষাব্রতি মানুষ আকতার হোসেন ফেকুর সঙ্গে। তিনি বলেন ভাষা একটি বিজ্ঞান, এটি পরিবর্তন হতে বাধ্য। আমরা উর্দুভাষীরা এদেশের নাগরিক হিসাবে প্রত্যেকটি কাজের জন্য বাংলা ব্যবহার করি। সেজন্য উর্দুভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হবে এটিই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সকলের থাকা প্রয়োজন।

কথা হয় মৎস্যজীবী লীগ নেতা আশরাফুল ইসলাম মামুন তালুকদার, ওমর ফারুক আপেল ও স্থানীয় সাংবাদিক আশরাফুল আলমের সঙ্গে। তারা বলেন ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছরেও বাংলাদেশের সর্বস্তরে তথা উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল বিদ্যা ও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন আজও শুরু হয়নি। সেক্ষেত্রে উর্দুভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে এটিই স্বাভাবিক। জীবন দিয়েও যে ভাষার মর্যাদা আজও রক্ষা হচ্ছে না, সেই স্থানে উর্দুভাষার বিলুপ্তি আটকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়। তাদের মতে সব ভাষারই বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

আগামীনিউজ/নাসির