Dr. Neem on Daraz
Dr. Neem Hakim

মোটরসাইকেল বাড়াচ্ছে দূষণ, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২১, ০৬:৩৩ পিএম
মোটরসাইকেল বাড়াচ্ছে দূষণ, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাঃ সিগন্যালে আটকে আছে সারি সারি যানবাহন। সারির সামনে ৩৫-৪০টি মোটরসাইকেল। একটু ফাঁকা পেয়েই উচ্চ স্বরে হর্ন দিতে দিতে ভোঁ টান দিয়ে মোড়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল কয়েকটি মোটরসাইকেল। অন্য বাহনগুলো তখনো সিগন্যালে আটকে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বিজয় সরণী মোড়ে দেখা মেলে এই দৃশ্যের। তবে এই চিত্র কেবল বিজয় সরণী নয় বরং পুরো রাজধানী শহরে। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, মোটরসাইকেলের এমন বেপরোয়া চালনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বাড়ছে যানজট ও দূষণ। 

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ১৯২টি। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেলই ৬ লাখ ২৫ হাজার ৪১৮টি। এটা শুধু ঢাকা মেট্রোর। আর ঢাকার বাইরের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল যেগুলো ঢাকা শহরে চলে তার হিসেব কারও কাছেই নেই। ফলে বলা মুশকিল রাজধানী শহরে কি পরিমাণ মোটরসাইকেল চলে। 

রাজধানীর বনানী আবাসিক এলাকাটি নীরব এলাকা হিসেবে পরিবেশ অধিদফতরে তালিকাভুক্ত হলেও এখানে যানবাহনের হর্নের শব্দে এক স্থানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়না। আর যানবাহনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হর্ণ বাজাচ্ছে মোটরসাইকেল । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদফতরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি।

মোটরসাইকেলে যেভাবে দূষণ বাড়ছেঃ দেশের প্রধান শহরগুলোতে শব্দদূষণের জন্য যানবাহনের হর্নকেই দায়ী করেছে পরিবেশবিদরা। তাদের করা এক গবেষণায় বলা হয়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরবাইকের হর্ন এই উচ্চমাত্রার শব্দের প্রধান উৎস। এই বাহনগুলো অপ্রয়োজনে ও অহেতুক হর্ন বাজায়। এখানেও তারা উল্লেখ করেছেন রাজধানীতে অহেতুক ও সবচেয়ে বেশি হর্ন বাজে মোটরবাইকের। 

মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২% মানুষ শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। আর এই ১২ শতাংশ মানুষের প্রায় সিংহভাগই রাজধানী শহর ঢাকার। শব্দ দূষণের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস ছাড়াও যোগ হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ, ফুসফুসজনিত জটিলতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা।

অন্যদিকে ওজনে কম দেওয়া এবং কেরোসিন ও অপরিশোধিত তেল মিশিয়ে অকটেন বিক্রি করার দায়ে রাজধানীর পল্টন ও মোহম্মদপুর এলাকার ছয়টি সিএনজি ও ফিলিং স্টেশনকে সম্প্রতি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, এসব স্টেশনে অকটেনে কেরোসিন, পোড়া মবিল, ডিজেল মেশানো হতো। শুধু অকটেনে নয়, পেট্রোলেও মেশানো হচ্ছে এসব পোড়া মবিল, কেরোসিন ও ডিজেল। মোটরসাইকেলের জ্বালানী প্রধানত অকটেন ও পেট্রোল। এই ভেজাল জ্বালানীর ফলে মোটরসাইকেল থেকে নির্গত হচ্ছে ভারী কালো ধোঁয়া যা বায়ু দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বায়ু দূষণে বিশ্বের মধ্যে আবারও এক নাম্বারে উঠে এসেছে ঢাকা। প্রথম স্থানে শুধু উঠে এসেছে বললে ভুল হবে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় আজ দূষণের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান যাচাইয়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়াল একিউআই-এর বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, গত রবিবার (১০ জানুয়ারি, ২০২১) ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা হচ্ছে গড়ে ৪৩৯। এর আগে গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ৩১৫। যেটা দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় এক নম্বরে উঠে এসেছিল ঢাকা। সে থেকে ক্রমাগত বায়ুদূষণের মাত্রা শুধু বাড়ছেই। যেটার সর্বশেষ পরিস্থিতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০-এর কাছাকাছি। এয়ার ভিজ্যুয়ালে’র একিউআই সূচকে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার প্রতি ঘণমিটার বাতাসে সুক্ষ ধূলিকনার (পিএম ২.৫) উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৩৭৯.৪ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে স্বাভাবিক দূষণের মাত্র ৫০ একিউআই। অথচ ঢাকার বাতাস তার চেয়ে ৫ গুণ বেশি দূষিত।

বাড়ছে দুর্ঘটনাঃ রাজধানীসহ সারাদেশে মোটরসাইকেল বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রমেই বেড়ে চলেছে সড়কের বিশৃঙ্খলা। রাস্তায় দ্বিচক্র এই যানটির উৎপাতও বেড়েছে। যানজট এড়াতে অনেকে যেমন মোটরসাইকেল কিনছেন, তেমনি রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আয় করতে মোটরসাইকেল কিনে রাস্তায় নামছেন তার চেয়ে বেশি। এদিকে যারা রাইড শেয়ারিং করছেন তাদের বড় অংশ এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। এসব চালকদের অধিকাংশের ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে বাইক চালানোর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই। সেই সঙ্গে থাকে যাত্রীকে দ্রুত গন্থব্যে পৌঁছে দিয়ে নতুন যাত্রী তোলার তাগিদ। এটা করতে গিয়ে সিগন্যাল অমান্য, উল্টো লেনে বাইক ঢুকিয়ে দেয়া, অলিগলি দিয়ে দ্রুত চালানোর পাশাপাশি যানজট এড়াতে মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন ফুটপাথে। লেন-বিধি ভেঙে যেখান-সেখান দিয়ে চলতে থাকা দ্বিচক্র এই যানটি ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খলার বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এমনকি সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার শীর্র্ষেও রয়েছে এই দ্বিচক্র এই যানটি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরবাইক দুর্ঘটনা শীর্ষে থাকার প্রধান কারণ হেলমেট ব্যবহার না করার প্রবণতা,  ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও বেপরোয়া ড্রাইভিং। আর অদক্ষ এবং লাইসেন্সবিহীন চালক তো আছেই। যাত্রীরা যানবাহনের নিশ্চয়তা পেতে মোটরসাইকেলে চেপে বসছে। কিন্তু একটি মহানগরীতে কী পরিমাণ গাড়ি চলবে এর সমীক্ষা থাকা দরকার। সমীক্ষা না থাকায় তাতে নিয়ন্ত্রণও নেই।


২০২০ সালে দেশে চার হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং সাত হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’ এ বলা হয়েছে। নিহত পাঁচ হাজার ৪৩১ জনের মধ্যে ৮৭১ জন নারী ও ৬৪৯ জন শিশু। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছর এক হাজার ৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৬৩ জন নিহত হয়েছেন। যা মোট নিহতের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। 

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতাল) অস্ত্রোপচারকক্ষের সামনের করিডরে গত শনিবার চিকিৎসাধীন ছিলেন ২৬ জন। প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, ১২ জনই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কে আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই এখন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলেছেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাগুলো মূলত ঘটে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা, বারবার লেন পরিবর্তন, ট্রাফিক আইন না মানা ও চলন্ত অবস্থায় মুঠোফোনে কথা বলার কারণে। হেলমেট ব্যবহার না করা ও নিম্নমানের হেলমেটের কারণে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতির কারণে পথচারীদেরও দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়। তেমনই একজন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম। গত শনিবার সন্ধ্যায় তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের পাশের ক্রিসেন্ট লেক এলাকায় হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। তিনি বলেন, রাস্তা পার হওয়ার সময় তাঁকে একটি বেপরোয়া মোটরসাইকেল ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় তাঁর ডান পা ভেঙেছে।

এভাবেই প্রতিনিয়ত মোটরসাইকেল বাড়াচ্ছে দূষণ, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। তাই এখনই সময় এই দ্বিচক্রী যান নিয়ন্ত্রণের সময় তা নাহলে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে যাবে। 

আগামীনিউজ/এএইচ

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের আরো খবর