Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

এনজিওদের ঋণের বেড়াজালে বস্তিবাসী


আগামী নিউজ | নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০২০, ০৬:২১ পিএম

ঢাকাঃ নগরায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পারিবারিক নির্যাতন, কাজের অভাব ও এনজিওদের চাপসহ নানা কারণে অনেক নারী ও শিশুসহ নিন্ম আয়ের মানুষেরা রাজধানীতে অভিবাসিত হচ্ছে। ময়মনসিংহের সকিনা বিবি নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতন ও এনজিও থেকে নেয়া ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে সংসার ছেড়েছে প্রায় দশ বছর আগে। বাবার সংসারে আর্থিক অনটন থাকায় এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে কাজের খোঁজে।রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নেয়। বুয়ার কাজ করে কোনো রকমে চলছিল কোহিনুর বেগমের। ২০১৫ সালে আগুনে ঘর পুরে গেলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন তিনি। পরে অনেক চেষ্টায় ঠাঁই হয় তেজকুনিপাড়া বস্তিতে। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে খুপরি ঘরগুলোতে ঠাসাঠাসি করে বাস করতে হয়।

রাজধানীর মগবাজার বস্তিতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বাস করে আসছে কুড়িগ্রামের সুফিয়া খাতুন। অনেক আগেই স্বামী মারা গেছে। স্বামীর যেটুকু ভিটামাটি ও ফসলি জমি ছিল সেটুকুও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তারপর সে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে আসে। মা-মেয়ে দু’জনই একটি গার্মেন্টসে কাজ নেয়। এক ঘরে তারা থাকে আটজন। ভাড়া দিতে হয় মাসে দুই হাজার টাকা। করোনায় কাজ হারানো সুফিয়া জানায়,  মা মেয়ের দুইজনেরই কাজ নেই। এর মাঝে বাসা ভাড়া দিতে না পেরে প্রায় উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল মালিক পরে অনেক কষ্টে এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোন মত বাসা ভাড়া দিয়ে ঠাই হয় এখানে। এখন বুয়ার কাজ করে সংসার চালাই। যা পাই তা দিয়ে কোন মত দুমুঠো ডালভাত হয় কিন্তু প্রতি সপ্তাহের ঋণের কিস্তি আমাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। কিস্তির টাকা দিতে না পারলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে এনজিও কর্মীরা।

সুফিয়ার মত এসব নারীরা কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে কেউবা স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে, কেউবা এনজিওদের থেকে ঋণ নিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে নানাবিধ অভাব-অনটানের কারণে জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহরমুখো হয়েছে তবে এখানে এসেও মুক্তি মেলেনি এনজিওদের ঋণের বেড়াজাল থেকে।

ঢাকাসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত শহরগুলোতে বস্তিতে বসবাস একটি পরিচিত দৃশ্য। কখনো আগুন লাগা বা বস্তি উচ্ছেদের মতো আকস্মিক ঘটনায় তারা বিপদে পড়ে যায়। গত এক দশকে রাজধানীর আগারগাঁও, কল্যাণপুর, তেজগাঁও, বেগুনবাড়ি, কড়াইল, মিরপুরসহ বিভিন্ন বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় বসবাস করার পর হঠাৎ এমন দুর্ঘটনায় অসহায় হয়ে পড়ে বস্তির ছিন্নমূল মানুষ। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খাদ্য, পানীয়জল ও কাজবিহীন অবস্থায় বস্তিবাসীকে দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়। ছোট ছোট শিশুদের অবস্থা হয় আরো ভয়াবহ। বস্তিবাসীদের অভাব নিত্যদিনের। আর অভাবের সুযোগ নেয় বিভিন্ন এনজিও গুলো। অভাবের কারণে ঋণ নিয়ে সাপ্তাহিক কিস্তির বেড়াজালে পড়ে যায় বস্তিবাসী। একদিকে এই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে গ্রাম ছেড়ে কোন মত ঠাই হয়েছে রাজধানীর এসব বস্তিতে আবার সেই মাকড়সার জালের মত ঋণের (উচ্চ সুদে) বেড়াজালেই আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এসব বস্তিবাসী। 

এনজিওদের বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কিছু বলতে নারাজ এসব বস্তিবাসী, কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন এনজিওদের নিয়ে কিছু বললে তারা এসে অকথ্য ভাষায় গালাগালিসহ একবারে সব ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বলবে এই ভয়ে। 

আজ বুধবার রাজধানীর তেজকুনিপাড়া বস্তিতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়,  পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস এখানে। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশ, অপ্রতুল পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা এবং অধিক ভাড়ার পাশাপাশি রয়েছে নানা দুরবস্থা । এখানে স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা নেই। বস্তিবাসীদের নানা সমস্যার পাশাপাশি উচ্ছেদ আতংকও কাজ করে। আর এনজিওদের ঋণের কিস্তির চাপ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বস্তির একজন বায়োজ্যেষ্ঠ বলেন, আমার জীবন কেটেছে রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে। অভাব যেন আমার জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী। কোন মত দুই সন্তান নিয়ে এখানে আছি। করোনায় ছেলেরা কাজ হারিয়েছে। এখন দিন মজুরের কাজ করে। যা পায় তা দিয়ে পেট চলে দুইবেলা। কিন্তু এনজিও থেকে যে ঋণ নিয়েছি সেই কিস্তি দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঋণ দেয়ার সময় তারা আমাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখায় কিন্ত এক কিস্তি দিতে না পারলে তাদের মুখের ভাষা বদলে যায়। এনজিও'র নাম উল্লেখ না করে এই বৃদ্ধ বলেন, এক জায়গা থেকে ঋণ নিয়েছিলাম সেটা দিতে না পেরে আর একটি এনজিও থেকে লোন নিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে। কিস্তি আমার পিছু ছাড়ছে না। 

রাজধানীতে বসবাস করা বস্তিবাসীদের নিজ নিজ গ্রামে পাঠিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্য শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশের গৃহহীনদের গৃহ নির্মান করে দিচ্ছেন। নির্মাণ শেষে তুলে দিচ্ছেন ঘরের চাবি এবং নগদ টাকা। এতে গৃহহীনদের মুখে ফুটেছে হাসি। 

প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। বস্তিবাসীদের গ্রামে পাঠিয়ে খাবার ও কাজের বন্দোবস্ত করার যে উদ্যোগের কথা তিনি জানিয়েছেন এই উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন অনেক বস্তীবাসী। তবে শঙ্কায়ও রয়েছেন অনেকে। ধার দেনা ও এনজিওদের ঋণ দিতে না পেরে যারা গ্রাম ছেড়েছিলেন তাদের ভয় আরও বেশি। গ্রামে ফিরলেই আবার সেই ঋণের কিস্তি। তবে বস্তিবাসীদের দাবি প্রধানমন্ত্রী আমাদের গ্রামে পাঠিয়ে খাবার ও কাজের বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি এসব এনজিওদের হাত থেকে যেন আমাদের পরিত্রাণ পাইয়ে দেয়। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরি দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যাপকভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি বদ্ধ পরিকর। কিন্ত তার এই মহৎ উদ্যোগ বরাবরই বাঁধা গ্রস্থ হবার কারণ হিসেবে সামনে এসেছে দারিদ্রবিমোচনের নামে বেনামে গড়ে ওঠা এসব এনজিওগুলো। 

করোনায় কাজ হারানো রাজধানীর বস্তিবাসী সব খুয়ে ফেলার কান্নার দাগ যেখানে নানাভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা সক্রিয়, সেই  বস্তিতেই আবার পূর্বে দেয়া ঋণের সুদসহ কিস্তি আদায়ের নামে শুরু হয়েছে এক বিভৎস মহড়া। বিপন্ন মৃতবৎ মানুষের উপর এ যেন শকুনের ঝাঁপিয়ে পড়ার গল্প। শত-হাজার কোটি টাকার মালিক প্রভাবশালী এনজিওগুলো হচ্ছে এ গল্পের শকুন। দরিদ্র মানুষকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করে তোলা এবং নানাভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতার শ্লোগানে মুখে ফেনা তুলতে তুলতে এসব এনজিওর অস্তিত্ব লাভ, বিকাশ ও সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটেছে। দেশ-বিদেশে নাম ফাটানো, পদক কামানোসহ কী না করেছে তারা! কিন্তু করোনায় কাজ হারানো মানুষগুলোর মধ্যে যারা তাদের কাছ থেকে পূর্বে ঋণ নিয়েছিল, তাদের ওপর এনজিওগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরা এমনভাবে চড়াও হয়েছে যা নব্য মহাজনী প্রথাকেও হার মানাবে। 

সুদের উচ্চ হার ও ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের নামে চিরস্থায়ী করা এসব এনজিও গুলোর জন্য কি বস্তিবাসীদের গ্রামে পাঠানোর যে কর্মসূচী প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন তা বাস্তবে রুপ দান করবে? বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ রইলো। 

আগামীনিউজ/এএইচ