Agaminews
Dr. Neem Hakim
Dr. Neem Hakim

পাখির গ্রাম বেলগাছি


আগামী নিউজ | সোহেল রানা ডালিম, জেলা প্রতিনিধি প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২০, ০৯:৩৩ এএম
পাখির গ্রাম বেলগাছি

আগামী নিউজ

চুয়াডাঙ্গা: জেলার পৌর শহরের মধ্যেই বেলগাছি গ্রাম। গ্রামটির তেমন কোনো অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য না থাকলেও বর্তমানে এ জেলাসহ পার্শবর্তী জেলার লোকজনও গ্রামটিকে এক নামেই চেনে, পাখির গ্রাম বেলগাছি। গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে বিভিন্ন গাছের ডালে বেধে রাখা হয়েছে অসংখ্য মাটির ভাঁড় বা ছোট কলস। আধা পাকা রস্তার দু’পাশের গাছসহ গ্রামের প্রতিটি গাছেই ভাঁড় আর বাঁশের ঝুড়ি টাঙিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের নিরাপদ বাসস্থান। এ সকল নিরাপদ আশ্রয়ের ফলে গ্রামটির মাঠ-ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা মেলে বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় প্রজাতির বিভন্ন ধরণের পাখি। আর প্রতিদিনই বিভিন্নস্থান থেকে পাখি দেখতে গ্রামটিতে আসছেন পাখি প্রেমিরা। কেউ কেউ তাদের সন্তানদেরও পাখি দেখাতে গ্রামটিতে নিয়ে আসছেন।

গাছে গাছে টাঙানো ভাঁড়ের সরু মুখ দিয়ে মাথা বের করে উঁকি দিচ্ছে রংবেরঙের পাখি। একটি ভাঁড়ের উপর আস্ত একটা গুইসাপ মাথা উঁচু করে কি যেনো দেখে পরক্ষণেই চলে গেলো ভাঁড়ের মধ্যে। আবার গাছের শরীর বেয়ে এদিক ওদিক লাফা-লাফিও করতে দেখো গেলো চ লা কাঠবিড়ালিকে। আবার বিলের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে বক এক পায়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে মাছের। পাখিদের অবাধ বিচরণসহ কিচির-মিচির ডাকাডাকি শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলেছিলো সারাক্ষণ।

তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চুয়াডাঙ্গা জেলার এই গ্রামটি কয়েক বছর আগেও এমন ছিলো না। বিভিন্ন ধরণের শিকারী ও চাষীদের অতিমাত্রাই কীটনাশক প্রয়োগে বিলুপ্তির পথে বসেছিলো দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরণের পাখি। ঠিক সেই সময় গ্রামের এক স্বপ্নবাজ যুবক বকতিয়ার হামিদ বিপুলসহ গ্রামের যুবসমাজ এগিয়ে এলেন পাখিদের রক্ষায়। বকতিয়ার হামিদ বিপুল নামেই পরিচিত বেশি। বিপুলসহ আর ৩৫জন যুবক মিলে ২০১১ সালে গড়ে তুললেন “বেলগাছি যুব সমাজ” নামের সংগঠন। সে সময় টিউশনির কিছু টাকা আর গ্রামের যুবসমাজের সহযোগিতায় শুরু হলো বেলগাছি গ্রামের প্রতিটা গাছে পাখিদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, ভাঁড় টাঙানোর কাজ। একই সাথে নিষিদ্ধ করা হয় পাখি শিকার। পরে গ্রাম জুড়ে দেওয়া হলো বিভিন্ন ধরণের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা আছে, আসো পাখিদের বন্ধু হয়। বেলগাছি গ্রাম পাখিদের নিরাপদ বাসস্থানসহ নানা ধরনের লেখা।

ফলে বছর না ঘুরতেই দলে দলে পাখিদের আনাগোনা বেড়ে গেলো। এখন গ্রামটিতে দলবেধে ওড়ে চড়–ই পাখি ও শালিকের ঝাঁক, আরও আছে ঘুঘু, প্যাঁচা, কোকিল, দোয়েল, কাক, বক, কুলঝুঁটি, কাঁটঠোকরা, পানকৌড়ি, ধলেশ্বর, শামুকভাঙ্গা, হাঁসপাখি, কাঁদাখোঁচা, চেগা, ডাহুক, কোড়াপাখি, বালিহাঁস, ময়না, টিয়া,শ্যামাসহ নাম না-জানা নানান রকম পাখি। সুধুইকি পাখি? কাঠবিড়ালি, হুতুমপেঁচা, গুইসাপসহ নানা রঙের খরগোশও আশ্রয় নিয়েছে গ্রামটিতে। তাছাড়াও শীতকালে অতিথী পাখিদের আনাগোনাও বেড়েছে অনেকটা।

বখতিয়ার হামিদসহ বেলগাছি যুবসমাজের পাখিদের রক্ষার চেষ্টাকে আরও সফল করে দেন চুয়াডাঙ্গার সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি সে সময় সবার সহযোগীতায় চুয়াডাঙ্গাকে পাখিদের অভয়ারণ্য ঘোষনা করেন। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপুও পৌর এলাকাকে পাখিদের অভয়ারণ্য ঘোষনা দিয়ে পৌর এলাকার গাছে গাছে পাখিদের নিরাপদ বাসস্থান ভাঁড় টাঙিয়ে দিচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গা বেলগাছি গ্রামের স্কুল শিক্ষক বকতিয়ার হামিদ বলেন, ছোট বেলায় দেখতাম গ্রামের পুকুর, বিল ও মাঠ-ঘাট থেকে পাখি শিকারিরা বন্দুক দিয়ে,ফাঁদ পেতে, গাছের ডালে আঠা দিয়ে, গুলটি দিয়ে নিরীহ পাখি শিকারের দৃষ্য। সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করি একদিন পাখি শিকার বন্ধ করাসহ বেলগাছিকে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলবো। দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফলে বর্তমানে পাখিদের অভয়ারণ্য বেলগাছি গ্রাম। তিনি আরও বলেন, পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে এক শ্রেণীর মানুষের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। এই কঠিন পথ চলাই পাশে পেয়েছেন বেলগাছি গ্রামের ‘যুব সমাজ’ নামের সংগঠনটি। যাদের একান্ত প্রচেষ্টায় পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে বেলগাছি গ্রাম।

কথা হয় বেলগাছি গ্রামের কয়েকজন কৃষকের সাথে, তারা বলেন, গ্রামের যুবকরা পাখি সংরখ্ষণ করার কারণে ক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকা মাকড় খাচ্ছে পাখিরা। কীটনাশক ব্যবহারও করতে হয় কম। 

চুয়াডাঙ্গার পৌর মেয়র জিপু চৌধুরী জানান, শিক্ষিত যুবকরা নিজেদেও অর্থ ও প্রচেষ্টায় বেলগাছি গ্রামকে পাখিদেও প্রিয় আবাস ভ’মিতে পরিণত করেছে। অবাধে পাকি শিকার বন্ধে নিয়েছে নানা উদ্যোগ। পাখিদের আনাগোনায় প্রাকৃতিক সোন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটা।

এখন প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে ব্যাচে ছাত্র পড়ানোর আগে সূর্য ওঠার পরপরই বেলগাছি যুবসমাজের বন্ধুদের নিয়ে পাখির বাসাগুলো দেখতে বের হন শিক্ষক বিপুল। আর বিকেলে ফসলে ভরা হলুদ-সবুজ মাঠে পাখিদের আনাগোনা কত বাড়ল তা দেখতেও তাঁরা বের হন সদলবলে।

আগামীনিউজ/মিথুন