Agaminews
Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

ডেঙ্গুজ্বরের সাত দিনের বিভীষিকা


আগামী নিউজ | ডাঃ ইসমাইল আজহারি  প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২১, ০৯:৩৬ পিএম
ডেঙ্গুজ্বরের সাত দিনের বিভীষিকা

ফাইল ছবি

ঢাকাঃ এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু জ্বর হয়, জ্বর শুরু হবার দিন কে Day-1 হিসাব করা হয়।

ডেঙ্গু জ্বর হলে প্রথম দিন থেকে জ্বর কেবল বাড়তেই থাকবে, ৪র্থ দিন পর্যন্ত জ্বর শুধু বাড়তেই থাকবে।  সাথে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা, চোখের পিছনে ব্যাথা, প্রচন্ড বমি বমি ভাব, আর বমি হয়, খাবার রুচি একবারি কমে যায়।

জ্বর শুরু হবার ৪র্থ দিনে >৯০% রোগীর জ্বর ভালো হয়ে  যায়, 

৪র্থ দিন শেষ হলেই শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ সময় :

জ্বর শুরু হবার পর থেকে নিয়ে ৫ম ও ৬ষ্ট এ দুই দিন ডেঙ্গু রোগীর জন্য কিছুটা ঝুকিপূর্ণ দিন। এই দুই দিন রক্তের অণুচক্রিকা তথা #প্ল্যাটিলেট কাউন্ট পর্যায়াক্রমে কমে যায়, 

সাধারণত নরমাল প্ল্যাটিলেট কাউন্ট থাকে 

১.৫০.০০০ থেকে ৪ লাখ /Cmm of blood. 

৫ম দিন প্ল্যাটিলেট কাউন্ট দেড় লাখের নিছে চলে যাবে,

৬ষ্ট দিন ৫ম দিনের চেয়েও কমে যাবে।

৭ম দিন সকালে আরো কমে যাবে।

ফলশ্রুতিতে শরীরের অভ্যন্তরীণ  ব্লিডিং হতে পারে, 

আবার কারো কারো ক্ষেত্রে ব্লাড ভেসেল থেকে  প্লাজমা লিক হয়ে ব্লাড প্রেশার কমে গিয়ে রোগী শকে চলে  যেতে পারে।

সপ্তম দিন শেষে ৯০% রোগীর প্ল্যাটিলেট  কাউন্ট বেড়ে যাবে। আর প্ল্যাটিলেট কাউন্ট একবার যদি বাড়তে থাকে, তাহলে এইটা বাড়তেই থাকবে। আর কমবেনা।

ডেঙ্গুতে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট কম দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নাই, ৬ষ্ঠ  দিন কিংবা ৭ম দিন সকালে যদি প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারও হয়ে যায়, তাহলেও ভয়ের কোনো কারণ নাই,  যদি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো ব্লিডিং  না থাকে.

ব্লিডিং কয়েক ভাবে বুঝা যেতে পারেঃ

১. বমি বা কাশির সাথে রক্ত যাওয়া

2..নাক দিয়ে রক্ত যাওয়া

3. প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া

4. শরীরে চামড়ার নিছে রক্ত জমে যাওয়া, ফলশ্রুতিতে লাল লাল র‍্যাশ দেখা দিতে পারে

5. কালো রঙ এর পায়খানা হওয়া।

ডেংগু তে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট কমে গিয়ে এমন জটিলতা শতকরা ২-১ জন এর হতে পারে 

তাহলে ৭ম দিন সকালে CBC রিপোর্টে  প্ল্যাটিলেট কাউন কম দেখে ব্লাড ট্রান্সফিউশন করা এতটা গুরুত্ব বহন করেনা।

কারণ সপ্তম দিন সকালে যদিও প্ল্যাটিলেট কম থাকে, তথাপি ৭ম দিন সন্ধ্যায় কিংবা ৮ম দিন সকালে  যদি আবার CBC  পরীক্ষা করা হয়, তবে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট  বাড়বে। 

তাই ভাইটাল সাইন তথা ব্লাড প্রেশার, পালস, ইত্যাদি যদি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে শুধু প্ল্যাটিলেট কাউন্ট কম দেখে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করার কোনো দরকার নাই, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্লিডিং না হয়, ততক্ষণ ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নাই, শুধু পেশেন্ট কে CBC রিপিট করতে বললেই হবে। তবে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজার থেকে কমে গেলে কিছু রিসার্চে প্ল্যাটিলেট ট্রান্সফিউশন অথবা ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর কথা বলেছেন ঝুকি এড়ানোর জন্য।

ডেঙ্গু জ্বরে Day 5- day 6 এ ব্লাড ভেসেল থেকে প্লাজমা লিক হয়ে কিংবা কেউ যদি শিরাপথে  বেশি বেশি  ফ্লুইড দিতে থাকে, তাহলে ফ্লুইড ওভার লোড হয়ে  অ্যাসাইটিস হয়ে যেতে পারে,  তখন পেশেন্ট বলবে যে, তার পেট ব্যাথা করে।

অ্যাসাইটিস হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য আল্টাসনোগ্রাম করা যেতে পারে।

আবার কারো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফ্লুইড কিংবা লিকেজ হওয়া প্লাজমা  প্লুরাল স্পেসে গিয়ে plueral effusion হতে পারে, পেশেন্ট বলবে, বুক চাপচাপ লাগে, কিংবা বুক ব্যাথা সাথে কাশিও হতে পারে।

এই ক্ষেত্রেও ভয়ের কোনো দরকার নাই যদি হেমাটোক্রিট আর ব্লাড প্রেশার নরমাল থাকে। কারণ ৭ম দিন শেষ পেশেন্ট রিকভারি স্টেজে চলে যাবে।

তথা রোগী সুস্থতা লাভ করবে।

ডেংগুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা।   আর ফ্লুইড ইনটেক আর আউটপুট চেক করা।পেশেন্ট যেনো শকে না যায়, সেই দিকে খেয়াল করা। 

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা ঘরেই করা সম্ভব যদি কোনো ঝুকিপূর্ণ উপসর্গ না থাকে।

ঝুকিপূর্ণ উপসর্গ হচ্ছেঃ

১. পেট ব্যাথা হওয়া

২.কালো পায়খানা হওয়া

৩. নাক কিংবা মুখ দিয়ে রক্তপাত হওয়া

৪.ব্লাড প্রেশার কমে যাওয়া

৫. ৬ ঘন্টার বেশি প্রস্রাব না হওয়া

৬.শ্বাসকষ্ট হওয়া কিংবা বুকে ব্যাথা হওয়া

৭.মুখে একবারি কোনো কিছু খেতে না পারা।

যদি এইসব উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে রোগীকে হসপিটাল ভর্তি করে চিকিৎসা করাবে, অন্যথায় ঘরেই চিকিৎসা সম্ভব, জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল আর পর্যাপ্ত  পরিমান তরল খাবার গ্রহণ। যথা ওরস্যালাইন,  ডাবের পানি, জুস ইত্যাদি খাওয়া।

আর একটা কথা মনে রাখা চাই, ডেঙ্গু জ্বরে শরীর একবারি দূর্বল থাকে, জ্বর ভালো হয়ে যাবার পরেও ২১ দিন পর্যন্ত শরীর অত্যান্ত দূর্বল থাকে। এই সময় প্রচুর তরল খাবার, 

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, দুধ ডিম, মাছ ও ফলমূল বেশি বেশি খাওয়া দরকার। সাথে প্রতিদিন ২-৩ প্যাকেট করে ওরস্যালাইন খাবে।এতে করে দূর্বলতা কাটবে।

আসুন, ডেংগুতে আতংকিত না হই,

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিই।

[লেখকঃ চিকিৎসক - ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাঁসপাতাল। সিইও- সেন্টার ফর ক্লিনিক্যাল এক্সিলেন্স এন্ড রিসার্চ]