Agaminews
Dr. Neem Hakim

দৃষ্টির আড়ালে অপার সম্ভাবনা


আগামী নিউজ | ডেস্ক রিপোর্ট প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২১, ১১:৫৬ পিএম
দৃষ্টির আড়ালে অপার সম্ভাবনা

ছবি; সংগৃহীত

ঢাকাঃ প্লাস্টিক শিল্প এখন একটি সম্ভাবনার নাম। সাশ্রয়ী, সহজ ব্যবহারযোগ্য, কম ঝুঁকি, ডিজাইন, টেকসই, দৃষ্টি নান্দনিকতার কারণে আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গী হয়ে বিশ্বে প্লাস্টিক সামগ্রী বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দৈনন্দিন জীবনে চলতে যা যা লাগে, তার সবকিছু তৈরির পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্টও তৈরি হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে আসবাবপত্র থেকে অটোমোবাইল, মেডিসিন কিংবা রপ্তানিমুখী শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ-এমন কোনো খাত নেই যেখানে ব্যবহার নেই প্লাস্টিকের। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন প্লাস্টিক পণ্যের চাহিদা। বড় অঙ্কের এই চাহিদা পূরণে ছোট পরিসরে হলেও এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের প্লাস্টিক খাত। তৈরি হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যালের সব ধরনের প্রোডাক্ট। সিরিঞ্জ থেকে ক্যাপসুল কভার তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক দিয়ে। ফুড প্যাকেজিংয়ের প্রায় সবই প্লাস্টিকের তৈরি। প্লাস্টিক পণ্যের বৈচিত্র্যময় উৎপাদনে বিশাল স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। কেননা এক সময়ের আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের প্রায় সবই এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। প্লাস্টিক খাত থেকে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হচ্ছে। রপ্তানি বা স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রেডিমেড গার্মেন্টের পরেই এই ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা। বলা হচ্ছে কয়েকটি সমস্যার সমাধান হলে এ শিল্প আগামী এক দশকে দ্বিতীয় একক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।


সংশ্লিষ্টদের অভিমত, পর্যাপ্ত সরকারি সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা পেলে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের পরই প্লাস্টিক শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে গড়ে ওঠার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক শিল্পের অবস্থান সুরক্ষা করতে প্রয়োজন এই শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

উন্নত বাংলাদেশের রূপকল্পে বলা হয়েছে-ধারাবাহিকভাবে এ খাতে ১৫ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। ২০২২ সালের আগেই এই খাতের ব্যবসা উদ্যোগ ক্ষেত্রে সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা। প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। আর ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। ২০২৬ সালের মধ্যে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। ১০ হাজার জনকে চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা। ২০২৬ সালের মধ্যে মোট জিডিপিতে প্লাস্টিকের অবদান ন্যূনতম ২ শতাংশ বৃদ্ধি করা।

দৃষ্টির আড়ালে সম্ভাবনার ক্ষেত্র

আমরা যারা ব্যবহারের পর প্লাস্টিক বোতল রাস্তায় কিংবা ড্রেনে ফেলে দিই তারা কখনো ভেবেও দেখি না যে এসব সামগ্রীও মূল্যবান। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির তালিকায় প্লাস্টিক একটি পৃথক শিল্প খাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। 

দেখা গেছে, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল, কোমল পানির বোতল, ওষুধের কৌটাসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক সামগ্রী এখন টোকাইদের নিকট আয় রোজগারের প্রধান অবলম্বন। এ কারণেই হয়তোবা এই শিল্পটির সম্ভাবনা অনেকের দৃষ্টির আড়ালে। কিন্তু এই সাধারণ কাজটির গুরুত্ব আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অসাধারণ ভূমিকায় অবতীর্ণ। বাংলাদেশ প্রতি বছর পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী রপ্তানি করে আয় করছে কোটি কোটি টাকা।

দি ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসক্যাপ) প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি নয়, রি-সাইকিংয়ে সম্ভাবনা রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বছরে এ খাত থেকে রপ্তানির মাধ্যমে বড় অঙ্কের আয় হচ্ছে। দেশে প্লাস্টিক শিল্পে ৮শ কারখানা এবং ৭৫টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জানা গেছে, বাতিল সামগ্রী ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট স্থান থেকে এনে রপ্তানি করতে পারলে এ খাতের আয় বছরে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে প্রতিদিন ১৩০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর ৭০ শতাংশ (প্রায় ৯০ টন) রিসাইকেল হয়ে নতুন পণ্য হিসেবে বাজারে ফিরে আসছে। রিসাইক্লিংয়ের ফলে বর্তমানে প্রতি বছর ডিসিসি এলাকায় ০.৫ কোটি ১০ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে প্লাস্টিক আমদানি হ্রাস পাওয়া ছাড়াও মহানগরীতে ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করার ফলে  প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রতি বছর ৩ কেটি ৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিং দুই-তৃতীয়াংশ জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশদূষণ এবং পানি ব্যবহার প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস করেছে।

হতে পারে নতুন শিল্প

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চীনের আমদানিকারকরা এসব বাতিল প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করে সিনথেটিক সুতা উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে আরো কয়েকগুণ বেশি মূল্য সংযোজনপূর্বক বিদেশে রপ্তানি করছে। দেশে বাতিল প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহারের কারখানা স্থাপন করে কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি বিকল্প সিনথেটিক ফাইবার উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সিটি করপোরেশন বিদেশের মতো রাস্তাঘাটে পৃথক পৃথক ডাস্টবিন তৈরি করে দিলে পথচারীরা পানি বা কোমল পানি খেয়ে এসব বোতল সেখানে ফেলতে পারে। কর্তৃপক্ষ এসব পণ্য প্রসেস করে নিজেরাই সিটি করপোরেশনের জন্য আয়ের একটি পথ করে নিতে পারে। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে। সেইসাথে রাস্তাঘাটও পরিষ্কার থাকে।

শিল্পের গোড়াপত্তন যেখান থেকে 

এ শিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সাল থেকে প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। এ শিল্পের প্রায় ৯৯ শতাংশই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থিত। এর মধ্যে প্লাস্টিক কারখানার ৮০ ভাগই পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ ৫০০০ প্লাস্টিক কারখানার ৮০ ভাগই পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশে বেশ কিছু করপোরেট হাউস  যেমন আরএফএল, বেঙ্গল, গাজী বিআরবি, বসুন্ধরা, ন্যাশনাল প্রভৃতি কোম্পানিসহ অসংখ্য ছোটখাটো প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।  দেশের আনাচে-কানাচে এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলো এ শিল্পের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলছে।

দেশীয় চাহিদা-দেশের বাজার

এক তথ্যে দেখা যায়, প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শতকরা ৬৫ ভাগই ঢাকায় অবস্থিত। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২০ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ১০ শতাংশ ও বাকিগুলো খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়া ও রাজশাহীতে অবস্থিত। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) তথ্য উপাত্তে জানা যায়, বর্তমানে দেশে পাঁচ হাজার ৫২টি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৫০০টি ছোট, মাঝারি এক হাজার ৫০০টি ও বড় মাপের ৫২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০০টি প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের, ২০টি সরাসরি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও উভয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০টি।

চাহিদায় বাড়ছে সৃজনশীল উৎপাদন

প্লাস্টিক সামগ্রী এখন  মানবজীবনের নানা অনুষঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাপক হারে ব্যবহার এবং জনপ্রিয়তা বাড়ছে।  চাহিদার আলোকে তৈরি হচ্ছে পলি ব্যাগ, হাঙার, ফার্নিচার, গৃহস্থালি সামগ্রী,  খেলনা, শো পিস, দরজা-জানালা, চিকিৎসার সামগ্রী, ওষুধ, তেলের কন্টেইনার, রক্তের ব্যাগ, ইনজেকশন সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ, কৃষি যন্ত্রপাতি, পানির ট্যাংক, পাইপ গাড়ি ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ, পোলট্রি ও মৎস্য, গবাদিপশু খামারের পট, জার, জাল, বল, মাছ ও ডিম রাখার ঝুড়ি, মুরগির ঝুড়ি, ভিডিও ক্যাসেট, কম্পিউটার প্রভৃতি। অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই, প্লাস্টিক সামগ্রী দিয়ে এখন দেশে কাঠের বিকল্প ফার্নিচার, টেবিল-চেয়ার থেকে শুরু করে গৃহসামগ্রী উৎপাদিত হচ্ছে। আরেকটি আশার কথা হলো, পৃথিবীব্যাপী কৃষি জমির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, গ্রিন হাউস নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষিতে ক্ষেত্রেও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে প্লাস্টিক শিল্পের। এর মধ্যে রয়েছে সেচ পাইপ, পলিথিন, ড্রামসিডার প্যাকেজিংসহ অনেক কিছুই।  গ্যাস লাইনে লোহার পরিবর্তে প্লাস্টিক পাইপের ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।


আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে কৃত্রিম হূদযন্ত্র থেকে জীবন রক্ষাকারী অনেক পণ্যই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। প্লাস্টিক ব্যবসায়ীদের গুণগতমান বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে দেশে তৈরি গার্মেন্ট এক্সেসরিজ ব্যবহার শুরু হয়েছে। আর এই চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে গার্মেন্ট এক্সেসরিজ উৎপাদনকারীরা বছরে দুই লাখ টনের ওপর কাঁচামাল আমদানি করছে।

অভিজ্ঞমহলের মতে, সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রাম বন্দরে পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা যেতে পারে। আমরা নিজেরা যদি কাঁচামাল উৎপাদন করতে পারি তবে একদিকে আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে, পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমবে। কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অবারিত রপ্তানি বাজারের হাতছানি

বিশ্বে প্লাস্টিকের সম্ভাবনা নতুন কিছু নয়। দিনে দিনে নিত্যপ্রয়োজনীয় তালিকায় শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে শিল্পটি। বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পও পিছিয়ে নেই। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর গত অর্থবছর (২০১৮-১৯) ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে পরিবেশদূষণকারী হিসেবে পরিচিত প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল অন্তত শতকোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্লাস্টিক রপ্তানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশ থেকে প্লাস্টিক পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। কারণ প্রতি বছর রপ্তানি বাড়ছে। প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি দেশের অর্থনীতি এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। প্লাস্টিক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। পোশাক ও খাদ্যপণ্যের পরেই এ শিল্পের অবস্থান। জানা গেছে, বিশ্বের ৫৭টি দেশে প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মালয়েশিয়ায়। এর বাইরে সার্কভুক্ত দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়। বর্তমানে বছরে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ বিলিয়নের পর্যায়ে েঁপঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) মতে, প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রপ্তানিতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার প্লাস্টিক রপ্তানি হয়। গার্মেন্ট এক্সেসরিজ হিসেবে হ্যাঙ্গার, বোতাম, পলিব্যাগ, ফিল্ম ব্যাগ, ক্লিপ ইত্যাদি প্রধানত আমেরিকা, কানাডা ও রাশিয়ায় বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার ওপর প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ওপর প্লাস্টিকের খেলনা, ফার্নিচার, ক্রোকারিজ সামগ্রী সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্লাস্টিক পণ্য অন্যান্য পণ্যের সহজাত পণ্য হিসেবে রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৩ সালে সামগ্রিক রপ্তানি ৩৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও সরাসরি রপ্তানি হয়েছে ৮৫ মিলিয়ন ডলার। এখন পোশাক কেনা বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ড কিছু কিছু প্লাস্টিক পণ্যও কিনছেন বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পণ্য বহুমুখীকরণসহ সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা দিলে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় ২০২১ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে প্লাস্টিক পণ্য। এখন প্লাস্টিক শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজারও বেশ বড় হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। এসব দেশে প্লাস্টিক রপ্তানির দিকে বেশি নজর দিলে এ শিল্পের সম্ভাবনা আরো অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

বিপুল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা 

প্লাস্টিক শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ। শিল্পটি শ্রমঘন হওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবহারের ক্ষেত্র বৃদ্ধির সাথে সাথে যোগ হচ্ছে উৎপাদনের নতুন নতুন মাত্রা। ফলে বাড়ছে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এ শিল্পের উৎপাদন, রপ্তানি প্রক্রিয়া, বিপণন ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ খাত থেকে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আদায় হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে সাড়ে পাঁচ হাজার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মানুষের। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখের বেশি জনশক্তি এ শিল্পের সাথে জড়িত। এ শিল্পে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। শিল্প যত বিকাশ হবে তত আমাদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশের বিপুল বেকার সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশি সরকার ও বিনিয়োগকারীদের এ বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও পরিকল্পনার সুযোগ এসেছে। প্রয়োজনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে এ শিল্পকে বিকাশের সহায়তা করা যেতে পারে। বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির সাথে যৌথ অংশীদারি ভিত্তিতে ও নমনীয়তার মনোভাব দেখানো যেতে পারে। তবে কয়েকটি সমস্যার সমাধান হলে এ শিল্প আগামী এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় একক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে স্থান করে নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা

প্লাস্টিক শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এ খাতের প্রসারের মাধ্যমে রপ্তানি আয়কে যেমন আরো বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। ব্যাপক জনগোষ্টির কর্মসংস্থানও সম্ভব। এজন্য চাই সরকারের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্লাস্টিক শিল্পোদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণের মাধ্যমে মূলধনের জোগান, প্লাস্টিক পণ্যের পরিবেশগত স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণসহ যে সমস্যাগুলো বিদ্যমান, তা দূর করার যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে এ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়বে; সেইসঙ্গে বাড়বে রপ্তানি আয়। এগিয়ে যাবে দেশ। তৈরি হবে শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত। বাংলাদেশে প্লাস্টিক রপ্তানি একটি বড় শিল্প খাত হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিকের মতো সম্ভাবনাময় শিল্পের দিকে আরো বেশি নজর দিতে হবে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অবরোধে অন্যান্য খাতের মতো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে প্লাস্টিক খাত। অবরোধ হরতালে দৈনিক ১২ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদন কম হচ্ছে। আরো ভাবনার বিষয় হলো-এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংযোগ শিল্পের উন্নতি না হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে না। ছোট কারখানাগুলো বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত হতে পারছে না। বিশ্ববাজারে অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অকাঠামো খাতের সমস্যা, কাঁচামালের আমদানি নির্ভরতা, দক্ষ জনশক্তির অভাব, প্লাস্টিক পল্লী ও ইনস্টিটিউট না থাকার কারণে প্লাস্টিক শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। অভিজ্ঞমহলের মতে, এ শিল্পের বিকাশে খাতভিত্তিক নীতিসহায়তা, প্রযুক্তির উন্নতি, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি ও সার্বিক সহায়তা পেলে প্লাস্টিক খাত থেকে ১০০০ কোটি টাকার উপর আয় করা সম্ভব। শ্রমঘন খাত হিসেবে প্লাস্টিক শিল্পের উন্নয়নে সরকারকে নীতি সহায়তা বাড়ানোর কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরাও।

পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক পণ্যের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে পুনরায় তা ব্যবহার উপযোগী করার প্রক্রিয়া জোরদারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের। বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। সরকারি কোষাগারে প্রতি বছর ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব জমা হয়। এ ছাড়া প্লাস্টিক সামগ্রীর ৫৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অর্জন ০.৬%। দেশে ক্রমেই বাড়ছে প্লাস্টিক পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৩শ কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য। তাই প্লাস্টিক খাতকে আরো এগিয়ে নিতে বাজেটে যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড় চান উদ্যোক্তারা। একইসাথে নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিকের তৈজসপত্রে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিও তাদের।

আগামীনিউজ/এএইচ