Agaminews
Dr. Neem Hakim

অতি ধনীর দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ


আগামী নিউজ | ডেস্ক রিপোর্ট প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২১, ০৭:২৫ পিএম
অতি ধনীর দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাঃ কোভিডে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেলেও থেমে নেই অতিধনী হওয়ার দৌড়। মহামারির মধ্যেও বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা। গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে এক কোটি থেকে ৫০ কোটির বেশি টাকা আমানত আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। শুধু তাই নয়, অতি ধনীর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে চীন, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশেকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অতি ধনীর বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেও এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

২০১৮ সালে সম্পদশালী বৃদ্ধির হার ও ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রক্ষেপণ ধরে ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদনে বলা ছিল, তিন কোটি ডলার বা আড়াইশ’ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। ওয়েলথ-এক্সের হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ মোট ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি।

১০ লাখ থেকে তিন কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিককে (সাড়ে আট কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকা) এ তালিকায় রেখেছে ওয়েলথ-এক্স। প্রতিষ্ঠানটি তাদের উচ্চ সম্পদশালী বা হাই নেট ওর্থ (এইচএনডব্লিউ) বলে অভিহিত করেছে। ওই প্রতিবেদনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধনী বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকবে, এমন ১০টি দেশের নাম উল্লেখ করা হয়। এ তালিকায় শীর্ষে নাইজেরিয়া; এর পরের অবস্থানে মিসর। বাংলাদেশের পরে আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, পোল্যান্ড, চীন, কেনিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও ইউক্রেন।

ওয়েলথ এক্স মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ইনসাইট ভেঞ্চার পার্টনারসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, সম্পদশালীদের সংখ্যা বের করতে তারা সম্পদ ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ বা ওয়েলথ অ্যান্ড ইনভেস্টেবল অ্যাসেটস মডেল নামের একটি কৌশল ব্যবহার করেছেন। সংস্থাটি বলছে, তাদের কাছে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার অতি ধনীর তথ্য রয়েছে। সেটা তারা প্রতিবেদনে ব্যবহার করেছেন। ধনীর সংখ্যার দিক দিয়ে শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (৮৬ লাখ ৭৭ হাজার), চীন (১৮ লাখ ৮০ হাজার), জাপান (১৬ লাখ ১৯ হাজার), জার্মানি (১০ লাখ ২৩ হাজার) ও যুক্তরাজ্য আট লাখ ৯৪ হাজার। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইতালি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের মার্চে যখন দেশে মহামারি করোনার আর্বিভাব হয়, তখন ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫টি। গত সেপ্টেম্বররের শেষে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৪৮৮টি। অর্থাৎ, ছয় মাসে (১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাতে কোটি টাকা আমানত রাখা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে চার হাজার ৮৬৩টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ৮৭ হাজার ৪৮৮টির মধ্যে ব্যক্তি অ্যাকাউন্টও যেমন রয়েছে, তেমনই প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টের পেছনে কোনো না কোনো ব্যক্তি রয়েছেন। তারা বলছেন, ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আছে এমন আমানতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানেই দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে।

সেপ্টেম্বর শেষে এসব অ্যাকাউন্টের প্রায় পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এই অর্থ মোট আমানতের ৪২ দশমিক দুই শতাংশ। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক আমানতের মোট পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত ‘নির্ধারিত প্রান্তিকে ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত’ (জুলাই- সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এদিকে, ৫০ কোটি ও তার চেয়ে বেশি টাকা আছে এমন আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা এই ছয় মাসে বেড়েছে ৬৯টি। সেপ্টেম্বর শেষে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩০৩টি। এগুলোতে আমানতের পরিমাণ এক লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট আমানতের ১৪.৫৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও মনে করেন, ব্যাংকে কোটি টাকার আমানতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানেই দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে।

তিনি বলেন, নামে অথবা প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার ওপরে আমানত রাখা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়া মানেই কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। তিনি বলেন, দেশের কোটি কোটি লোক নিঃস্ব হয়েছে বলেই করোনাকালেও প্রায় হাজার মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক থেকে লুট করা একটি শ্রেণি কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। আবার তারাই হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখছেন। তার মতে, করোনাকালে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। কিন্তু বড় লোক বা ধনীদের আয় বেড়েছে। ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারী বেড়ে যাওয়া তারই প্রমাণ।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ যে বিশ্ব সেরা, বৈশ্বিক এমন রিপোর্টের প্রতিফলনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে উঠে আসছে। কোটিপতি বৃদ্ধির সঙ্গে করোনার কোভিডের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন না তিনি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় এখন কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতের সংখ্যা বেড়েছে এক হাজার ৪৫১টি। আর গত মার্চ থেকে জুন ওই তিন মাসে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে তিন হাজার ৪১২ জন।

এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) করোনাকালীন আয়, ব্যয় ও বেকারত্বের প্রভাব তুলে ধরে বলেছে, করোনায় মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। করোনার আগে গত মার্চ মাসে প্রতি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪৯২ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে পরিবার প্রতি আয় কমেছে প্রায় চার হাজার টাকা। আর জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে জানানো হয়, কোভিড-১৯-এর কারণে আয় কমেছে শতকরা ৭২ দশমিক ছয় শতাংশ পরিবারের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সেসব পরিবার, যাদের বছরে আয় এক লাখ টাকার কম।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে কোটিপতি আমানতকারী বেড়েছে সাত হাজার ৭১১ জন। এর মধ্যে করোনাকালের ছয় মাসেই বেড়েছে চার হাজার ৮৬৩। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৭৯ হাজার ৮৭৭ জন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বিগত ১২ বছর ধরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৯ সালের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৪৯২ জন। এখন এই সংখ্যা ৮৭ হাজার ৪৮৮ জন। অর্থাৎ গত ১২ বছরে ৬৫ হাজার ৯৯৬ ব্যাংকের গ্রাহক কোটিপতির তালিকায় নতুন করে নাম লিখিয়েছেন।

অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন মাত্র পাঁচ জন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়ায়। ১৯৮০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ জনে। এরশাদ সরকারের পতনের সময় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৯৪৩ জন। ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতি ছিলেন দুই হাজার ৫৯৪ জন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ১৬২ জনে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৮৮৭ জনে। ২০০৮ সালে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারী গ্রাহক ছিলেন ১৯ হাজার ১৬৩ জন। আর বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮৭ হাজার।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৪ শতাংশ। এখন তা ২০ থেকে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, আয় বাড়ছে, এটি একদিকে ভালো খবর। তবে কোটিপতি বা আয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয়-বৈষম্যও যে বাড়ছে, এটি একটি খারাপ দিক বলে মনে করেন তিনি।

আগামীনিউজ/এএইচ