Dr. Neem
Dr. Neem Hakim

করোনার থাবায় অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প


আগামী নিউজ | শামীম হোসেন সামন, নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০২১, ০৪:৩৪ পিএম
করোনার থাবায় অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প

ছবি : আগামী নিউজ

ঢাকাঃ বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারনে ঢাকার নবাবগঞ্জের তাঁতশিল্পীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। টানা লকডাউনের কারনে লুঙ্গি সহ তাঁতের বিভিন্ন পন্য হাঁট বাজারে বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন তারা। একসময় বাপ দাদা পেশায় কোনরকম জীবপযাপন করলেও করোনা ভাইরাসের কারনে দুর্দিনে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে তাদের। এছাড়াও সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের মতো উৎপাদনও করতে পারছেন। দিন দিন বাপ দাদার পেশা ছেড়ে অনেকেই অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রবাসেও পাড়ি জমাচ্ছে। করোনা মহামারী আর লকডাউন যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে তাঁতশিল্পীদেও জন্য। অন্য কোনো কাজ জানা না থাকায় অতিকষ্টেই বাপ দাদার এ পেশা আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।  

উপজেলার বারুয়াখালী, শিকারীপাড়া ও জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে অনেক পরিবার তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে অনেকেই তাঁতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কালের বিবর্তনে তাঁতশিল্পের সেই ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই এ পেশা ছেড়েছেন। কেউ তাঁতের কাজ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে। অল্প কিছু পরিবার এখনো বাপ দাদার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর কাঁচামালের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে এখন গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। ন্যায্যমূল্য না থাকায় অনেক তাঁতি ই এখন তাঁতের কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছে। তবে এখনো জীবিকার তাগিদে পূর্বপুরুষের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রণোদনার আশায় বাপ দাদার পেশাকেই ধরে রাখতে চান নবাবগঞ্জের প্রায় শতাধিক তাঁতি পরিবার।

হাসান আলী। বসবাস ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের শংকরদিয়া গ্রামে। অল্প শিক্ষিত হওয়ায় তেমন কোনো কাজেও যেতে পারেননি। বাপ দাদার পেশা তাঁতি। আর তিনিও ১৯৯৮ সাল থেকে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত। বাপ দাদার পেশায় কোনরকম জীবনযাপন করছেন। হঠাৎ করে করোনার থাবায় থমকে গেছে জীবন। তাঁত শিল্পকে ঘিরে একসময়ের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে। অন্য কোন কাজ জানা নেই বলে বাধ্য হয়েই বাপ দাদার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। তবে করোনা পরিস্থিতিতে ভালো নেই তিনিও।

শংকরদিয়া গ্রামের তাঁতশিল্পী লিটন হোসেন বলেন, ‘আমাগো খবর কে নেয়। তাঁতের কামে কি এহন আর ট্যাহা আছে। একখান লঙ্গি কত ট্যাহা খরচ কইরা বানাই। যেম দামে বেচি তাতে নিজের মুজুরিই উটে না। খালি হুনি মাইস্যে কত কিছু পায়। আমরা তো গরিব মানুষ। কয়ডা মাস অইলো এহনও কোন সরকারি কিছুই পাইলাম না। এই দিকে তাঁতের কাম কাইজ কম। যা কামাই করি তা দিয়ে পেটই চলে না। কেমন্যে বাচুম। সরকারে আমাগো একটু সাহাইজ্য করলে আমরা পোলাপান নিয়া বাচতাম’।

৪৫ বছর বয়সী নান্নু মিয়া। দুই যুগ ধরে তাঁতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। করোনার কারনে গত কয়েক মাস ধরেই অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছেন। বাপ দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলেও এখন পড়েছেন বিপাকে। পরিবার পরিজন নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় কাটচ্ছেন তিনি।

নান্নু মিয়া, লিটন হোসেন, হাসান আলীর মতো অনেকেই পূর্বপুরুষের পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে করোনায় কালো থাবায় থমকে গেছে জীবন। আর কাঁচা মালের অভাব, ন্যায্য দাম না পাওয়া আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন এ শিল্প অস্তিত্বের সংকটে পড়েছেন। এ শিল্পের সাথে জড়িতরা অনেকেই বাপ দাদার পেশাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। তবে বিপাকে পড়েছেন এ পেশায় জড়িত প্রায় শতাধিক তাঁত শিল্পী। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে বলে মনে করেন তাঁতশিল্পীরা।