থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজির শব্দে কাঁপছিল উমায়ের, পরদিনই মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক জানুয়ারি ৪, ২০২২, ১০:৩১ এএম
তানজিম উমায়ের। ছবিঃ বাবার ফেসবুক

ঢাকাঃ খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে থার্টি ফার্স্ট নাইটে অনেকের ফোটানো পটকা ও আতশবাজির তীব্র শব্দে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এক শিশু মারা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাড়ে চার মাস বয়সী ওই শিশুর নাম তানজিম উমায়ের। সে জন্ম থেকেই হৃদরোগে ভুগছিল।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শিশুটির বাবা ইউসুফ রায়হান অভিযোগ করেছেন, ‘খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদযাপনে রাজধানীজুড়ে যে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো হয়েছে, সেই শব্দে তার অসুস্থ ছেলে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। পরদিন তাকে হাসপাতালে নিলে সে মারা যায়।’

ইউসুফ রায়হান একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ‘মোহাম্মদী টেলিকম’ নামে তার একটি দোকান রয়েছে। ফেসবুকে দেওয়া তার আবেগঘন স্ট্যাটাসটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। তার সেই স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্যের ঘরে আতশবাজির তীব্র সমালোচনা করেন অনেকে।

থার্টি ফাস্ট নাইটে রাজধানীজুড়ে টানা বিকট শব্দে তার ছেলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কান্না শুরু করে এবং সে ভয়ে কাঁপতে থাকে বলে তার বাবা অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, 'আমার ছেলে উমায়েরের জন্মের পর থেকেই হৃদরোগের সমস্যা ছিল। তার প্রায়ই শ্বাসকষ্ট হতো এবং শরীর ঘেমে যেতো। তার চিকিৎসা চলছিল।'

ইউসুফ বলেন, "আমি ছেলেকে নিয়ে ১২ দিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। এরপর চিকিৎসকরা জানান, সে হৃদরোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কিছুটা সুস্থবোধ করায় তাকে চারদিন পর ২০ ডিসেম্বর চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় নিয়ে আসি।"

ছেলেকে নিয়ে বৃহস্পতিবার (৩০ ডিসেম্বর) ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসককে দেখানোর কথা ছিল। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য তিনি সেদিন যেতে পারেননি। গত শনিবার (১ জানুয়ারি) সকালে হার্ট ফাউন্ডেশনে যাওয়ার কথা ছিল। চিকিৎসকরা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে তার অপারেশনের ব্যাপারে একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

থার্টি ফাস্ট নাইটের ঘটনা বর্ণনা করে ইউসুফ রায়হান বলেন, 'টানা আতশবাজির শব্দে ছেলেটা বারবার কেঁপে উঠছিল। সারারাত সে ছটফট করছিল। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, তাকে নেবুলাইজ করা হয়েছিল। কিন্তু তাকে শান্ত করতে পারিনি।'

পরদিন (১ জানুয়ারি) সকালে উমায়েরকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় তার বাবা। হাসপাতালে ভর্তির পর তার অবস্থার অবনতি হয়। বিকালে আইসিইউতে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে মারা যায়।

ইউসুফ বলেন, ‘সত্যিই অতিরিক্ত শব্দের কারণেই তার হার্টফেল হয়েছিল কি না, আমরা তা বলতে পারব না। তবে সেই বিকট শব্দের কারণে বার বার কাঁপতে থাকা ছেলেটির সেই মুহূর্তের চেহারা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে, আতশবাজির শব্দে আমার বাচ্চাটার অনেক কষ্ট হয়েছে, আমরা তার কষ্ট কমাতে পারিনি। আমরা কাউকে বলতে পারিনি, ভাই আপনারা বাজি ফোটাবেন না, আমার বাবুটা কষ্ট পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আতশবাজি, গাড়ির তীব্র হর্ন, সবকিছুতেই এসব রোগীদের সমস্যা। হৃদরোগীরা এসব সহ্য করতে পারে না। আমি চাই না এভাবে আর কারও সন্তান বা কেউ মারা যাক।’

ইউসুফ রায়হানের স্ট্যাটাসটির স্ক্রিনশট ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। পাশাপাশি আতশবাজি ও হাইড্রলিক হর্নের বিরুদ্ধে কেউ কেউ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন।

তার স্ট্যাটাসটি শেয়ার দিয়ে অনেকেই এ ধরনের পটকা ফোটানোর সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতি আখ্যা দিয়েছে।

আগামীনিউজ/বুরহান