অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বিশ্বস্বীকৃতি

ডেস্ক রিপোর্ট মার্চ ৮, ২০২১, ০৮:৩৯ পিএম
ছবিঃ সংগৃহীত

ঢাকাঃ অনেক দুঃসংবাদের মধ্যেও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রার খবরটি আমাদের মনে আশা জাগায়। ৫০ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না যে অর্থনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে আমরা টক্কর দিতে পারব। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি, মাথাপিছু আয় ও মানবসম্পদ সূচকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসছে। গড় আয়ুতে আমরা পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছি। এ ছাড়া নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতিও চোখে পড়ার মতো।

মুম্বাইয়ের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত ওয়েবসাইট বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালসহ আগের তিন বছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৫৫ মার্কিন ডলার। এই ধারা চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। ভারতের একজন নাগরিক বাংলাদেশের নাগরিকের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি আয় করেন, অথচ ২০১১ সালে ভারতের নাগরিক আয় করতেন ৮৭ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সালসহ আগের তিন বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষেত্রে সমন্বিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (সিএজিআর) ১২ দশমিক ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেকের কম—৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে পাকিস্তানের সিজিআর ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর চীনের অর্থনৈতিক প্রসারের বার্ষিক হার ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ভারতের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

এছাড়াও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার এন্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘আ লুক অ্যাট বাংলাদেশ’স ৫০ ইয়ার জার্নি: টার্নিং পয়েন্টস অব দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ গুণ আর জিডিপি বেড়েছে ৩০ গুণ। ১৯৭০ সালে এই অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১৪০ ডলার, ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে।

শুধু তাই নয়, ১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি এবং ২০২০-২০২১ সালের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।১৯৭২-১৯৭৩ সালের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৭২২ গুণ। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে উন্নয়ন বাজেটের আকার ছিল ৫০১ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২০১৮-২০১৯ সালে হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি, যা ৩৪৫ গুণ বেশি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ঘরে ঘরে বিজলি বাতির চমক, শিল্পায়ন, গৃহায়ণ, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ প্রশমনে বদলে গেছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটেছে উন্নয়নশীল দেশে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ- যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার লড়াই সংগ্রামের সুবিশাল ইতিহাস।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ৫০ বছরের অগ্রগতি স্বস্তিদায়ক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, রপ্তানি আয় বেড়ে যাওয়াসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে অগ্রগতি, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পে অগ্রগতি পাল্টে দিয়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ।

বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার যুবক শ্রেণি কাজ না পায়।’

গবেষকদের মতে, জাতির পিতার উত্তরসূরির নেতৃত্বেই এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লড়াই। ইতোমধ্যেই প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পথ-নকশা তৈরি করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২১-২০২৫ মেয়াদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই পরিকল্পনায় ১ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে দারিদ্র্যের হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে। শেষ বছর ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ১০টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে যা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার আগে যেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল ৮৮ শতাংশ লোক, আজ সেই সংখ্যা ২০ শতাংশের কম। বিগত ৫০ বছরে ধান-চালের উৎপাদন প্রায় চারগুণ হয়েছে। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশের ওপর। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার ৪৯ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে তৈরি পোশাক ছাড়াও রুপালি ইলিশ, হিমায়িত চিংড়ি, রাজশাহীর ফজলি, সিলেটের শীতলপাটি, নারায়ণগঞ্জের জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, কুমিল্লার খাদি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশের ওষুধ যাচ্ছে বিশ্বের ১৬৬টি দেশে। এসব অগ্রগতির স্বীকৃতিও মিলছে। 

লন্ডনভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ ভবিষ্যতের যে ১০টি উদীয়মান বাজারকে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গার্মেন্টস ও কৃষিভিত্তিক পণ্য রপ্তানি করে দেশটি ক্রমেই জোরালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনই তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ।

অতএব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের আয়বৈষম্য কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। মানবসম্পদের সূচককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে হলে আমাদের প্রথম কাজ হবে প্রত্যেক নাগরিককে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, সেই জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। প্রতিবছর যে লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাঁদের কাজের ব্যবস্থা না করে অর্থনীতি কেন, কোনো উন্নয়নকেই টেকসই করা যাবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করছেন যে কৃষক এবং দেশে ও বিদেশে কর্মরত শ্রমিক, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

আমরা যদি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে চাই, তাহলে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি অপরিহার্য হলো একটি সুস্থ ও সবল গণতান্ত্রিক পরিবেশ। পথের বাধাগুলো দূর করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়া কেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গেও সমানতালে পাল্লা দিতে পারবে।

আগামীনিউজ/নাসির