‘তুই কলেজ ছাড়বি কবে’, শিক্ষককে পেটাতে পেটাতে বলেন যুবলীগ নেতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানুয়ারি ৮, ২০২০, ০৮:৪৯ পিএম
অধ্যক্ষ একেএম রমজান আলী

কলেজের আয় ব্যয়ের হিসেব চাওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস মডেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ একেএম রমজান আলীকে পিটিয়েছেন কলেজটির সভাপতি ও শাহবাজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ রাজ্জি ও তার সহযোগী ফাইজুল ইসলাম রোমান নামের এক সন্ত্রাসী। এমন অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ রমজান নিজেই।

রমজান বুধবার জানান, মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) কলেজ ছুটির পর একটি কক্ষে রমজানকে ডেকে নিয়ে যান ফাইজুল ইসলাম রোমান। ওই কক্ষে কলেজ সভাপতি ও শাহবাজপুর ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা রাজ্জি। কলেজের ওই কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে রমজানকে চেয়ারের সঙ্গে বেধে ফেলেন চেয়ারম্যানের সহযোগীরা। তারপর লাঠি দিয়ে সেখানে তাকে বেধড়ক পেটান। আর যুবলীগ নেতা রাজ্জি বলতে থাকেন, ‘তুই কলেজ ছাড়বি কবে? তোর জন্য দুইডা টাকাও হজম করতে পারছি না।’ অন্যদিকে তার দুই সহযোগী গামছা দিয়ে রমজানের গলায় চাপতে থাকে।

শাহবাজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ।

পরে অবস্থা বেগতিক দেখে তার হতের বাঁধন খুলে দেন। কলেজ থেকে কোনো রকম পালিয়ে দুই রিকশা চালকের সহযোগিতায় একটি সিএনজিতে করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন রমজান। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় অভিযোগ দায়েরের প্রস্ততি চলছিল চেয়ারম্যান রাজ্জির বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা তুললেও সেসব নিজের নামে লিখিয়েছেন সাবেক এই যুবলীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান রাজিব আহেমদ রাজ্জি। গত ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিতাস মডেল কলেজের নামে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের পল্টন শাখায় খোলা ব্যাংক হিসাবে কলেজের নামে এফডিআর এর এক লাখ টাকা ছাড়া গত দুই বছরে মাত্র ৬২ হাজার টাকা লেনদেন করেন। এর অতিরিক্ত আর কোনো ধরনের লেনদেন করেননি কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই প্রতিবেদককে কলেজের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।

কলেজের শিক্ষকদের একজন নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিতাস মডেল কলেজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের তিনজন রাজিব আহমেদ রাজ্জি, ফাইজুল ইসলাম (রোমান) যোগসাজোশে নিজেদের কাছে টাকা রাখছেন। কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য শিক্ষকদের বেতন দিলেও যার হাত ধরে তিতাস মডেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই অধ্যক্ষ রমজান আলীকেই গত চার মাস ধরে বেতন দিচ্ছে না বলে তিনি জানান।

কলেজের ওই শিক্ষক জানান, সম্প্রতি কলেজের প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এ.কে.এম রমজান আলীর সঙ্গে কলেজের হিসেব চাওয়া নিয়ে বাদানুবাদ শুরু হলে শাহবাজপুরের ইউপি চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি তাকে বাবা মা নিয়ে গালি গালাজ করেন।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা যায়, রাজিব আহমেদ রাজ্জি যে জায়গায় তিতাস মডেল কলেজ করেন সেই জায়গার প্রকৃত মালিক শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও পাকিস্তান গণপরিষদের পার্লামেন্টেরিয়ান ও এই ইউনিয়নের পাঁচবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মরহুম নান্না মিয়া সাহেব ও তার পারিবার।

এই বিষয়ে নান্না মিয়ার বড় ছেলে ইকরামুল আমিন বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কলেজের জায়গাটা আমাদের কিন্তু কলেজ করার আগে এরা কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমরা নিজেদের জায়গায় ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে রেখেছি। এখানে একটা কারিগরি কলেজ এর কথা হচ্ছিল। আমরা ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য একটা কলেজের সব কথা চূড়ান্ত করেছি, এর মধ্যেই এরা জায়গাটার দখল নেয়। আমরা তো এই জায়গাটা উদ্ধার করতে গেলে গ্রামের মানুষের কাছে এরা বলে বেড়াবে আমি কলেজ হতে দিতে চাই না। নিজের সম্মানের কথা ভেবে কিছু বলতে পারছি না। আমার কথা হলো আমরা যদি কোটি টাকা মূল্যের পরিষদের জায়গা দিতে পারি, তাহলে গ্রামের শিক্ষা প্রসারে এটাও শাহবাজপুরের মানুষকে দিতে পারবো। আমরা চাই এখানে একটা ডিপ্লোমা কলেজ হোক।

সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় গুরুতর আহত কলেজটির অধ্যক্ষ এ.কে.এম রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। রমজান আলী বলেন, সরকারি অডিট আসবে সে কারণে আমি সঠিক হিসাব চাইলে তারা আমাকে আক্রমণ করে। আমরা যেখানে কলেজটি করেছি সেটি নিয়ে বিরোধ আছে। এসব অনিয়মের কারণে কলেজের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে বললেই তারা আমার ওপর ক্ষেপে যায়।’

তিনি বলেন, কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন ব্রিকফিল্ড থেকে ৫২ হাজার ইট আমরা অনুদান হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু ইটের সংখ্যা ৭০ হাজার উল্লেখ করে চেয়ারম্যান নিজের নামে ভাউচার তৈরি করেন। এছাড়া জামাল কাকা টিন কেনার জন্য অনুদান দেয় ৬ লাখ ৫০ হাজার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৫ লাখ, মামুন ভাই ৬ লাখ, আল আমিন ৩ লাখ, এনাম হাজী ৪ লাখ, শিবলী ভাই, ৫০ হাজার, বুলেট বাবুল ১ লাখ, পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা, জাবেদ মিয়া ১ লাখ, জুম্মন ভাই ৮৬ হাজার টাকাসহ অনুদান আসে প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

ছাত্রছাত্রীদের চেয়ার টেবিল, সিলিং ফ্যান, কলেজের সিলিং, ইলেকট্রিক সামগ্রীসহ যাবতীয় জিনিসই অনুদান থেকে করা হয়েছে। নির্মাণ খরচ, সিমেন্টের টাকা ছাড়া কলেজ করতে আমাদের পকেট থেকে চার পয়সাও খরচ করতে হয়নি। নির্মাণের সবই আমরা অনুদান হিসেবে পেয়েছি। কলেজ করতে দুই অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া ৪০ লাখ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আরো প্রায় ৮০ লাখসহ যে অনুদানের টাকা উঠেছে ব্যাংক হিসাবে এর একটি টাকাও তারা রাখেনি।

তিনি আরও বলেন, হিসেব মতো কলেজ অনেকটা অনুদানেই তৈরি হয়েছে। আর বাকি টাকা তিতাস মডেল কলেজের ব্যাংক হিসাবে থাকার কথা কিন্তু চেয়ারম্যান তার দুই সহযোগী কাঠ রোমান ও সবজি রোমানকে নিয়ে নিজেদের কাছে রাখছেন। উপরন্তু সবচেয়ে বেশি অর্থ লগ্নি করার জন্য দাতা সদস্য হিসেবে সুমন ভাইয়ের নামও তারা রাখেননি। এমনকি একটি পয়সা না দিয়েই তিনি আর তার দুই সহযোগী কলেজের মালিক।

উল্লেখ্য, দেওড়ার ভূমি অফিসের রেকর্ড রুমের তথ্যমতে মো. ইদ্রিস মিয়ার কাছ থেকে ৬১ শতাংশ ও মো. ছিদ্দিক মিয়ার কাছ থেকে ৪১ শতাংশসহ মোট ১০২ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ক্রয় করে তিতাস মডেল কলেজ যার প্রকৃতমূল্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যা দলিলে উল্লেখ আছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। যার সিএস, এসএ, আরএস- ২৪৪০, ২৪৪৪,২৪৪৫ নং দাগের।

শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এর আগেও শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান পদক পাওয়া নিয়ে রাজ্জি জালিয়াতি করেন। একটি ২৫০ টাকা মূল্যের পদক কিনে গ্রামে প্রচার করতে থাকেন জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এই পুরো বিষয়টি মিথ্যা ও বানোয়াট। কারণ শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচন করে জেলা প্রশাসন।

চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, তিতাস মডেল কলেজ নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে জোরপূর্বক জায়গা দখল ও কোটি টাকা বাণিজ্য করছে এমন অভিযোগ আছে রাজ্জির বিরুদ্ধ। সম্প্রতি একটি ঘটনায় রমজানকে পাগল প্রমাণ করার মাস্টারপ্ল্যানও সাজিয়েছে বলে জানান তিনি। অভিযোগ অস্বীকার করেন শাহবাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি।

আগামী নিউজ/এনএ/এএম