1. প্রচ্ছদ
  2. জাতীয়
  3. সারাবাংলা
  4. রাজনীতি
  5. রাজধানী
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আদালত
  8. খেলা
  9. বিনোদন
  10. লাইফস্টাইল
  11. শিক্ষা
  12. স্বাস্থ্য
  13. তথ্য-প্রযুক্তি
  14. চাকরির খবর
  15. ভাবনা ও বিশ্লেষণ
  16. সাহিত্য
  17. মিডিয়া
  18. বিশেষ প্রতিবেদন
  19. ফটো গ্যালারি
  20. ভিডিও গ্যালারি

মুসলমানদের প্রতিক্রিয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব

মারুফ কামাল খান সোহেল প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২০, ০৯:১৩ পিএম মুসলমানদের প্রতিক্রিয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব

ইরাকে মার্কিনি হানায় প্রভাবশালী ইরানি সমরবিদ কাসেম সোলেইমানি ও ইরাকি শিয়া প্যারামিলিশিয়ার এক অধিকর্তা নিহত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছে তাতে প্রকটভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। আরব ও পারস্যের ঐতিহাসিক বিরোধের দিকটাও সামনে চলে আসছে।

ইরানে শিয়া মতবাদভিত্তিক আয়াতুল্লাহ্ দের ধর্মীয়রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব থেমে থেমেই চলে আসছে। মার্কিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত হানায় বিভিন্ন সময়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাজনীতিক, সমরবিদ, প্রশাসক ও ধর্মীয় নেতাকে জীবন দিতে হয়েছে। জেনারেল সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড তার সর্বশেষ ঘটনা।

প্রতিটি হামলার পর ইরানের নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা ইরানের পক্ষে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিকার করা বা প্রতিশোধ নেয়া কখনোই সম্ভব হয়নি। এবারেও যে সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতন ইরান গ্লোবাল থিয়েটারের কোনো অ্যাক্টর বা প্লেয়ার নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পটভূমিতে ইরান তার জাতীয় স্বার্থরক্ষায় প্রথম দিকে ডিফেন্সিভ রোল প্লে করেছে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে মক্কার কর্তৃত্ব সম্মিলিত ইসলামিক বডির হাতে ন্যস্ত করার দাবিতে অঘটন ঘটিয়ে প্রথম দিককার একটা হঠকারিতার পর অনেকদিন ইরান সংযতই ছিল।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার তারা অফেন্সিভ ভূমিকায় নেমেছিল। কেউ কেউ মনে করেন নানা ভাবে উত্যক্ত করে এবং চাপ ও অবরোধের মধ্যে ফেলে ইরানকে পরাশক্তিগুলিই ডেসপারেট হয়ে উঠতে বাধ্য করে। যাই হোক, ইরানের এই অফেন্সিভ ভূমিকার যেগুলো বিশ্ব পরাশক্তির পক্ষে গিয়েছে সেগুলোতে তারা নীরবে-নিভৃতে সায় দিয়েছে।

সুন্নি মুসলিমদের একটি উগ্রবাদী অংশ রহস্যময় শক্তির মদতে হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে ওঠা দায়েশ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাকীর্ণ ইরাক ও সিরিয়ার বিরাট অংশ দখল করে আইএসআইএল নামে এক তথাকথিত খেলাফতি রাষ্ট্র কায়েম করে। এই দায়েশ ও তাদের সহযোগী অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হয় ইরান। এই লড়াই ইরানকে ইরাক ও সিরিয়ায় বিরাট সাফল্য এনে দেয়। এতে ইরান অফেন্সিভ ভূমিকার ব্যাপারে আরো বেশি উৎসাহী হয়ে উঠে।

সিরিয়ার রণাঙ্গণে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নেয়ার পাশাপাশি পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন দেশে সমর্থনপুষ্ট যোদ্ধাগোষ্ঠী গঠন, প্রক্সি ওয়ার ও গেরিলা হামলায় তারা সর্বপ্রকার সহায়তা দিতে থাকে। শিয়া ছাড়াও তারা তাদের সমর্থনপুষ্ট কিছু সুন্নি যোদ্ধাগ্রুপের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের ওপর ইরানি প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ইরানের এই অফেন্সিভ প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল। তখন ইরানি জুজুর ভয় দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশগুলোর কাছে বিপুল সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ইরানি প্রক্সি ওয়ারের অ্যাডভ্যাঞ্চারিজম ও এসিমিট্রিক ওয়ারফেয়ার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ‘ভ্যাসল স্টেট’ ইসরায়েলের স্বার্থে আঘাত হানতে শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র সোলেইমানির বিরুদ্ধে এই কঠিন অ্যাকশনে যায়। সোলেইমানি ছিলেন এই ইরানি অ্যাডভ্যাঞ্চারিজমের আসল স্তম্ভ।

এই হত্যা ইরানের এক মস্ত ক্ষতি। এতে তারা কেবল একজন পয়লা কাতারের সমর নায়কই হারায় নি। এই ঘটনায় ইরানের ভাবমর্যাদা এবং তাদের ওপর নির্ভরতা অনেকখানি ক্ষুন্ন করেছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইরান যদি সহসা ফের কোনো হঠকারিতার পথ ধরে তবে তাকে আরো বেশি চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
ইরানের এই ক্ষতি তার মিসক্যালকুলেশনের পরিণাম।

ইরানের ভুল ধারণা ছিল তাদের প্রক্সি ওয়ার মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি মার্কিন স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র সেটা বুঝতে পারবে না। অথবা বুঝতে পারলেও দায়েশ দমন যুদ্ধের মিত্র হিসেবে জেনারেল সোলেইমানিকে সরাসরি আঘাত হানবে না। আগেও কয়েকবার সোলেইমানিকে মারার কথা প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্র তাকে না মেরে তার দাম ও মর্যাদা বাড়িয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মোস্ট ওয়ান্টেড হয়েও জেনারেল সোলেইমানি ইরাকে মোটামুটি স্বাভাবিক সময়ের মতই অরক্ষিত অবস্থায় চলাচল করছিলেন। এই ভুল হিসেবের খেসারত দিতে হয়েছে জীবন দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের যে চরিত্র তাতে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে, মধ্যপ্রাচ্য ও বহির্বিশ্বে তার কর্তৃত্বের আবহ বজায় রাখার স্বার্থে, মিত্রদের আস্থা টেকাতে এবং মার্কিন স্বার্থবিরোধী ধারাবাহিক অ্যাভেঞ্চারিজম রোধ করতে তাদের পক্ষ থেকে এমন কঠোর মেসেজ যে এই পর্যায়ে এসে অবশ্যম্ভাবি হয়ে উঠেছিল, সেটা আগাম অনুধাবন করে সতর্কতা অবলম্বন করতে না পারাটা ইরানের এক বড় ব্যর্থতা। সেই ভুলের যে চরম মাশুল তারা দিয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে শোধরাবার বা পূরণ করবার কোনো সুযোগ আপাতত নেই।

মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে তা মূলত বিভিন্ন দেশের জাতীয় স্বার্থ, জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ, রাজনীতি, কর্তৃত্বপ্রবণতা, অর্থনীতি, সমরকৌশল, জ্বালানি চাহিদা, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিযোগিতার ফলাফল। এই প্রতিযোগিতায় ধর্মীয় আবেগ, ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করা হলেও ধর্ম এখানে বিরোধের প্রধান কারণ নয়। এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শিয়া-সুন্নির মতন ধর্মীয় দ্বন্দ্ব প্রকট ভাবে সামনে এলেও ঘটনাগুলো এই দ্বন্দ্বের কারণে ঘটছে না।

ইহুদিদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের গোড়া থেকে যে দ্বন্দ্ব এবং এর জের ধরে যে বিপুল রক্তপাত, নৃশংসতা ও জীবনহানি ঘটেছে তা সকলেরই জানা। সেই খ্রিস্টানেরা প্রায় সকলে মিলেই মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ইজরেয়েল স্থাপন করে দিয়েছে কি ধর্মীয় কোনো তাগিদ থেকে?

ইসলামের মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর নেতৃত্বের উত্তরাধিকার ও ধারা নিয়ে তাঁর সাহাবিদের মধ্যে যে মতান্তর ঘটে সেখান থেকেই শিয়া-সুন্নি মতবাদের উদ্ভব। উত্তরাধিকারসূত্রে মহানবীর(সা.) বংশধারা অর্থাৎ আহলে বায়াত বা হাউস অব প্রোফেট থেকে নেতৃত্বের পক্ষাবলম্বনকারীরা শিয়া পরিচিতি লাভ করে।

অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা প্রবীণ সাহাবিদের পরামর্শসভা বা মজলিসে শুরার মাধ্যমে যোগ্যতম ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচনের পক্ষে মত পোষণ করেন তারাই কালক্রমে সুন্নি হিসেবে পরিচিতি পান। এই মতান্তর প্রথমে খুব বেশি তীব্র হয়নি। আহলে বায়াত থেকে রাশেদিন খেলাফতের চতুর্থ বা শেষ খলিফা হিসেবে হযরত আলী নির্বাচিত হন। তখন সুন্নিরা যেমন আহলে বায়াতের নেতৃত্ব মেনেছে, তেমনই ভাবে শিয়ারাও খেলাফতকে অস্বীকার করেনি।

বিরোধটা তীব্র, তিক্ত ও অমীমাংসিত পর্যায়ে চলে যায় বিশেষ করে কারবালার মর্মন্তুদ শাহাদাতের ঘটনার পর। খেলাফত অধিকার প্রতিষ্ঠায় বারবার ব্যর্থ হয়ে শিয়ারা একসময় খেলাফত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই চলে যায়। তারা এর বিপরীতে উত্তরাধিকারসূত্রে আহলে বায়াতের আধ্যাত্মিক ইমামত বা নেতৃত্বের থিওরি প্রবর্তন করে। আর সুন্নিরা খেলাফতের অপভ্রংশ হিসেবে অনৈতিক সালতানাৎ বা রাজতন্ত্রকেই মুখ বুজে সমর্থন দিতে থাকে।

এই যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ, এর সঙ্গে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার চাইতে ইহলৌকিক নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক আধিপত্যের দ্বন্দ্বটাই যে প্রবল ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানবসৃষ্ট এই দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে স্থানকালপাত্রভেদে ঈমান, আকিদা, ফিকাহ্ ও শরিয়তি বিধি-বিধানেও কিছু কিছু পার্থক্য ও ব্যবধান তৈরি করেছে। কালক্রমে সেই ব্যবধান ও দ্বন্দ্বগুলো ক্রমান্বয়ে দূরাতিক্রম্য হয়ে উঠেছে।

১২ ইমামে বিশ্বাসী টুয়েলভার শিয়াদের শক্তিশালী ঘাঁটি ইরান। পাহলবি বংশের সেক্যুলার ও পারস্য জাতীয়তাবাদী শাহেনশাহকে হঠিয়ে জনবিপ্লবে শিয়া ইমাম বা ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ্দের কর্তৃত্বাধীন এই ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদার আরব মুসলিম খলিফাদের পারস্য জয়ের পর দেশটির জরথুস্ত্রীয় ধর্মের অনুসারীরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করে।

এরপর প্রায় সাড়ে আটশ' বছর জুড়ে ইরান জুড়ে ইসলামের সুন্নি মতাবলম্বীরাই ছিল বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শাহ্ ইসমাইল ইরান বা পারস্য দখল করে সাফাভি রাজবংশের শাসন প্রবর্তন করেন। এই পারস্য সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তুর্কি খেলাফত নামের ওসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য। ওসমানীয়রা ছিলেন সুন্নি মুসলমান এবং সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ছিল ইসলামের সুন্নি স্কুল অব থট।

আর তাই তাদের সাথে পার্থক্য নিরূপনের উদ্দেশ্যেই শাহ্ ইসমাইল-১ শিয়া তরিকাকে সাফাভি সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর রাষ্ট্রশক্তির জোরে পারস্য বা ইরান সাম্রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদেরকে জোর করে ১২ ইমামে বিশ্বাসী শিয়া ধর্মমতে ধর্মান্তরিত করা হয়। দ্রুতই সাফাভি রাজবংশ শাসিত ইরানে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সুন্নিরা সংখ্যালঘু হয়ে যায়।

সাফাভি রাজবংশ শাসিত পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল আজারবাইজান, বাহরাইন ও আর্মেনিয়া। এছাড়া জর্জিয়া, উত্তর ককেসাস, ইরাক, কুয়েত ও আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকা এবং তুরস্ক, সিরিয়া, পাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের অংশবিশেষ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে ইরানের বাইরে এই সব অঞ্চলেও শিয়া ধর্মমতের বিস্তার ঘটে। অর্থাৎ বর্তমান ইরানে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সন্নিহিত অঞ্চল ও দেশগুলোতে শিয়া মতের বিস্তারের পেছনের কারণও ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক।

একইভাবে মিশনারি কার্যক্রমের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম ও দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে সুন্নি ইসলামের দীক্ষার পাশাপাশি এই দুটি ধর্মের বিস্তারের ইতিহাসকে রাজনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই।

ভারতের মুঘল শাসকেরা সুন্নি হলেও এদেশে ইসলাম প্রচারকাজে শিয়া-সুন্নি উভয় স্কুল অব থটের সুফিরা অবদান রেখেছেন। তাছাড়া পারস্য ও সন্নিহিত অঞ্চল থেকে আসা অনেক শিয়া জেনারেল ও অমাত্য মুঘল সম্রাটের দরবারে বা মুঘল শাসিত প্রদেশসমূহে উচ্চপদে নিয়োজিত ছিলেন। ব্যবসা উপলক্ষেও ইরানী শিয়া অভিজাতরা এদেশে এসেছেন। এসেছেন আওলিয়া, দরবেশ, অধ্যাপক, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীরাও। কাজেই সংখ্যায় কম হলেও ভারতে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তির কমতি ছিল না।

সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ভারতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোর মতো কখনো তীব্র হয়নি। মিরজাফর আলী খান এ অঞ্চলে শিয়া হবার কারণে নয়, বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ঘৃণিত হয়েছেন। আবার শিয়া সিরাজুদ্দৌলা, মির্জা গালিব, আগা খান, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্, লিয়াকত আলী খান, ইস্পাহানি পরিবার, হারুন পরিবার, হাজি মোহাম্মদ মসসিনের মতন মানুষেরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মর্যাদার আসন লাভ করেছেন।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান, আল্লামা ইকবাল ও নবাব স্যার সলিমুল্লাহ্’র মত ব্যক্তিরা শিয়া-সুন্নি বিতর্কের উর্ধে থাকার চেষ্টা করেছেন। বিহার থেকে আসা মুসলিম মুহাজিরদের সঙ্গে শিয়া হবার কারণে নয় বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে এ অঞ্চলের মানুষের বিরোধ হয়েছে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্বেও ইরানের প্রতি আমাদের অঞ্চলের সুন্নি মুসলিমদের বিদ্বেষের কোনো লক্ষণ অতীতে তেমন দেখা যায়নি।

কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশে আগেকার সেই অবস্থা এখন নেই। পাকিস্তানে, ভারতে এবং বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক কালে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব অনেকটাই প্রকট। এটা কি শিয়া আয়াতুল্লাহ্দের থিয়োক্র‍্যাটিক স্টেট প্রতিষ্ঠার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া? জেনারেল সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ব্যক্ত প্রতিক্রিয়া থেকেও এর সত্যতা অনেকটাই আঁচ করা গেছে। এই যে দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষ এটার পেছনেও ধর্মীয় কারণের চেয়ে রাজনৈতিক কারণই প্রধান কিনা তা নিয়ে বিতর্ক ও গবেষণা হতে পারে।

ইরানকে এই বাস্তবতাগুলো মাথায় রাখতে হবে। তাদের ভূমিকার কারণেই হোক কিংবা প্রতিপক্ষের প্রচারণার কারণেই হোক সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বিশ্বে শিয়া ধর্মগুরু বা আয়াতুল্লাদের শাসিত ধর্মরাষ্ট্র ইরানের সমর্থনের ভিত খুব নাজুক। হাজারো মজলুম হলেও ইরানের পাশে মুসলিম জনমত ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াবে না- এটাই বর্তমান বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদেশগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও নাজুক দশায়। রাশিয়া, চীন, তুরষ্কও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও ইরানের পক্ষে সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখবে না। কাজেই বাস্তবতার আলোকে ইরানের স্ট্রাটেজিকে নতুন করে বিন্যস্ত করতে হবে।

ইরানে সরকারের বিরুদ্ধে সম্প্রতি নাগরিক বিক্ষোভ ও আন্দোলনের চেষ্টায় বুঝা গেছে ভেতরে ধুমায়িত অসন্তোষ রয়েছে। সোলাইমানির হত্যাকান্ড ইরানি সরকারকে সেই অসন্তোষ প্রশমিত করে জাতীয় ঐক্যকে অটুট করার একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, ইরানে সরকার উৎখাতের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তারা ভিনদেশের দূতের মাধ্যমে হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু কনসেশনের প্রস্তাবও পাঠিয়েছে।

যা এখনো দু’পক্ষের কেউ খোলাসা করে বলেনি। দীর্ঘ অবরোধে ক্লিষ্ট ইরান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যত বেশি সম্ভব সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। খুনের বদলে খুন বা ইতিউতি টুকটাক হামলা করে প্রতিশোধ নিতে গেলে ইরানের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে। বৈরি আরব দেশগুলো এখন ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আহত শার্দুল হিশেবে ভয় পাচ্ছে। সেই ভয়কে কাজে লাগিয়ে ইরানের উচিত হবে তাদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত করে ফেলা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব মাস্তানি ইরানের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় নি। তাদের ইরাক অভিযান ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বলয়কে বিস্তৃতি দিয়েছে। সাদ্দাম আমলের চরম বৈরি ইরাক এখন ইরানের অনুগত মিত্র। সিরিয়ায় ইরানের কর্তৃত্ব প্রবল। এছাড়া রাষ্ট্রবহির্ভূত বেশ কিছু শক্তির সঙ্গে ইরানের রয়েছে চমৎকার মিতালী। কুর্দিদের বড় অংশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ভালো। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ বা হৌতি বিদ্রোহী, লেবানিজ শিয়া হেজবোল্লাহ্ তো আছেই, ফিলিস্তিনের সুন্নি হামাসরা পর্যন্ত ইরানের মিত্র।

ইরানের চারপাশেই স্থাপিত হয়েছে মিত্রদের শক্ত প্রতিরোধবেষ্টনি। কাজেই ইরানের অস্থির হবার কিছু নেই। প্রক্সি ওয়ার, এসিমিট্রিক ওয়ারফেয়ার বা গেরিলা আক্রমণ বাদ দিয়ে ডিফেন্সিভ অবস্থানই এই মুহূর্তে ইরানের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হবে। জাতীয় অর্থনীতি, সমরশক্তি ও মৈত্রীবলয় আরো শক্তিশালী করতে হলে তার সময় ও সুযোগের প্রয়োজন। এখন সংঘাতে জড়ালে বা সংকীর্ণ সেক্টারিয়ান মানসিকতা ও জাত্যাভিমান না ছাড়লে সেই লক্ষ্য কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়।

—লেখক, সাংবাদিক
মারুফ কামাল খান 

 

 

আগামীনিউজ/আরআর/এএম

আগামী নিউজ এর সংবাদ সবার আগে পেতে Follow Or Like করুন আগামী নিউজ এর ফেইসবুক পেজ এ , আগামী নিউজ এর টুইটার এবং সাবস্ক্রাইব করুন আগামী নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে
Small Banner